দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে শতাব্দী প্রাচীন ব্রিটানিয়া বিস্কুট?
Britannia Biscuit : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ব্রিটানিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য ‘সার্ভিস বিস্কুট’ সরবরাহের দায়িত্ব পায়, যা তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ দেয়।
ব্রিটানিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আজ কে না জানে এই সংস্থার নাম? কিন্তু কীভাবে তৈরি হয় এই বিখ্যাত বিস্কুট কোম্পানি? জানা যায়, ১৮৯২ সালে কলকাতায় ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের একটি ছোট গোষ্ঠী ব্রিটানিয়া কোম্পানি শুরু করে। সে-সময় তাঁরা কোম্পানিটির পেছনে বিনিয়োগ করেছিলেন মাত্র ২৯৫ টাকা। অবশ্য এখনকার সময়ের নিরিখে হয়তো ওই টাকাকে খুবই কম মনে হচ্ছে, কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষিতে তা নিছক কম নয়। শুরুর দিকে, ব্রিটানিয়া কোম্পানি মূলত বিস্কুট, কেক এবং রুটি উৎপাদন করত, যা প্রধানত ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও চায়ের বাগানে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য সরবরাহ করা হত।

ব্রিটানিয়া-র বিবিধ বিস্কুট
তবে, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে ভারতীয়দের মধ্যে এই বিস্কুটের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ব্রিটানিয়া তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আধুনিকীকরণের দিকে নিয়ে যায়। ১৯১০ সাল থেকে মেশিনে বিস্কুট তৈরি শুরু হয়। ১৯১৮ সালে একজন ইংরেজ ব্যবসায়ী সি.এইচ. হোমস অংশীদার হিসাবে যুক্ত হন এবং কোম্পানিটি 'দ্য ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানি লিমিটেড' হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ব্রিটানিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য ‘সার্ভিস বিস্কুট’ সরবরাহের দায়িত্ব পায়, যা তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ দেয়।

পুরনো ধাঁচের ব্রিটানিয়া বিস্কুট
স্বাধীনতার পর, ব্রিটানিয়া তার পণ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে থাকে। এর ফলে, ১৯৭৯ সালে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে 'ব্রিটানিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড' করা হয়, যা বিস্কুটের বাইরেও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে তাঁদের উপস্থিতিকে বুঝিয়ে দেয়। ১৯৯০-এর শুরুর দিক থেকে ওয়াদিয়া গ্রুপ ব্রিটানিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয়, এবং কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
আরও পড়ুন-
ইরান থেকে পালিয়ে এদেশে! ভারতীয় খাবারের সংস্কৃতিতে যেভাবে মিশে গেলেন পার্সিরা
আজ, ব্রিটানিয়া ভারতীয় খাদ্য শিল্পে এক শীর্ষস্থানীয় নাম। গুড ডে, মেরি গোল্ড, টাইগার, ৫০-৫০-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলি ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এছাড়াও, নিউট্রিচয়েস (NutriChoice)-এর মতো স্বাস্থ্যকর বিস্কুটের সম্ভার এবং পনির, দুধ ও দইয়ের মতো দুগ্ধজাত পণ্যও তাদের পন্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে, ব্রিটানিয়ার বিস্কুট ৮০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করা হয়।

কলকাতার এস্প্লানেডে
তবে, এই সাফল্যের যাত্রায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হয়েছে ব্রিটানিয়া। তাদের কলকাতার তারাতলার কারাখানাটি সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় প্রাচীনতম কারখানা। সামান্য সময় আগে, কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এইসব প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করেও, ব্রিটানিয়া নতুন উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তির দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
আরও পড়ুন-
সৈনিকদের তরোয়ালে গেঁথে প্রথম তৈরি হয়েছিল ভারতীয়দের প্রিয় কাবাব?
তারা তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করছে। নতুন-নতুন পণ্য প্রবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সঙ্গে অংশীদারিত্বও গড়ে তুলছে। যেমন, চিপিতা (Chipita) -এর সঙ্গে ক্রোসাঁ এবং বেল এসএ (Bel SA)-এর সঙ্গে পনির নিয়ে কাজ করা— তাদের কাজের বিস্তৃতি ও ধরনকে বুঝিয়ে দেয়। আসলে, ব্রিটানিয়ার ১৩২ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা যাত্রাপথ কেবল একটি বিস্কুট কোম্পানির ইতিহাস নয়, এটি বিশ্বাস, উদ্ভাবন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এক অসাধারণ গল্প।

তৈরি হচ্ছে ব্রিটানিয়া বিস্কুট