কালিয়াচকের পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখকে যেভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হল

Amir Sheikh: 'বাঙালি' পরিচয় দেওয়ার পরেই তাঁকে 'বাংলাদেশি' তকমা দেওয়া শুরু হয়। আধার কার্ড, জন্মের শংসাপত্র দাখিল করেও লাভ হয়নি।

সাতদিন খোঁজ নেই তাঁর। সে জীবিত না মৃত জানে না পরিবার। ভিনরাজ্যে বাংলাদেশি সন্দেহে বাঙালি শ্রমিক কারিগরদের ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় সংযোজন আমির শেখের নাম। এর আগেও বাংলাদেশে ঢুকতে বাধ্য করার ঘটনা সামনে এসেছে। তবে অভিযোগ আমিরকে বাংলাদেশে খেদানো হয়েছে বন্দুকের নলের মুখে রেখে। তাঁকে ভিডিয়োয় দেখতে পেলেও তাঁর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ হয়নি তাঁর পরিবারের।

মাস তিনেক আগে একুশ বছর বয়সি আমির রাজস্থানে গিয়েছিল রাস্তা তৈরির কাজে। মাস খানেক সেখানে কাজ করার পর রাজস্থান পুলিশ তাঁকে রাস্তায় গাড়ি থেকে নামিয়ে আটক করে। 'বাঙালি' পরিচয় দেওয়ার পরেই তাঁকে 'বাংলাদেশি' তকমা দেওয়া শুরু হয়। আধার কার্ড, জন্মের শংসাপত্র দাখিল করেও লাভ হয়নি। ফোন আসে আমিরের বাবার কাছে। আমিরের বাবা দলিল-সহ সব প্রমাণ দাখিল করে। চারদিন থানায় রাখার পর দু'মাসের জন্য আমিরকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, অভিযোগ জিয়েম শেখের। পুলিশ দীর্ঘদিন জিয়েম শেখকে কোনো তথ্য দেয়নি। বিএসএফ-এর হাতে আমিরকে হস্তান্তর করার সময় নিজের ছেলেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পান জিয়েম শেখ। 

আরও পড়ুন- বাস্তুচ্যুত ৩ হাজার ৫০০টি পরিবার! অসমের মুসলিমদের সঙ্গে কী ঘটছে?

জিয়েম শেখ শুধু জানেন বসিরহাট থেকে আমিরকে সাতক্ষীরায় ডিপোর্ট করা হয়েছে। জিয়েম শেখ বলেন, "বর্ডারে বিএসএফ আগে আমার ছেলেকে মেরেছে তারপর গলায় বন্দুক ঢেকিয়ে বলেছে, 'বাংলাদেশ জায়গা নাহি তো গোলি কার দেয়গা'।"

বাড়ির দলিল

জিয়েম শেখ প্রশ্ন তুলেছেন, "ভারতের নাগরিক হয়েও যদি আমাদের এই রকম অত্যাচার সহ্য করতে হয়, কোথায় যাব আমরা? কোন দেশে আছি আমরা? কেন উপর উপর প্রচার করা হচ্ছে? কেন বাংলাভাষা বলার জন্য অত্যাচার সহ্য করতে হবে? বাংলা ভাষা বলাটাই কি অপরাধ আমাদের? আমার ছেলেকে ফেরাতে কেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না?"

জিয়েম শেখ স্পষ্ট বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কাজ নেই তাই আমাদের বাইরে কাজ করতে যেতে হয়। তিনি জানান, একটা সময় তিনিও বাইরে কাজ করতেন। অভাবী সংসার, পরিবার তো চালাতে হবে তাই তাঁদের বাইরে কাজ করতে যেতেই হয়। তিনি দাবি করেছেন, বাংলা ভাষা বলার জন্যই আমার ছেলের উপর অত্যাচার করা হয়েছে। জিয়েম শেখ, ইনস্ক্রিপ্ট-এর মাধ্যমে প্রশাসনকে অনুরোধ করতে চাইছেন, তাঁর ছেলেকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে চাই, এই অত্যাচারের যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়, তা দেখা হোক। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, আমার ছেলেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।"

আরও পড়ুন-বাঙালির রক্তে স্বাধীন হওয়া ভারতে, আমরাই গণহত্যার দ্বারপ্রান্তে

উল্লেখ্য, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউমান রাইটস ওয়াচও বলছে, ভারতের কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শয়ে শয়ে বাংলাভাষি মুসলিমদের 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' অভিযোগ তুলে বাংলাদেশে পুশব্যাক করছে। সংস্থাটি এই নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসের ৭ তারিখ থেকে জুনের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ভারত থেকে দেড় হাজারেরও বেশি মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে। এর মধ্যে মায়ানমার থেকে আসা প্রায় একশো জন রোহিঙ্গা শরণার্থীও আছেন। তবে সরকার তরফে এই নিয়ে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। হিউমান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এই তথ্য তারা পেয়েছে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (বিজিবি)-র থেকে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন এই অপরায়ন? ভোটের আগে মুসলিম সমাজকে কোনঠাসা প্রতিপন্ন করা আর হিন্দুত্বের হাত শক্ত করাই কি এর উদ্দেশ্য? কেন সরকারি প্রতিনিধিরা এই নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করছে না? মনুষ্যত্বের এই অবমাননার শেষ কোথায়?

More Articles