শিশু থেকে অশীতিপর, সকলের মাঝে 'অপূর্ব' একা কারা?

Loneliness: আমাদের সকলেরই বেঁচে থাকার সিলেবাসে একটা করে একাকিত্বের অধ্যায় আছে। সব কথা যেমন ভাষায় বলা যায় না তেমনি একাকিত্বেরও আছে অনেক না বলা কথা।

পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তরে আটলান্টিক— দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম কোল ঘেঁষে এই দেশটার নাম কলম্বিয়া। বিশ্ব ফুটবলের প্রতিযোগিতার সময় বারবার উঠে আসে এই দেশটির নাম। শুধু ফুটবল নয় এ-দেশের সঙ্গে জুড়ে আছেন এক বিশ্বজয়ী সাহিত্যিক, যার নাম গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কয়েজ। তাঁর পৃথিবী বিখ্যাত বইয়ের নাম বাংলা তর্জমায় ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ — নিঃসঙ্গতা তাও আবার একশো বছরের! অন্য ধরনের এই উপন্যাসিক তাঁর মতো করে মানুষের নিঃসঙ্গতার ধরন-ধারণ বিছিয়ে দিয়েছেন তাঁর লেখায়।

'একশো বছরের নিঃসঙ্গতা'

আমরা সবাই তাঁর মতো সাহিত্যিক নই, সকলেরই দেশ-বিদেশের সাহিত্য পড়ে ওঠার সুযোগ নেই। কিন্তু তা বলে কি আমাদের জীবনে কোথাও কখনো  নিঃসঙ্গতা চুপিসাড়ে ঢুকে পড়া না?  সুকুমার রায় লিখেছিলেন বয়স হলে মানুষ ‘হোৎকা’ হয়ে যায়, আর খুব চেনা একটা গানে আমরা শুনেছিলাম : 'বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয়/ হাঁটতে-হাঁটতে একলা লাগে।' একটা বয়সের পর আমরা মনে মনে একা হয়ে যাই। অনেকটা চুলে পাক-ধরা বা চোখের চালশে পড়ার মতোই। তাই বলে কি এই একাকিত্ব শুধুই বড়োদের ব্যাপার?  এমনটা যাঁরা মনে করেন আমি মোটেও তাঁদের দলে নেই। এক ছোট্ট শিশু একমনে শুয়ে খেলা করতে-করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিছুক্ষণ বাদে ঘুম ভেঙে দেখল, পাশে মা নেই। ছোট্ট চার দেওয়ালের মা-সর্বস্ব পৃথিবীতে বাকি সবকিছুই তার অচেনা,  স্বাভাবিক নিরাপত্তাহীনতার বোধে কেঁদে ওঠে ওই শিশুটি। কিন্তু এই কান্নার গভীরে থাকে তার এক চিলতে একাকিত্বের বেদনা, যে নিঃসঙ্গতা কেবল কান্নাতেই অনূদিত হতে জানে।

আরও পড়ুন-

মৃত্যুর মুখোমুখি কি কবিতা হাতে দাঁড়ানো যায়? জয় গোস্বামী

যে-কিশোর জানলার বাইরে মুখ করে বসে আছে একা-একা, যার খেলার সাথী হঠাৎই অনুপস্থিত — খুব বড়ো গলা করে বলতে পারব এই বসে থাকার মধ্যে কোনো একাকিত্বের বোধ নেই?  এরকমই এক গোপন নিঃসঙ্গতা ঘিরে ছিল আমাদের সবার চেনা ‘ডাকঘর’-এর ‘অমল’-কে — ঠাকুরদা, চিকিৎসক আর তাকে আগলে-রাখা বাকিদের আড়াল দিয়ে সে অপেক্ষা করত রাজার চিঠির। ছেলেবেলায় পড়া  ‘ডাকঘর’  পরে নতুন করে পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে কিশোর অমলের এই নিঃসঙ্গতার পরিপূরক, তার অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষাতেই  এই নাটক পরিণতি পায়। একটু যদি অন্যরকম ভাবে ভাবতে চাই ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবির ওই দৃশ্যটা — বেসুরো গান গাইবার অপরাধে গুপিকে গাধার পিঠে চাপিয়ে গ্রাম ছাড়া করছেন জমিদার, গাধার পিঠে নিচু মুখে বসে থাকা তরুণটির মনের অপমান আর ব্যথার পাশে কোথাও কি ছিল না এক ধরনের একাকিত্বের শূন্যতা?  একটু পটবদল করে খুঁজে পাচ্ছি এক কিশোর ছাত্রকে যাকে লম্বা স্কুল বাড়ির বারান্দায় নীলডাউন করে রেখেছেন ক্লাসের ‘শাস্তিপ্রিয় জমিদার’ মাস্টারমশাই। সকলের চোখের উপর তাঁর এই অপমানের ভেতর কি চুঁইয়ে-চুঁইয়ে আসতে পারে একটা একাকিত্ব ? বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা ? বেপরোয়া দাবিতে সন্তান-সন্ততিতে গায়ে হাত তোলার আগে এটা আমরা ভেবে দেখছি তো!

জয় গোস্বামী

সবজান্তা অভিভাবকদের ওপর এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার ভার দিয়ে আমরা চলে আসি অন্য প্রান্তে। এই যারা দেখছি দল বেঁধে হই হই হই হই হই করে চলেছে স্কুলের পথে অথবা ছোটো একটা দল প্রাইভেট কোচিং সেরে জটলা করছে রাস্তায়। কারো সামনে পরীক্ষা, বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি, অথচ বাড়িতে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেই পড়ার টেবিলে বসে একা-একা পড়া, মা-বাবা নিজের-নিজের কাজে মশগুল, একটা কোনো কথা বলার বন্ধু নেই । ভাল্লাগে না , ভাল্লাগে না। তার থেকে এই বন্ধুদের সঙ্গ যতক্ষণ উপভোগ করা যায়! নিশা আর রুদ্র-র কথার ফুরোয় না— এমনকী দুজনে দুদিকের বাসে উঠে বাড়ির পথ ধরার পরেও, বার দুয়েক ওদের মোবাইল বাজবেই বাজবে।  এইসব  টুকরো দৃশ্য যারা দেখতে পায় না তারাই আগ বাড়িয়ে বলতে চায় নিঃসঙ্গতার কি বোঝে ছোটোরা! পড়াশোনা স্কুল কোচিং ক্লাস সিলেবাস এই সব কিছুর মাঝখানে হারিয়ে ফেলা অবসরে কিশোর কিশোরীদের যে একলা হওয়ার বোধ থাকতেই পারে না !  এমনটা যাঁরা ভাবেন তাঁরা কি মনে করেন বড়োদের নিঃসঙ্গতা অনুভব করার কোনো পিরিয়ড আছে?

 

রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর'

আসলে সত্যি কথাটা স্পষ্ট করে বলাই ভাল। আমাদের সকলেরই বেঁচে থাকার সিলেবাসে একটা করে একাকিত্বের অধ্যায় আছে। সব কথা যেমন ভাষায় বলা যায় না তেমনি একাকিত্বেরও আছে অনেক না বলা কথা। আকাশ, তার মেঘগুলোকে সরিয়ে দিয়ে কীভাবে একলা হতে চায় আমরা কি তার খবর রাখি সবসময় ? আমরা কি চিনতে পারি ব্যস্ততা কোলাহলের মধ্যে থেকেও চওড়া হওয়া একাকিত্বের সেই একফালি জমি ?  রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেন ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’ — হ্যাঁ, এইখানে এসে আমরা খুঁজে পেলাম একটা মোক্ষম কথা : একার বিশেষণ হয়ে উঠল 'অপূর্ব' । আমরা এতদিনে এরকমই ভেবে নিয়েছিলাম নিঃসঙ্গতা মানে বোধহয় একটা মেঘে ছাওয়া মনখারাপ, একটা স্থানু আর নিরুদ্যোগ অবস্থান;  নিঃসঙ্গতা মানে  কিচ্ছু না করতে ইচ্ছা করা, একরকম প্রতিকারহীন গুমরে-গুমরে মরা। তাহলে সেই একাকিত্বকে কেন বলা হবে ‘অপূর্ব’, তার ভিতরে কি আনন্দের উৎস আছে ? সেই আনন্দ আসলে একলা থাকার উদযাপন !

রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে এমন অনেক ইঙ্গিতময় গানের লাইন আমরা পেয়ে যাব। আর এখান থেকে খুব সহজভাবে আমরা পৌঁছে যেতে পারি একাকিত্বের সেই কিনারায় যেখানে 'একা থাকা' মানে কিছু পাওয়া, কিছু অর্জন করে নেওয়া। আচ্ছা, প্রতিদিনের গড়িয়ে চলা ছক বাঁধা ব্যস্ততার মধ্যে আমাদের কি নিজস্ব কিছুটা সময়ের দরকার, যে সময়টায় আমরা নিজের মতই থাকব, নিজের মত করে কিছু ভাবব? শুধু সৃজনশীল মানুষরাই এই একাকিত্বকে সৃষ্টির কাজে লাগাতে পারেন এমনটা হয়তো সাধারণ সত্যি নয়। প্রত্যেকেই কোনোভাবে একটু-একটু করে সৃজনশীল। আর তাই নিজের মতো করে সময় পেলে রংবেরঙের ভাবনা জড়ো হতে পারে আমাদের মনের নীল আকাশে। সাদা মেঘের নড়াচড়া থেকে একটা পাহাড়ের ছবি ভেবে নেওয়া অথবা স্কুলে পড়া পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রনের ঘোরাফেরা নিয়ে ভাবতে বসে মনে হল সৌরজগতের কথা, তাও ঠিক যেন আমাদের গ্রহগুলোর মতন ! হয়তো এক স্ফুলিঙ্গের নতুন ভাবনা,  একটা ভাল-লাগার বই, কয়েকটা ভাল-লাগার গান । এমনকী এই নির্জন  সময়ের ভিতর বেজে উঠতে পারে কোনো মোবাইলের রিংটোন, দুজনের নিঃসঙ্গতা ভরে উঠতে পারে পরস্পরকে পেতে যাওয়ার অপেক্ষায়। ২৪X৭-এর গড়িয়ে চলা 'পা তোলা পা ফেলায়' এমন একটা দুটো একাকী মুহূর্ত থাকতেই পারে যেখানে রামধনু ইচ্ছে এসে লিখিয়ে নিতে পারে  শক্তি চাটুজ্জে বা জয় গোস্বামীর মতো একটা কবিতার লাইন। কিংবা হয়তো বাজাতে ইচ্ছে করবে আমজাদ আলী খানের মতো এক টুকরো বন্দিশ অথবা বিকাশ ভট্টাচার্যের মতো একটা তুলির আঁচড়, অথবা সৌরভ গাঙ্গুলির মতো একটা চোখ জুড়োনো কভার ড্রাইভ। কেউ-কেউ সত্যি-সত্যি লিখতে চাইতে পারে তার মতো নিঃসঙ্গতার জার্নাল — ওই  ‘অপূর্ব’ একাকিত্বের এই হতে পারে একরকম মানে, একেক  ভিন্ন উপাদান।

 আরও পড়ুন-

রবীন্দ্রসংগীতের আকাশে যিনি একা ও অপ্রতিম।। কেন গান গাওয়া বন্ধ করেছিলেন বাঙালির জর্জ বিশ্বাস!

 ঠিক এইখান থেকে আমরা একাকিত্বের বোধকে একটু অন্যরকম  ভাবে বিচার করতে শিখি। মনে করতে শিখি একাকিত্ব আমাদের জীবনের একরকম পাওনা আর সেটাকে আমরা সত্যি অর্থেই গ্রহণ করব । গ্রহণ করা মানে একাকিত্বের বুক থেকে নতুন করে পলিমাটির চর আবিষ্কার।  ভাবতে  ইচ্ছে  করে, গ্রহ-নক্ষত্র-উদ্ভিদ-জল-মাটি-নদী-পাহাড়-সমুদ্র এই মহাবিশ্বের কোনো যোগাযোগের ভাষা নেই, তাই এরা একা। সেই গঙ্গোত্রী উৎস থেকে গঙ্গা নিরবধি কাল একা-একাই বয়ে চলেছে সাগরের দিকে,  সে তো দুপাশের ভূমিকে ভরিয়ে তুলেছে অফুরান শস্যের সবুজে —  যদি বলি এটাই তার একাকিত্বের অর্জন ?  ওই যে বিরাট বটবৃক্ষ শতাব্দী অতিক্রম করে আজও ঋজু, তার কি কোনো দোসর আছে? অথচ তারই ডালে বাসা বেঁধে আছে অজস্র নাম-না-জানা পাখির দল, তারা কেউ একা নয়। বিজ্ঞানীরা বলে চলেছেন ঘূর্ণমান পৃথিবী অসীম ব্রহ্মান্ডের এক নিঃসঙ্গ পদাতিক,  কিন্তু তার শরীরের মধ্যে আগলে রাখা এই বিপুল প্রাণের তরঙ্গের মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছে তার একলা পথ চলার বিস্ময় । কি আশ্চর্য মহাবিশ্বের এই আমরাও তো নেহাতই একলা  প্রজাতি, আজও কোনো দ্বিতীয় মানবসত্তার সঙ্গে আমাদের যোগ ঘটেনি।  এই বিস্ময়ের ভোর থেকেই কেউ একটা গান বাঁধেন, কেউ একটা তুলির টান দেন ক্যানভাসে, কেউ একটা লাইন লিখে ফেলেন সাদা পাতায় — এভাবেই টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা অনূদিত হয় শিল্পে।

এইটাই হলো সেই অপূর্ব একাকিত্ব  তৈরি করে নেওয়ার জাদু প্রদীপ । এই প্রসঙ্গের নটে গাছ মুড়োবে একটা গল্প শোনাই। গল্পটা আসলে দুটো পাখির গল্প । খাঁচার পাখি  আর বনের পাখি। দুই পাখিই, দুজনকে কাছে টেনে নিতে চেয়েছিল দুজনের  নিঃসঙ্গতা ভুলে যাবে বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত  ‘দুজনে একা একা’ পাখা ঝাপটিয়ে তারা ঢলে পড়ে ক্লান্তির বুকে।  আমরা যারা মাঝবয়সে এসে গেছি কিংবা যারা মাঝ বয়স পেরিয়ে গেলেন ‘দুজনে একা একা’  হয়ে যাওয়ার এই অমোঘ পরিণতিটুকু  আমাদের এড়িয়ে থাকার উপায় নেই। আমাদের বেঁচে থাকবার গায়ে গায়ে সবাই মিলে একাকিত্বের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকাই আমাদের নিয়তি।

More Articles