জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ্রকে বাঙালির মনে আছে?

Radha Gobindo Chandra : অল্প বয়স থেকেই মহাকাশ বিষয়ে রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের আগ্রহ ছিল প্রবল। জানা যায়, ষষ্ট শ্রেণিতে পড়বার সময়ে অক্ষয় কুমার দত্তের একটি প্রবন্ধ পড়ে রাধাগোবিন্দ মহাকাশচর্চার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন।

বাঙালি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে রাধাগোবিন্দ চন্দ্র  ছিলেন অন্যতম। অল্প বয়স থেকেই মহাকাশ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। জানা যায়, ষষ্ট শ্রেণিতে পড়বার সময়ে অক্ষয় কুমার দত্তের একটি প্রবন্ধ পড়ে রাধাগোবিন্দ মহাকাশচর্চার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। প্রবন্ধটির নাম ছিল ‘ব্রহ্মাণ্ড কী প্রকাণ্ড’। পরবর্তী সময় রাধাগোবিন্দ তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে এ- বিষয়ে লিখেছিলেন:

অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।

যশোরে, নিজের বাড়ির ছাদে দশ বছর বয়স থেকে রাতের আকশের দিকে তাকিয়ে নক্ষত্রদের বোঝার চেষ্টা করতেন তিনি। রাধাগোবিন্দের দশ বছর মানে, তখন ১৮৮৮ সাল। বলা বাহুল্য, বিজ্ঞানের আবিষ্কার এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তা ছিল না। ফলে, তথ্য ও প্রযুক্তিও আজকের মতন ছিল না তখন। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের রহস্যকে জানবার ইচ্ছা এতদূর প্রবল ছিল তাঁর যে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সেই তিনি মহাকাশ-বিষয়ে নিজের পড়াশোনার গভীরে প্রবেশ করেন।

আরও পড়ুন-

১১ বছর ধরে মহাকাশ স্ক্যান করে মানচিত্র! গায়া যেভাবে বদলে দিচ্ছে বিজ্ঞানীদের ধারণাও

এর বহু বছর, ১৯১০ সালে একটি ঘটনা ঘটে রাধাগোবিন্দের জীবনকে বদলে দেয়। তার আগে বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, ইত্যবসরে রাধাগোবিন্দ পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছেন। সেই সময়, একদিন রাতের আকাশে দেখা যায় হ্যালির ধুমকেতু। এখানে বলে রাখা উচিত, হ্যালির ধুমকেতু হল একমাত্র ধূমকেতু যা পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যায়। এবং বলা হয় একজন মানুষের পক্ষে তার জীবদ্দশায় দু-বার হ্যালির ধূমকেতু দেখা সম্ভব। প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে শেষ বার দেখা গিয়েছিল ধূমকেতুটিকে। আবার ২০৬১ সালে আবার দেখা যাবে। 

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

প্রসঙ্গে ফিরি, ১৯১০ রাধাগোবিন্দ হ্যালির ধূমকেতু প্রথমে খালি চোখে, পরে বাইনোকুলার দিয়ে দেখে, সে-সম্পর্কে এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ লেখেন। লেখাটি প্রকাশিত হয় ‘হিন্দু’ পত্রিকায়। এরপরই রাধাগোবিন্দের জীবন অন্য দিকে বাঁক নেয়। ১৯১২ সালে জমিজমা বিক্রি করে এবং মাইনের টাকা জমিয়ে অনেক কষ্টে একটি দূরবীন কেনেন রাধাগোবিন্দ। মহাকাশচর্চার জন্য ব্যক্তিগত জীবনে খুবই হিসেব করে চলতে হত তাঁকে। মধ্যবিত্ত বাঙালির সাংসারিক খরচের মধ্যে থেকে যেটুকু টাকা তিনি মহাকাশচর্চায় ব্যয় করতেন, তা একটি খাতায় লিখে রাখতেন।  সেই খাতার নথিপত্র থেকে জানা যায়,সে-সময় তাঁর কেনা দূরবীনটির দাম পড়েছিল ১৬০ টাকা ১০ আনা ৬ পাই। দূরবীন কেনার পর তাঁর খাতায় তিনি এ-কথাও লিখেছিলেন যে, সেই সময় তিনি আকাশের সমস্ত নক্ষত্রদের চিনতে পারতেন এবং সেই নক্ষত্রের লক্ষ্যে স্থাপন করতে পারতেন নিজের দূরবীন! 

আরও পড়ুন-

এবার মহাকাশে বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন! যে অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করছে চিন

এরও কয়েক বছর পর, ১৯১৮ সালের ৭ জুন রাধাগোবিন্দ আকাশে আচমকাই এক অপরিচিত নক্ষত্রকে দেখতে পান। পূর্বেই বলেছি, দূরবীন কেনার পর আকাশের বিস্তৃত নক্ষত্রমালা তাঁর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার যে বিরাট তারাটিকে রাধাগোবিন্দ দেখতে পেলেন তা আগে কখনো দেখেননি এবং তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে গেলেন! এবং শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলেন যে তাঁর দেখা তারাটি একটি নতুন নক্ষত্র! সঙ্গে-সঙ্গে তিনি হাভার্ড স্পেস সেন্টারে তাঁর দেখা নক্ষত্রটির বিষয়ে জানালেন। এবং এভাবেই আবিষ্কৃত হল নোভা অ্যাকুইলা-৩ । পরবর্তী সময়, ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে রাধাগোবিন্দ প্রায় ৩৭২১৫টি নক্ষত্রের গতিবিধি সম্পর্কিত তথ্য (AAVSO)কে প্রদান করেছিলেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ 'আমেরিকান এসোসিয়েসন অফ ভেরিয়েবল স্টার অবজারভার সেন্টার তাঁকে সম্মানীয় সদস্যপদ দেন। ১৮২৬ সালে  হাভার্ড স্পেস সেন্টার একটি ছয় ইঞ্চি ব্যাসের দূরবীন তাঁকে উপহারস্বরূপ পাঠায়। দূরবীনের সঙ্গে হাভার্ড স্পেস সেন্টারের পরিচালক হ্যারলো শ্যাপলির লেখা একটি চিঠি ছিল। চিঠিতে হ্যারলো লিখেছিলেন: 

অন্য দেশ থেকে বিভিন্ন নক্ষত্র সম্পর্কে আমরা যে সব পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য পেয়ে থাকি, তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

ফরাসি সরকার রাধাগোবিন্দ চন্দ্রকে ১৯২৮ সালে তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ OARF (Officer d'Academic Republic Francaise) পদক প্রদান করেন। এমন একজন আন্তর্জাতিক বাঙালি যে নিজের ভূমিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক বিজ্ঞানকাজ করে গেছেন, তাঁর সম্পর্কে আমরা কতটুকু খবর রাখি?

More Articles