আর্য ও দ্রাবিড় সংস্কৃতির সংমিশ্রণেই ভারতে ভক্তিধর্মের সূচনা?
Bhakti Movement in India : এই ‘ভক্তি’ কিন্তু আর্য সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল না। আর্যরা ছিল প্রকৃতির উপাসক, তাদের চর্চার বিষয় ছিল যাগ-যজ্ঞ, তন্ত্র-মন্ত্রকেন্দ্রিক বৈদিক ধর্ম।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। এখানে আর্য-অনার্য-দ্রাবিড় সংস্কৃতির মানুষেরা থাকে। দ্রাবিড়েরা ভারতের সবচেয়ে পুরনো মানুষ। অনুমান করা হয়, এরা খ্রিষ্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে ভারতে আসে। এরা আগে, তারা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে থাকত । আর আর্যরা এদেশে এসেছিল ১৫০০-১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে। অনুমান করা হয়, এই সময়টা ছিল সিন্ধুসভ্যতা পতনের পরবর্তী সময়। আর্যরা সঙ্গে করে নিয়ে এল সংস্কৃত ভাষা ও যাগ-যজ্ঞকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। তাদের ভারতে আসার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল বেদের চর্চা। আর্যদের ভারতে আসাটা দ্রাবিড়দের কাছে একটা ধাক্কা হয়ে দেখা দিয়েছিল, কেননা দ্রাবিড় সংস্কৃতি ও আর্য সংস্কৃতি তখন মিশে যেতে পারেনি। ফলে, শুরু হয় আর্য-অনার্য সংঘাত।
পরে, এই দুই সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল ভক্তি আন্দোলনের হাত ধরে। সেই মেলবন্ধনের ছোঁয়া, সেই ভক্তির মিশ্রিত-চর্চা আজকের সমাজজীবনেও দেখতে পাওয়া যায়। কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই ভক্তির চর্চা? দেবতার প্রতি গভীর প্রীতিপূর্ণ বিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে হৃদয়ে সমর্পণমূলক যে-ভাবের সঞ্চার হয় তাকে ‘ভক্তি’ বলা যেতে পারে। এই ‘ভক্তি’ কিন্তু আর্য সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল না। আর্যরা ছিল প্রকৃতির উপাসক, তাদের চর্চার বিষয় ছিল যাগ-যজ্ঞ, তন্ত্র-মন্ত্রকেন্দ্রিক বৈদিক ধর্ম। কিন্তু অপরদিকে দ্রাবিড়দের মধ্যে পূজাপদ্ধতির প্রচলন ছিল। মহেঞ্জোদারোর সভ্যতা চলাকালীন দ্রাবিড়রা ছিল প্রতিমাপূজায় বিশ্বাসী। তাই দ্রাবিড়দের বিশ্বাস ছিল ঈশ্বরভক্তিতে। বলা যায়, ভক্তি ধর্ম শুরু থেকে দ্রাবিড়দের মনে-প্রাণে ছিল। কিন্তু দ্রাবিড় সংস্কৃতির সঙ্গে থাকার ফলে কালক্রমে আর্যদের সংস্কৃতির মধ্যে এই ‘ভক্তি’-র চর্চা এসে যায়।
আরও পড়ুন-
পৃথিবীতে প্রথম লৌহযুগের শুরু তামিলনাড়ুতে! যে রিপোর্ট বদলে দিতে পারে ইতিহাস
বৈদিক ধর্মের প্রধান দেবতারা হল: ইন্দ্র, বিষ্ণু, নারায়ণ, বরুণ, সূর্য। কিন্তু এঁরা সকলেই উপাস্যদেবতা, পূজা বা ভক্তির সঙ্গে এঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বেদের কোথাও ভক্তিচর্চার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু উপনিষদে কোথাও-কোথাও ভক্তিরসের অস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন বলা যায়, ‘তৈত্তিরীয়’ উপনিষদে আছে, তিনিই প্রেমময় এবং সেই প্রেমময়কে লাভ করে সকলে আনন্দ লাভ করে। এছাড়া ‘বৃহদারণ্যক’ উপনিষদেও এই ভক্তিরসের সামান্য আভাস পাওয়া যায়।

আর্য সভ্যতা
তাহলে প্রথম ভক্তি ধর্মের চর্চা দেখা গেল কবে? দেখা গেল, ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভগবদ গীতায় কৃষ্ণ-বাসুদেব উপাসনার ভেতর। এর আগে, কৃষ্ণের কথা আমরা ‘ঋকবেদ’-এ পাই। সেখানে কৃষ্ণ একজন বৈদিক ঋষি। আবার ‘ছান্দোগ্য’ উপনিষদে যে-কৃষ্ণের কথা পাই তিনি হলেন ঘোর আঙ্গিরসের শিষ্য। অনেকে মনে করেন, এই আঙ্গিরসের শিষ্য কৃষ্ণ-ই পরবর্তীকালের ভগবত গীতার কৃষ্ণ। উপনিষদ ও ভগব দগীতার মধ্যের যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান, সেই ব্যবধান-সময়েই দ্রাবিড় ও আর্য অনেকটা কাছাকাছি চলে আসে।
খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকের মধ্যে কৃষ্ণ-বাসুদেবকে ঘিরে ভাগবত ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরেই আর্য সংস্কৃতিতে বৈষ্ণব ধর্মের জন্ম হয় এবং তা ধীরে-ধীরে দক্ষিণ ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। আর্য-দ্রাবিড় ক্রমে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আর্য-রমণী দ্রাবিড়-পুরুষকে বিয়ে করলেও তার মনে-প্রাণে তো নিজের সংস্কৃতি থেকেই যাচ্ছে। সেই নববধূরাই আর্য সংস্কৃতিকে দ্রাবিড় সংস্কৃতির মধ্যে সেই প্রথম মিশিয়ে দিতে শুরু করে। এবং এইভাবে দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মিলন হয়। এছাড়া বৈদিক ধর্মের আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার কাছে দ্রাবিড়রা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। তাদের মেনে নিতে হয়েছিল আর্যদের রীতিনীতিগুলোকেই। তবে এর উলটোটাও কিন্তু ঘটেছিল, আর্যদের সঙ্গে। দেখা যায়, আর্যসমাজে দ্রাবিড়প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে উপনিষদের যুগে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, উপনিষদে আর বৈদিক চিন্তার প্রতিফলন দেখা গেল না।
আরও পড়ুন-
বাল্মীকির দায়সারা চরিত্র! যেভাবে রামের হাতে মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছিল অনার্য মারীচ
দক্ষিণ ভারতে এই ভক্তিধর্মের পুনুরুথ্থান খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতক থেকে। তামিলনাড়ু থেকে শুরু করে এই ধর্ম কর্ণাটক, কেরল, গুজরাট হয়ে উত্তর ভারতের মারাঠা ও পাঞ্জাবে এসে শেষ হয়। পাঞ্জাবে এসে এই ভক্তি আন্দোলন সুফি চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এক ভিন্নরূপ নেয়। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড়দের জাতীয় দেবতা শিব,পার্বতী ও কার্তিক। তাই সেখানে শৈবধর্ম চর্চার মধ্যে দিয়ে ভক্তিচর্চা শুরু হয়। পরবর্তীতে শৈবধর্ম চর্চার পাশাপাশি বৈষ্ণব ধর্ম চর্চাও সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল। তবে দক্ষিণ ভারতে এই বৈষ্ণব ধর্ম কখনোই শৈব ধর্মের উপরে উঠতে পারেনি। পাশাপাশি উত্তর ভারতেও শৈবধর্ম ছড়িয়ে পড়ে।

দ্রাবিড় সভ্যতার নিদর্শন
আচারসর্বস্ব, দেবদেবীপূজা, যজ্ঞকেন্দ্রিক ভক্তির চর্চা, ষষ্ঠ শতক বা তার পরবর্তী সময়ে কিন্তু সমর্পণধর্মী হয়ে গেছিল। তৎকালীন সাহিত্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। তেলেগু কবি বেমনা বলছেন ‘চিত্তশুদ্ধি’-র কথা, মারাঠি কবি নামদেব বলছেন, জপ-তপ-তীর্থ উপবাসে কোনো সার্থকতা নেই, হৃদয় যদি পবিত্র না হয়। পরবর্তীতে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে এসে দেখা যায় কৃষ্ণ-ভক্তি এবং রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়ভক্তি। এখানে যদিও আচারসর্বস্বতা আছে। রাধা-কৃষ্ণের পূজার্চনা, বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হয়। বৈষ্ণবদের বিভিন্ন তিথি পালন অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গেই হয়। আর এই ভক্তিধর্মের চর্চাকে কেন্দ্র করে সারা ভারতে তৈরি হয়েছে মন্দির-মঠ-আশ্রম। এইসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত ভক্তির চর্চা চলে নৃত্য-নাট্য-সংগীত-পদসেবার মধ্যে দিয়ে।
অর্থাৎ আমরা দেখলাম ভক্তিধর্ম সবশেষে কৃষ্ণভক্তিতে এসে পৌঁছল। ভগবত গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবতপুরাণ, মীরাবাই, নানক, কবির, তুকারাম, জয়দেব, শ্রীরূপ গোস্বামী, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, প্রমুখের সাহিত্যে ভক্তিধর্ম বিস্তার পায়। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভক্তিতে ভক্তির চর্চার নানা পথ দেখা গেল। শ্রী চৈতন্যদেব প্রচারিত ভক্তিযোগের একটি বিশেষরূপ হরিনাম সংকীর্তন ও নগর কীর্তন। শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, বন্দন, শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুর্যের মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণভক্তি ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমই সর্বোচ্চ ভক্তির চর্চা হয়ে দেখা দিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই ভক্তির চর্চা বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাই নানা পূজাপার্বণের মধ্যে। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজাসহ সব অনুষ্ঠান-ই আসলে দ্রাবিড়-আর্য সংস্কৃতির সংমিশ্রন। পূজাভক্তি যেমন দ্রাবিড় সংস্কৃতির, তেমনি পূজাতে আচার নিয়ম, উপবাস যাগ-যজ্ঞ, অনুষ্ঠান এগুলো কিন্তু সব বৈদিক সংস্কৃতির অঙ্গ। তবে, ভক্তি চর্চার মাধ্যম কিন্তু বেড়েছে। এখন উন্নত প্রযুক্তিকে ভক্তি চর্চার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঘরে বসে ইউটিউব, ফেসবুক ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে কীর্তন, ভাগবতপাঠ, গীতাব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বক্তৃতা দেখা যায়। আবার মন্দির বা আশ্রম থেকে সরাসরি লাইভ আরতি, পূজা, কীর্তন সম্প্রচার করে ভক্তির চর্চা করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন যেমন, ইস্কন, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ নিয়মিত ভক্তি ও সাধনার কর্মসূচি পরিচালনা করেন। ব্যক্তিগত স্তরেও জপ, ধ্যান, আরতি স্মার্টফোনে মন্ত্রজপ, জপমালা অ্যাপ ব্যবহার করেও ভক্তির চর্চা করা হয়। অন্যদিকে শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন স্কুল, কলেজে যোগব্যায়াম, ধ্যান, শ্লোক পাঠের মাধ্যমে ভক্তির চর্চা হয়। ভ্যালু এডুকশন-এ ঈশ্বরচিন্তা, ভক্তির চর্চাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সময়ের হাত ধরে ভক্তির যতরকম রূপ এখন দেখা যায়, তার মুলে কিন্তু রয়েছে আর্য-অনার্য সংস্কৃতির মিলন-ই!