বাঙালির প্রিয় জিলিপির আসল দেশ কোথায়?

History Of Jilipi : বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রসময় খাদ্যটির কবে প্রথম এসেছিল ভারতে? এক্ষেত্রে আমাদের মনে করে নিতে হবে একটি বইয়ের কথা। বইটির নাম: ‘কিতাব-উল-তাবিখ’।

জিলিপি-র সঙ্গে বাঙালির প্রেমবন্ধুত্ব অনেক দিনের। ছোট হোক কিংবা বড়, ঠোঙা-ভর্তি জিলিপি দেখামাত্রই মন আনন্দে ভরে যায় না, এমন লোক প্রায় নেই বললেই চলে। রথের মেলা দেখতে গিয়ে জিলিপি কিনে খাওয়া, অথবা বৃষ্টির দিন সন্ধেবেলা পাড়ার দোকান থেকে জিলিপি নিয়ে বাড়ি এসে সবার সঙ্গে ভাগ করে গল্প করতে বসা, এসবই আমাদের পরিচিত আনন্দদৃশ্য। বাঙালির পছন্দের তালিকা অনেক রকম! দোকানে দাঁড়িয়েই কেউ চান পোড়া লাল রঙের জিলিপি, কারোর আবার সোনা রংয়ের দিকেই চোখ! কেউ-কেউ আবার জিলিপি বাড়ি নিয়ে এসে কিছুটা খান। কিছুটা রেখে দেন। বলেন, বাসি জিলিপির স্বাদ-ই আলাদা!

আরও পড়ুন-

ভুল করে মিষ্টি পুড়িয়ে ফেলেই জন্ম বিখ্যাত ডেজার্টের! শেষপাতে মিষ্টিমুখের শিকড় ফ্রান্সেই?

বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রসময় খাদ্যটির কবে প্রথম এসেছিল ভারতে? এক্ষেত্রে আমাদের মনে করে নিতে হবে একটি বইয়ের কথা। বইটির নাম: ‘কিতাব-উল-তাবিখ’। না, এই বইটি ভারতে লেখা হয়নি। এবং বলা ভালো, এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি রান্নার বই, যা দশম শতকের শুরুর দিকেই লেখা শুরু হয়। মুহম্মদ বিন হাসান আল-বাগদাদী ‘কিতাব-উল-তাবিখ’-এ উল্লেখ করেছেন বাঙালির অতি প্রিয় জিলিপির এক বয়স্ক আত্মীয়ের নাম, যা হল: ‘জুলবিয়া’। আবার প্রায় একই সময়কালে রচিত অন্য একটি রান্নার বইতেও এই নামটিই দেখতে পাওয়া যায়। ‘জুলবিয়া’ আসলে কী? জানা যায়, ইরানে রমযান মাসে গরিব মিসকিনদের মাঝে এই খাবার বিতরণ করা হত। বলা বাহুল্য, এখনও ইরানে গেলে সহজেই এই রসময় খাদ্যটি চোখে পড়বে। বিশেষত, ইরানে নব্বর্ষের সময় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ‘জুলবিয়া’ বানানোর রীতি রয়েছে।

বাঙালির জিলিপি

আমাদের ঘরের লোক, সন্ধেবেলার সুপরিচিত 'জিলিপি'-র সঙ্গে ‘জুলবিয়া’-র কিছু পার্থক্য রয়েছে। জিলিপি কীভাবে বানানো হয়, তা প্রায় কম-বেশি আমরা সকলেই দেখেছি দোকানের দাঁড়িয়ে। জিলিপির মন হল দুই কিংবা আড়াই প্যাঁচের। হ্যাঁ, এই অপূর্ব জটিলতা জিলিপিকে মানায়। অপর দিকে, 'জুলবিয়া' দেখতে হয় অনেকটা ফুলের মতন। ভিন্নতার এখানেই শেষ নয়, ইরান থেকে একটু মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যেতেই আমাদের জিলিপি, ইরানের 'জুলবিয়া' নাম পালটে হয়ে যান 'জালবিয়া'। শুধু কি নামের পরিবর্তন? না। চিনির রসের বদলে মধ্যপ্রাচ্যে 'জালবিয়া' পরিবেশন করা হয় মধু ও গোলাপ জলের মধ্যে ডুবিয়ে। ব্যাপারই আলাদা!

অমৃতি

ওসব ভেবে কাজ নেই। আমরা বরং দেশে ফিরি। জানা যায়, মধ্যযুগে পার্সিরা ব্যবসার জন্য ভারতে আসতে শুরু করেন। এবং সেই সময়ই এ-দেশে প্রবেশ করে আমাদের অতি প্রিয় জিলিপি। বলা বাহুল্য, রূপে-স্বাদে অত্যন্ত গুণবতী হওয়ায় ভারতে আসার কিছুদিন পরেই সারা দেশে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই মিষ্টান্ন! যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখতে পাব, ১৪৫০ সালে জিনাসুরার লেখা এক জৈন গ্রন্থে জিলিপির উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থটির নাম: ‘প্রিয়মকর্ণপকথ’। জানা যায়, ভারতের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থেই প্রথম জিলিপির কথা লিপিবদ্ধ হয়েছিল।

ছানার জিলিপি

কিন্তু তখন এই মিষ্টির নাম 'জিলিপি' ছিল না। কী ছিল তাহলে? ‘জলভাল্লিকা’ বা ‘কুণ্ডলিকা’। আরও জানা যায়, এর কিছু সময় পরে লেখা বেশ কয়েকটি সংস্কৃত গ্রন্থেও জিলিপির উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থগুলি হল: ‘গুণাগুণবোধিনী’, ‘ভোজন কুতূহল’। বলবার মতো বিষয় হল, এই সংস্কৃত গ্রন্থগুলিতে জিলিপি তৈরির যে পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়, সেই পদ্ধতিতেই এখনও তৈরি হয় জিলিপি। এবং এখানে উল্লেখ করা উচিত, পনেরো’শ শতকের প্রথম দিক থেকেই জিলিপিকে সারা দেশের নানা আচার অনুষ্ঠান ও মন্দিরের ভোগ সামগ্রীতে ব্যবহার করা শুরু হয়ে যায়।

আরও পড়ুন-

গাড়ি থামিয়ে মিষ্টি কিনতেন উত্তম কুমার, কী ভাবে বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠল জনাইয়ের মনোহরা?

ইসলামিক দেশ থেকে আসা, এমনকী সেই দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এই মিষ্টান্নকে সেদিনকার ভারত নিজের করে নিয়েছিল। এটাই তো স্বাভাবিক! সময় যত এগিয়েছে, ভারত ও তার পাশের দেশগুলিতেও জিলিপির রসস্বাদ ছড়িয়ে পড়েছে। পালটে গেছে নাম ও রূপ। যেমন, বাংলাদেশের ঢাকায় একরকমের জিলিপ পাওয়া যায়, যার নাম: শাহী জিলিপি। আবার ময়মনসিংহ-তে চালের গুড়োর সঙ্গে তেতুলের টক মিশিয়ে বানানো হয়: টক জিলিপি। জিলিপিকে উত্তর ভারতে ডাকা হয় ‘জালেবি’ নামে। দক্ষিন ভারতে জিলিপির নাম : জিলেবি। এর মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশে জিলিপির আকার ও রূপ কিছুটা পালটে গেছে। নাম হয়েছে: ‘ইমারতি’। এই ইমারতিকেই আমরা বাংলায় ‘অমৃতি’ বলে জানি। নাম বদলেছে। রূপ বদলেছে। কিন্তু এই বিস্তৃত  উপমহাদেশের জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য আনন্দস্বাদ হিসেবে রয়েই গেছে জিলিপি!

More Articles