পুতিন কাছে এলেন বলেই ট্রাম্প দূরে গেলেন?
Trump: ২০২২ সালে ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকে রাশিয়ান তেল আমদানি ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।
এক পক্ষকে হাতে রাখতে গিয়ে আরেকপক্ষের গোসা সইতে হচ্ছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভারতের উপর নতুন (২৫%) শুল্ক আরোপের ঘোষণা তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ট্রাম্পের খেদোক্তির মধ্যে ভারতের রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়টি রয়েছে। ভারত মস্কোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি কূটনৈতিক মহলের৷ আর এই সদ্ভাবই ট্রাম্পের মাথাব্যথা।
ভারত-রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, এর শিকড় ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে প্রোথিত। তখন পশ্চিমা দেশগুলি থেকে সীমিত সাহায্য আসত ভারতে। ক্রমে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারত রাশিয়ার এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ভারতে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জামের ৫০%-এর বেশি রাশিয়া থেকে এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে সু-৩০এমকেআই ফাইটার জেট, টি-৯০ ট্যাঙ্ক এবং শক্তিশালী এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উপর ভারতের নির্ভরতা কেবল ঐতিহাসিক নয়, ব্যবহারিকও। রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভারতের জন্য পণ্যের মূল্য রেখেছে, তাদের ফ্রেক্সিবল পেমেন্ট নীতি এবং সময়মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি দুদেশের সম্পর্ককে এগিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মত, পশ্চিমা দেশগুলি প্রায়শই এই প্রাথমিক শর্তগুলি মানতে দ্বিধা করেছে। ব্রহ্মোস ক্রুজ মিসাইলের মতো যৌথ প্রকল্প আসলে সহ-উৎপাদন নীতির প্রতিফলন বলে মনে করে কূটনৈতিক মহল।
তবে, ইউক্রেন সংঘাতের কারণে ইদানিং রাশিয়া থেকে সরঞ্জাম সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভারতকে তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৈচিত্র্যবৃদ্ধি এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের অধীনে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে চায়।
আরও পড়ুন- ট্রাম্পের ফোন আসেনি, মাথা নত করেছিল পাকিস্তানই, বলছেন এস জয়শঙ্কর
২০২২ সালে ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকে রাশিয়ান তেল আমদানি ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আগে রাশিয়া ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির খুব স্বল্প অংশই সরবরাহ করত। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার শক্তি রপ্তানি সীমিত হলে মস্কো উল্লেখযোগ্য ছাড়ে তেল সরবরাহ শুরু করে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল গ্রাহক এবং ৮০%-এর বেশি আমদানি-নির্ভর ভারত এই সুযোগ গ্রহণ করে।
এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ কখনও কখনও ৪০%-এর বেশি হয়েছে। ভারত এই অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, ১৪০ কোটি নাগরিকের জন্য এই জোগান গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জোগানকেই 'থ্রেট' গণ্য করছেন ট্রাম্প।
ফলে একপ্রকার বলে-কয়েই ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় রপ্তানির উপর ২৫% শুল্ক এবং রাশিয়ান তেল ও অস্ত্র ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করেছে। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতিতে ভারত এই সাশ্রয়ী নীতিতেই টিকে থাকবে নাকি ট্রাম্পের চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে?
বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে জটিল ধাক্কা। ভারতকে এখন তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে। এই পরিস্থিতি ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার নতুন পরীক্ষা বললেও অত্যুক্তি হবে না।