নাজিব অন্তর্ধানের কিনারা করার কোনও দায়ই নেই এই দেশের?

Disappearance of Najeeb Ahmed: নাজিব আহমেদ ছিলেন বায়ো টেকনোলজির মেধাবী ছাত্র এবং ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি 'নিখোঁজ'।

অবশেষে নটে গাছটি মুড়লো। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের নাগরিক নাজিব আহমেদের অন্তর্ধান রহস্যের কিনারা করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিবিআইয়ের তদন্তের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল ৩০ জুন (২০২৫) মহামান্য আদালতের নির্দেশে। এই অসফল তদন্তের জন্য যাতে কেউ সিবিআইয়ের দিকে আঙুল তুলতে না পারে তাই মহামান্য আদালত সিবিআইকে তাদের রায়ে ক্লিনচিট দিয়ে রাখল:

"The quest for truth is the foundation of every criminal investigation, yet there are cases where the investigation conducted cannot achieves its logical conclusion, despite the best efforts of the investigating machinery"

সময় অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়, তাই আরেকবার মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে, নাজিব আহমেদ ছিলেন বায়ো টেকনোলজির মেধাবী ছাত্র এবং ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি 'নিখোঁজ'। নাজিব কোনও দিকশূন্যপুরের বাসিন্দা ছিলেন না। রাজধানী দিল্লিতে অবস্থিত দেশের অগ্রণী বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) মাহি-মান্ডভি হস্টেল থেকে তিনি নিখোঁজ হন। সেই সময় নাজিবের অন্তর্ধানকে ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল জেএনইউ-সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে নাজিবের জন্য আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর লাঠি চালায় পুলিশ। প্রথম দিন থেকে এই ঘটনায় অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে আগের রাতে নাজিবকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। নাজিবের মা ফাতিমা নাফিস যখন বসন্তকুঞ্জে এফআইআর করতে যান তখন সেখানকার চার্জে থাকা পুলিশ অফিসার পরামর্শ দেন, নাজিবকে কেন্দ্র করে হস্টেলে যে গোলমাল হয়েছিল তা এফআইআরে উল্লেখ করার দরকার নেই। পরবর্তী সময়ে নাজিবকে নিয়ে যখন ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয় তখন, দিল্লি পুলিশ প্রাথমিকভাবে এবিভিপির ৯ জন ছাত্রকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিন্তু তারপরে তদন্তের কোনও অগ্রগতি হয়নি। দিল্লি পুলিশ-প্রশাসনের উপর ভরসা রাখতে না পেরে নাজিবের মা ছেলে নিখোঁজ হওয়ার চল্লিশ দিন পরে, ২৫ নভেম্বর, ২০১৬, দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। সম্ভবত দিল্লি পুলিশের আচার-আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে হাইকোর্ট ১৬ মে, ২০১৭ নাজিব আহমেদ নিখোঁজের তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু বাস্তবে তাতে কোনও লাভ হয়নি। দিল্লি পুলিশের মতো সিবিআইও নাজিবের সন্ধান পায়নি। ২০১৮ সালেই তারা এই তদন্তকে 'ক্লোজ' করে দেয়। শুধু সন্তানহারা ফাতিমা নাফিসার নাছোড় মনোভাবের কারণে নাম কা ওয়াস্তে তদন্ত জারি ছিল। এতদিনে সেই তদন্ত বন্ধের প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিক সিলমোহর পড়ল। সোজা ভাষায়, এই রায়ের অর্থ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে অহরহ বিজ্ঞাপিত এদেশের আইনি ব্যবস্থার আর কোনও দায় রইল না গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সন্তানকে খুঁজে বার করার।

আরও পড়ুন- দুর্নীতি-অসততা নিয়ে সতর্ক করেন যাঁরা, এদেশে শাস্তি পান তাঁরাই!

নাজিব অন্তর্ধান মামলার এই পরিণতির সঙ্গে সহমত হওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না কারণ সিবিআইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া, ঘটনার প্রেক্ষাপট, তদন্ত চলাকালীন বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া আমাদের সন্দিহান করে তুলেছে। সেই সন্দেহের কারণগুলি আগে উল্লেখ করা দরকার।

প্রথমত, নাজিব যেদিন নিখোঁজ হন তার আগের দিন হস্টেলে বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদের চারজন ছাত্রের সঙ্গে তাঁর বচসা ও হাতাহাতি হয়। এবিভিপি ও প্রথম দিকে বিদ্যালয় প্রশাসন এই ঝামেলার কথা অস্বীকার করে কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনের চাপে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। চিফ প্রক্টর এ পি ডিমরির নেতৃত্বে গঠিত কমিটির রিপোর্ট তার পরে প্রকাশিত হয়। সেই রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় ঘটনার জন্য বিক্রান্ত কুমার, অঙ্কিত রা, সুনীল সিং ও বিজেন্দর ঠাকুর নামে চার ছাত্রকে দায়ী করা হয়। কিন্তু হস্টেল পরিবর্তন ছাড়া কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে অভিযুক্ত চার ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের এই নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে ডিমরি পদত্যাগ করেন।

দ্বিতীয়ত, নাজিবের মা নাফিসা বেগম বিভিন্ন সময়ে পুলিশ ও সিবিআইয়ের ভূমিকা সম্পর্কে যে অভিযোগ করেছিলেন, তার যথেষ্ট সারবত্তা আছে। নাফিসার বক্তব্য ছিল, তিনি যখন প্রথমে ছেলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে দিল্লির বসন্তকুঞ্জ পুলিশ স্টেশনে এফআইআর করতে যান তখন সেখানে উপস্থিত ডিউটি অফিসার বলেন বয়ানে কোনও অভিযুক্তের নাম না লিখতে, তাহলে দ্রুত তাঁর ছেলেকে খুঁজে দেওয়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব হবে। নাফিসার আরও অভিযোগ যে, যখনই তিনি পুলিশের বা তদন্ত প্রক্রিয়ার নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করার প্রস্তুতি নেন তখনই বলা হয় নাজিবকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে কোনও নতুন সূত্র পাওয়া গেছে। সকলের হয়তো মনে পড়বে যে, নাফিসা অনেকদিন আগে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছিলেন যে পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে ঘটনার রাতে একটি অটো রিকশা করে নাজিব জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমেছে। এমনকী এই অভিযোগও উঠেছে যে, একজন প্রভাবশালী এবিভিপি নেতার নামে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।

তৃতীয়ত, তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রথমে দিল্লি পুলিশ ও সিবিআই পরে যে ভূমিকা পালন করেছে তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থাকছে। বিভিন্ন সময়ে তদন্তকারী সংস্থাগুলো থেকে যে সমস্ত খবর প্রচার মাধ্যমে বেরিয়েছে তাতে নানা ধরনের সূত্র ও সম্ভাবনার কথা বলা হলেও তা কখনও নির্দিষ্ট অ্যাকশনে রূপান্তরিত হয়নি। নাজিব সম্পর্কে কোনও তথ্য জানানোর ইনাম এক লক্ষ থেকে দশ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ ১৯ নভেম্বর, ২০১৬ জেএনইউ ক্যাম্পাসে স্নিফার ডগ দিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে; কিন্তু ততদিনে দু' মাস কেটে গিয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো খানা-তল্লাশির নামে নাজিবের আত্মীয় স্বজনকে হেনস্থা করেছে— এমন অভিযোগও উঠেছে। সিবিআই তার রাজনৈতিক প্রভুদের মর্জিমতো তদন্ত প্রক্রিয়ার গতি প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, এ অভিযোগ নতুন নয়।

চতুর্থত, তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালীন একটা খবর সুকৌশলে প্রচার করা হয় যে, নাজিব ইসলামিক জেহাদি সংগঠন আইসিস (ISIS)-এর সদস্যপদ গ্রহণ করে সিরিয়া চলে গেছে। জনৈক যশবন্ত সিং নিজেকে বিজেপি সমর্থক পরিচয় দিয়ে প্রথম এই 'চমকপ্রদ' খবরটি টুইট করেন। পরে বিজেপির সর্বভারতীয় সম্পাদক রাম মাধব ও সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত 'খবর'-টি টুইট করেন। খবরের সঙ্গে ছিল জেএনইউ-এর বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ও সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ বিষোদ্গার কারণ নাজিবকে খুঁজে বার করার ব্যাপারে তারা প্রথম থেকে আন্দোলন করেছিল। পরবর্তীতে সংবাদটি ভুয়ো প্রমাণিত হয়।কিন্তু তার আগেই সংঘ ঘনিষ্ঠ টিভি চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যমের সৌজন্যে ভুয়ো খবরটি ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত হয়। কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা খবরটি প্রচার করেছিল তা আজও জানা যায়নি। ভুয়ো খবরে তাঁর পরিবারের সন্মানহানি হয়েছে, তাই নাজিবের মা বেশ কিছু টিভি চ্যানেল, একটি ইংরেজি সংবাদপত্র ও এবিভিপি নেতা সৌরভ শর্মার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেন। কিন্তু রহস্যময়ভাবে পাতিয়ালা হাউস কোর্ট থেকে সেই মামলার নথিপত্র হারিয়ে যায়।

আরও পড়ুন- প্রাপ্য শুধুই সহমর্মিতা! উমরের মুক্তি চেয়ে কি আদৌ জোট বাঁধবে দেশ?

পঞ্চমত, নাজিব অন্তর্ধানের প্রেক্ষাপটে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে তাও উদ্বেগের একটা বড় কারণ। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘ পরিবার তথা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মতাদর্শগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। শুধু মতাদর্শগত আক্রমণ বলা ভুল হবে, প্রশাসনের পরোক্ষ মদতে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের উপর বারংবার লেঠেল বাহিনীর দ্বারা শারীরিক ভাবে আক্রমণ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একদা দেশপ্রেমের প্রতীক হিসাবে ক্যাম্পাসে সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্ক বসানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীব্র করতে 'ইসলামিক টেররিসম' নামে এক নতুন কোর্স খোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কানহাইয়া কুমার, উমর খলিদ বিতর্ক আজও জীবন্ত। কিন্তু আক্রমণই শেষ কথা নয়। এই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ আজ সারা দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষদের কাছে অনুপ্রেরণা। তাই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্রের মারপিটের পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্যে চক্রান্ত থাকতেই পারে।

এতক্ষণের আলোচনা সংশয়াতীতভাবে দেখাচ্ছে যে, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াটাই নাজিবের ক্ষেত্রে বারেবারে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। অপরাধীকে আড়াল, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, জঙ্গি তকমা ইত্যাদি স্টিরিওটাইপ হাতিয়ারগুলো, পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও মিডিয়ার একাংশ আরও ভয়ানকভাবে নাজিবের মাকে ন্যায়বিচার পেতে বাধা দিয়েছে। একটা সভ্য সমাজে জলজ্যান্ত মানুষের এই কর্পূরের মতো উবে যাওয়া গণতন্ত্রের লজ্জা। তবে নাজিব কোনও ব্যতিক্রম নয়। ১৯৯৪ সালে কাশ্মীরে সন্তানহারা মা-বাবারা একটি সংগঠন তৈরি করেন, নাম 'Association for Parents of Disappeared person'। এই সংগঠন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বিপ্লবী কবি তথা রাজনৈতিক কর্মী সরোজ দত্তের আজও কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে জুটমিলের শ্রমিক ভিখারি পাসওয়ানের অন্তর্ধান রহস্যের আজও কিনারা হয়নি। সময়টা ছিল ১৯৭৮, আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপের আয়োজন চলছে। তখনও সামরিক শাসনের দমনপীড়নের ক্ষত বহন করেছে দেশের অত্যাচারিত মানুষেরা। হাজার হাজার বলপূর্বক নিখোঁজের সন্ধানে মা-বাবারা রাস্তায়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ভিদেলা যিনি মানুষকে নিখোঁজ করে দিতে ওস্তাদ ছিলেন, তাঁকে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এক ঝাঁক বিদেশি সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন 'বলপূর্বক নিখোঁজদের' সর্বশেষ অবস্থান জানতে। হাত উল্টে হাসতে হাসতে তিনি বলেছিলেন: "The disappeared do not exist, they are not alive or dead; they simply do not exist"। নাজিব আহমেদের পরিণতি বোধহয় সেই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।

More Articles