দোস্তি বনি রহে

Trump-Modi Friendship: বারবার এক অপরের বক্ষলগ্ন হয়ে সমাজমাধ্যমে ছবি প্রচার করেছেন। জোর গলায় দাবি করেছেন, আমরা বন্ধু। কিন্তু এ কেমন ঘনিষ্ঠতা যেখানে পিছন থেকে নয় সামনে থেকেই ‘বন্ধু'র পিঠে ছুরি মারা যায়?

হাত বাড়ালেই বন্ধু সবাই হয় না। কিন্তু যে সখ্য ও সমঝোতা আমরা দেখে আসছি বছরের পর বছর, তাকে কী নামে ডাকব? মোদী-ট্রাম্পের সম্পর্কের ভিয়েন নিয়ে প্রশ্নটা উঠছে, ভারতের উপর ট্রাম্প ২৫% পণ্যশুল্ক এবং জরিমানা চাপানোর পর। এই ট্রাম্পের প্রচারে বারবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছুটে গিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। বারবার এক অপরের বক্ষলগ্ন হয়ে সমাজমাধ্যমে ছবি প্রচার করেছেন। জোর গলায় দাবি করেছেন, আমরা বন্ধু। কিন্তু এ কেমন ঘনিষ্ঠতা যেখানে পিছন থেকে নয় সামনে থেকেই ‘বন্ধু'কে ছুরি মারা যায়? দার্শনিকরা এমন বন্ধুত্বের তল পেয়েছেন কি?

অ্যারিস্টটল বলেছেন, বন্ধুত্ব তিন রকম। একরকমের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে শুধুই ফূর্তির জন্য, ফ্রেন্ডশিপ অফ প্লেজার। অন্য আরেক ধরনের বন্ধুত্বে দুই পক্ষই মিতালিকে কাজে লাগায় কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধের জন্য। সেই সুবিধা নেওয়া ফুরিয়ে গেলে বন্ধুত্বের দাবিও ফিকে হয়ে যায়, একে অন্যেকে গোল্লায় যাও বলা যায়। আর এক ধরনের বন্ধুত্ব রয়েছে যা কখনও সখনও চিরস্থায়ী হতে পারে। অ্যারিস্টটলের ভাষায় তা সদগুণের বন্ধুত্ব। ট্রাম্প মোদীর বন্ধুত্ব দার্শনিক জায়গা থেকে দেখলে তা ওই মধ্যপন্থার। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক লাভের জন্য একে অন্যের আলোকছটা শুষে নেওয়ার বন্ধুত্ব।

Trump Modi Friendship

মোদী-ট্রাম্পের বন্ধুত্ব

সাম্প্রতিক অতীতে বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর কথাটা বলেই ফেলেছিলেন। বহুভাষাবিদ জয়শঙ্করের কথায়, “আসলে এক জাতীয়তাবাদী আর এক জাতীয়তাবাদীকে এইভাবেই সম্মান প্রদর্শন করে। একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে।” একথাটির খোসা ছাড়িয়ে নির্যাসটুকু পড়তে চাইলে বোঝা যাবে, আসলে জাতীয়তাবাদকে শিখণ্ডী করে প্রচার ও প্রসারের দুই রাজনেতাই যে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে চেয়েছিলেন, তাতে একে অন্যের নিরঙ্কুশ সহযোগিতা দরকার ছিল। আর সে কারণেই টেক্সাসের হিউস্টনে হাউডি মোদীর আয়োজন। মোদী বারবার বলেছেন, আমেরিকাকে ফের মহান করে তোলার জন্য ট্রাম্পের তাগিদ নাকি তাঁকে অভিভূত করে। ট্রাম্প নিশ্চয় স্মৃতিধর, তাই ভারতকে বংশদন্ড হাতে ধরিয়ে দেওয়ার সময় তিনি তাঁর বিবৃতির শেষে জুড়ে দিয়েছেন একটি অমোঘ শব্দবন্ধ MAGA, যার অর্থ মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন।

Modi Hugs Trump

মোদীর বক্ষলগ্ন ট্রাম্প

শেষ কয়েক বছরে বন্ধুত্বের নিদর্শন রাখতে ট্রাম্প মোদী কোনোপক্ষই কোনো কসুর করেনি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদীর নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম উদ্বোধন করতে সপরিবারে ভারতে এসেছেন ট্রাম্প। প্রতিবার ট্রাম্পের জয়ের পর মোদী সমাজমধ্যমে জয়োল্লাসে ফেটে পড়েছেন, আবার ট্রাম্পও মোদীর নাম মুখে আনার সময় ‘বন্ধু’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন। সেই ট্রাম্পই ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্কনীতি চাপিয়ে দিলেন। পাকিস্তান বাংলাদেশের উপর চাপানো হল ১৯ ও ২০ শতাংশ। ভারতকে সবক শেখাতে চাপালেন জরিমানাও। রাশিয়ার সঙ্গে সখ্যের 'শাস্তি'।

ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদী

আসলে যে বন্ধুত্ব শুধুই ব্যবহারিক সেখানে স্বার্থের বাইরে কোনোপক্ষই একটি পা-ও ফেলে না। চিনের সঙ্গে পাকিস্তানের নৈকট্যকে রোধ করতে ট্রাম্পের দরকার পাকিস্তানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। পাকিস্তানের নতুন সরকার মার্কিন 'পাপেট' বললে অত্যুক্তি হবে না। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সম্প্রতি রাশিয়াকে ইউক্রেন প্রশ্নে কোনঠাসা করতে শুরু করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। সেই রাশিয়া থেকেই ভারত যখন সস্তা দরে জ্বালানি কিনছে, ট্রাম্প তখন বন্ধুত্বের যাবতীয় পুরোনো প্রথা, রীতিনীতি বিসর্জন দিতে একবারও দ্বিধা করছেন না। স্টেপআউট করে বলছেন, ভারতের অর্থনীতি মৃতপ্রায়। ভারত-রাশিয়া গোল্লায় যাক!

ভারতবর্ষে উগ্র জাতীয়তাবাদী হওয়া বইয়ে দিতে নরেন্দ্র মোদীর যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো উত্তর-সত্যে বিশ্বাসী রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজন ছিল, তেমনই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রয়োজন ছিল মোদীর মতো একজন নেতা। যিনি ভোট এলে একদিকে নিজেকে যেমন বিশ্বগুরু সাজিয়ে তোলেন, অন্যদিকে ঠিক ট্রাম্পের ঢংয়েই অপরায়ন শুরু করেন। “ওদের বেশি বাচ্চা”, “ঘুসপেটিয়া” শব্দগুলি আকছার বলেন জনসভায় দাঁড়িয়ে। এমনকি আজ যেমন মোদীর ভারতে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে একদল মানুষকে ‘ঘাড়ধাক্কা’ দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তেমনই বেনাগরিক দাগিয়ে ট্রাম্পের আমেরিকা থেকে তাড়ানো হয়েছিল বহু সাধারণ মানুষকে। হাতে হাতকড়া, পায়ে শিকল বেঁধে যখন কয়েকশো ভারতীয়কে অমৃতসর ফেরত পাঠাল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কিচ্ছুটি বলেননি মোদী। কারণ ভয় দেখানো, খেদানো, দূরে ঠেলে দেওয়ার রাজনীতিতে তাঁরা একে অন্যের পরিপূরক। যে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করতে পারেন মেক্সিকান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বক্তব্য মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির প্রচারকৌশলের সঙ্গে কেমন মিলে যায়।

এই বন্ধুত্ব ঠিক এমন দেওয়া-নেওয়ারই। সেই দেওয়া-নেওয়া ফুরোলে কী পড়ে থাকে? আজ যখন আসীম মুনিরের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারছেন ট্রাম্প, মুখে বলছেন: ভারত গোল্লায় যাক, মোদীকে বন্ধুত্বের জন্যে খোঁটা দিচ্ছে তামাম বিরোধীরা, মোদী ট্রাম্পকে নিভৃত আলাপে কী বলবেন? অভিমান দেখাবেন? নাকি বলবেন দোস্তি বনি রহে?

More Articles