ইন্দোনেশিয়ার পুতুলনাচ ‘ওয়ায়াং’-এর উৎস লুকিয়ে আছে ভারতেই?
Indonesian puppet show : পুতুল তৈরির জন্য তিন ধরনের চামড়া ব্যবহার করা হয়: হরিণ, দাগযুক্ত হরিণ ও ছাগল। হরিণের ত্বক শক্তিশালী এবং প্রতিরোধকারী। তাই এগুলো যোদ্ধা ভীম ও দশানন রাবণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
সভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ নিজেদের বিনোদন ও সৃজনশীলতার ঐতিহ্য বহনের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম অবলম্বন করেছে। সেইসব মাধ্যমের মধ্যে নৃত্য, গীত, অভিনয়, থিয়েটার ছাড়া পুতুলনাচও ছিল। এই শিল্পগুলিকে 'পারফর্মিং আর্টস'-ও বলা হয়।

ওয়ায়াং পুতুলনাচ
জাভা বা ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ছায়া পুতুল নাচ ‘ওয়ায়াং’ নামে খ্যাত। চামড়ার তৈরি পুতুলদের পর্দার পেছনে আলো ফেলে তার প্রতিবিম্ব দর্শকদের দেখানো হয়। এক্ষেত্রে অনেক ধরনের পুতুল আছে যা বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন আকার, আকৃতি, উচ্চতার দিক দিয়ে অনন্য শৈলীতে নির্মিত হয়। একটি কাঠের লাঠি বা রড সাধারণত পুতুলের পেছনে সংযুক্ত, সেগুলোকে নাট্যানুষ্ঠানের সময় কাজে লাগানো হয়। কখনো-কখনো একক অনুষ্ঠানের জন্য পাঁচশোটি পুতুলের একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে, এমন তথ্যও জানা যায়! এই পুতুলগুলো বিভিন্ন পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনিকে উপস্থাপন করে। এবং পুতুলগুলোর মধ্যে দিয়ে সেই নাট্যরূপ মঞ্চে উপস্থাপিত করা হয়।
ওয়ায়াং কুলিত নিঃসন্দেহে একটি জনপ্রিয় বিনোদন শিল্প। এটি গল্প বলার একটি প্রাচীন ধরন, যা বিস্তৃত পুতুলনাচ ও সংগীত শৈলীর জন্য পরিচিত।
আরও পড়ুন-
শক্তিমান থেকে আলিফ লায়লা, আরতি পালের মাটির পুতুল কেন এত জনপ্রিয়?
'ওয়ায়াং' শব্দটি ইন্দোনেশিয়ান শব্দ, যার অর্থ 'ছায়া'। এর দুটি প্রকার ভেদ হল: ওয়ায়াং কুলিত ও ওয়ায়াং গোলক। প্রথমটি চামড়ার পুতুল দ্বারা এবং দ্বিতীয়টি কাঠের ত্রিমাত্রিক পুতুল দ্বারা পরিবেশিত হয়। ওয়ায়াং কুলিত পরিবেশনাগুলি সাধারণভাবে বিশেষ অনুষ্ঠানে বা উৎসবে আয়োজন করা হয়। প্রধানত, রামায়ণ, মহাভারত এবং স্থানীয় কিংবদন্তির গল্প এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এই নাট্য পরিবেশনায় সাধারণত 'গ্যামলান অর্কেস্ট্রা' নামক বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়, যা ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবেশন করে। গ্রামীণ শিশু, কিশোর, যুবক সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই পুতুল নাচ খুবই জনপ্রিয়। মানুষের মতো করে, পুতুলগুলো হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনা, রাগ, দু:খ ইত্যাদির অভিনয় করে দর্শকের প্রশংসা পায়।

ইন্দোনেশিয়ায়র পুতুলনাচ
পুতুল নাচ হল নাটকীয় অভিব্যক্তির একটি রূপ। এটি লোকনাট্যের প্রাচীন মাধ্যম। ইংরেজিতে একে বলা হয় 'পাপেট শো' বা ' পাপেট থিয়েটার'। ইন্দোনেশিয়ার পুতুল নাচ বিনোদনের ক্ষেত্রে অন্ধ্রপ্রদেশের 'থোলু বোম্মালতা' থিয়েটারের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। 'থোলু'-র অর্থ চামড়া, ' বোমলতা-র অর্থ পুতুল। আক্ষরিক অর্থ, চামড়ার পুতুলের নাচ। যারা গ্রামে-গ্রামে গিয়ে লোকগান গায়, ভাগ্যবিচার করে, তাবিজ বিক্রি করে, এরকম মানুষজনও নাট্যানুষ্ঠানে অংশ নেয়। রেডিও, টেলিভিশনের যুগের বহু আগে থেকেই এরা সংস্কৃত মহাকাব্য ও স্থানীয় লোককাহিনি সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করে আসছে। মহাকাব্যের বিভিন্ন গল্পগুলো আসলে এইসব নাট্যানুষ্ঠানের উৎস।
আরও পড়ুন-
মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে
পুতুল তৈরির জন্য তিন ধরনের চামড়া ব্যবহার করা হয়: হরিণ, দাগযুক্ত হরিণ ও ছাগল। হরিণের ত্বক শক্তিশালী এবং প্রতিরোধকারী। তাই এগুলো যোদ্ধা ভীম ও দশানন রাবণের জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য সমস্ত পুতুলগুলো সাধারণত ছাগলের ত্বক থেকে তৈরি, স্থানীয়ভাবে যা সহজেই পাওয়া যায়। তবে রাবণের জন্য একাধিক চামড়ার প্রয়োজন হয়: একটি শরীরের জন্য, একটি পায়ের, একটি প্রতিটি বাহুতে!

ওয়ায়াং-এর পুতুল
থোলু বোম্মালতা অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার একটি প্রাচীন ছায়াপুতুলের নাট্যরূপ। এই শিল্প দু-হাজার বছরের পুরনো। অন্ধ্রপ্রদেশের লোক লোকসংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ হল রামায়ণ, মহাভারত আশ্রিত চামড়ার পুতুল নাচ। একে অনেকেই ইন্দোনেশিয়ার ছায়া পুতুল নাচের অন্যতম উৎস বলেছেন। ইন্দোনেশিয়ার এই শিল্পকলা মালএশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস প্রভৃতি দেশেও ইতিহাস প্রসিদ্ধ। তাই বলা যায় যে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার পুতুল নাচের সংস্কৃতিতে ভারতীয় সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।