আমেদাবাদ থেকে ঢাকা বারবার দুর্ঘটনার পিছনে পাইলটের অবসাদ?

Pilot Depression : ২০১৬ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, সারা পৃথিবীর ১২.৬ শতাংশ উড়ো জাহাজের পাইলটরা গভীর ডিপ্রেশনের শিকার। আরও একটি সমীক্ষা অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, ২৫.৪ শতাংশ পাইলটদের মধ্যেই থাকে অ্যাংজাইটি-র সমস্যা।

সমাজ, জীবিকা, সম্পর্ক—  এই সমস্ত কিছুর পেছনেই প্রধান চালিকা-শক্তি হিসেবে কাজ করে, মন। প্রায় সময়েই, শরীরের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা চিন্তিত থাকি। শরীর খারাপ হলে সারানোর চেষ্টা করি। ওষুধ খাই। কিন্তু মনের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রটি এখনও সারা পৃথিবীতে তেমনভাবে এক সজাগ বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি। একেবারেই পারেনি, তা বলছি না। কিন্তু সমাজের সর্ব স্তরের ‘মানসিক হতাশা’ সম্পর্কিত ধারণাগুলি স্বচ্ছ নয়। অথচ এই মানসিক অবসাদের কারণেই হতে পারে নানান দুর্ঘটনা। একজনের জন্য বিপদে পড়তে পারে অসংখ্য জীবন।

আরও পড়ুন-

বাংলাদেশে জাতীয় দুর্যোগ! কী ভাবে ঘটল এত বড় বিমান দুর্ঘটনা?

২১ জুলাই, বাংলাদেশের ঢাকায় প্লেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২৯। ঠিক এক মাস আগে, ১২ জুন ভারতের আমেদাবাদের প্লেন ক্রাশে নিহত হয়েছিলেন ২৬০ জন। যখনই কোনও বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, আমরা সবার প্রথম বিমানটির প্যাসেঞ্জারদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই। কীভাবে বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হল, উঠে আসে সে-কথাও। ক-জন আহত, ক-জন নিহত, এই তথ্য ক্রমশ সামনে আসতে থাকে। আর, এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই একটি বিষয় চাপা পড়ে যায় প্রায়শই, তা হল বিমানটির প্রধান দায়িত্বে যিনি ছিলেন, সেই পাইলট সর্বতোভাবে ঠিক ছিলেন তো? শারীরিকভাবে শুধু নয়, মানসিকভাবেও?

আমেহদাবাদের বিমান দুর্ঘটনা

বিগত বহু বছর ধরেই বিমানের পাইলটদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, সারা পৃথিবীর ১২.৬ শতাংশ উড়ো জাহাজের পাইলটরা গভীর ডিপ্রেশনের শিকার। আরও একটি সমীক্ষা অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, ২৫.৪ শতাংশ পাইলটদের মধ্যেই থাকে অ্যাংজাইটি-র সমস্যা। সৌদি আরবের একটি গবেষণা এ-কথাও জানিয়েছে ৪০.৬ শতাংশ পাইলেটরা অসম্ভব ডিপ্রেশনের মধ্যেই নিয়মিত প্লেন চালান। ‘পাইলট পির সাপোর্ট প্রোগ্রাম’-এর মতেও, বহু পাইলট নীরবে ডিপ্রেশনকে বহন করছেন এবং এঁদের অনেকের মধ্যেই তীব্র অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার আছে। এই ডিপ্রেশনের সঙ্গেই মিলেমিশে রয়েছে পাইলটদের অ্যালকোহলের প্রতি নেশাও। এখানে একটি তথ্য বেশ চিন্তায় ফেলে দেয় আমাদের। বিগত দু সপ্তাহের সমীক্ষা অনুযায়ী, গোটা পৃথিবীর এয়ারলাইনগুলি মধ্যে ৪.১ শতাংশ পাইলেটদের ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতা এসেছে। এর কারণ, অনেক দিন ধরে চলতে থাকা মানসিক অবসাদ। কিন্তু এই মানসিক অবসাদের ব্যাখ্যাগুলি আসলে কী?

আরও পড়ুন-

রূপানি প্রথম নন! বিমান দুর্ঘটনা কেড়েছে বহু হেভিওয়েটের প্রাণ

নানা সমীক্ষায়, অবসাদে ভুগছেন এমন পাইলটদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এক অস্বস্তিকর তথ্য! পাইলটদের প্রত্যেক দিন খুবই চাপের মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হয়। ঠিক মতো ঘুমনোর বা বিশ্রাম নেওয়ারও থাকে না। দ্রুত জীবন, কাজের চাপ, এগুলি তাঁদের ডিপ্রেশনের অন্যতম কারণ। অনেক পাইলট এ-কথাও স্বীকার করেছেন যে, সামাজিক জীবন থেকে দৈনন্দিনভাবে দূরে থাকাও তাঁদের নানাভাবে মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজনীয়, তা হল, একজন পাইলট মানসিক অবসাদে ভুগতেই পারেন, কিন্তু সে-কথা সেই এয়ার লাইন সংস্থা খেয়াল রাখছে না কেন? দুটি কারণ সামনে এসেছে। এক, ডিপ্রেশনে-ভোগা পাইলটরা নিজেদের মানসিক অবসাদের কথা সংস্থাকে জানাতে ভয় পান। তাঁদের অনেকেই মনে করেন যে মানসিক অবসাদের কথা জানতে পারেল তাঁদের এয়ার লাইসেন্স ক্যান্সেল-ও হয়ে যেতে পারে। একদিকে জীবিকা হারানোর ভয়, অন্যদিকে  বাড়তে থাকা ডিপ্রেশন, এই দুটিকে সঙ্গে নিয়ে প্লেন চালান তাঁরা। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেন না, এর ফলে কেবল তাঁদের নিজেদের জীবনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে তাই নয়, ফ্লাইটে থাকা শতাধিক মানুষের জীবনকেও তাঁরা বিপদের মুখে ফেলছেন। আরও একটি কথা এখানে গুরুত্বপূর্ণ! এরোপ্লেন সংস্থাগুলিও এ-বিষয়ে উদাসীন। নিজেদের মানসিক অবসাদের কথা পাইলটরা চাকরি হারানোর ভয়ে যেমন জানান না, বিমান কোম্পানিগুলিও বিমানের প্রধান ব্যক্তি, পাইলটের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছুই খোঁজ-খবর রাখে না। তাদের লক্ষ্য একটাই, বাণিজ্য। পাইলটরা কিংবা এরোপ্লেন সংস্থাগুলি কীভাবে ভুলে যেতে পারেন যে তাঁদের ওপর নির্ভর করে আছে শত শত মানুষের জীবন-দায়িত্ব?

ইতিপূর্বে, সারা পৃথিবীতে পাইলটদের মানসিক অবসাদের কারণে বহু প্লেন দুর্ঘটনা হয়েছে। যেমন, 

সিল্ক এয়ার ফ্লাইট ১৮৫ (ডিসেম্বর ১৯৯৭):

এই প্লেনটি ইন্দোনেশিয়ার মুসি নদীতে আছড়ে পড়েছিল, যার ফলে বিমানে থাকা ১০৪ জন যাত্রীর সকলেই নিহত হন। মার্কিন জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড (NTSB) এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে দুর্ঘটনাটির পেছনে সম্ভবত ক্যাপ্টেনের ভূমিকাই প্রধান। NTSB উল্লেখ করেছে যে প্লেনটির ক্যাপ্টেন সেই সময় আর্থিক সমস্যার কারণে তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। 

ইজিপ্ট এয়ার ফ্লাইট ৯৯০ (অক্টোবর ১৯৯৯):

এক্ষেত্রেও, ফ্লাইটটি আছড়ে পড়েছিল আটলান্টিক মহাসাগরে। যার ফলে ফ্লাইটে থাকা সমস্ত যাত্রীই নিহত হন। NTSB-র মতে, ফ্লাইটের এক পাইলটের আত্মহত্যা-প্রবণতার কারণেরই তিনি এই প্লেনটিকে দুর্ঘটনার দিকে ঠেলে দেন।

ল্যাম মোজাম্বিক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৪৭০ (নভেম্বর ২০১৩):

নামিবিয়ায় এই প্লেন দুর্ঘটনায় ৩৩ জন আরোহীর সকলেই নিহত হয়েছিলেন। এক্ষেত্রেও ক্যাপ্টেনের গাফিলতির জন্যই প্লেনটি ক্রাশ করে। তদন্তে পরে জানতে পারা যায়, প্লেনের প্রধান ক্যাপ্টেন তাঁর ছেলের মৃত্যু ও নিজের বিবাহবিচ্ছেদের মামলা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন।

জার্মান উইংস ফ্লাইট ৯৫২৫ (মার্চ ২০১৫):

এই ফ্লাইটের সহ-পাইলট আন্দ্রেয়াস লুবিটজ বিমানটির দুর্ঘটনার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ি ছিলেন। তিনি ইচ্ছে করেই বিমানটিকে ফরাসি আল্পসে বিধ্বস্ত করেন, যার ফলে বিমানে থাকা ১৫০ জন যাত্রীর সকলেই নিহত হন। তদন্তে জানা গেছে, লুবিটজের ভয়ানক ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল। এ-কথা তিনি সংস্থার কাছে গোপন করে যান। দুর্ঘটনার তিন দিন পর, জার্মান তদন্তকারীরা লুবিটজের অ্যাপার্টমেন্টে একজন মনোবিদের নোট খুঁজে পান, যেখানে লুবিটজ যে বিমান ওড়ানোর ক্ষেত্রে এখন মানসিকভাবে অপারগ, সে-কথা স্পষ্ট ভাবেই লেখা ছিল।

আরও পড়ুন-

আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনা: প্রাথমিক রিপোর্টের সুর নিয়ে পাইলটদের সংগঠনের ক্ষোভ

যাত্রী বিমান ও সামরিক বিমান, দু-ক্ষত্রেই আরও এমন অনেক দুর্ঘটনার কথাই জানা যায় যেখানে পাইলটদের মানসিক অবসাদ, তাঁদের আত্মহত্যা-প্রবণতা ফলে একাধিক বিমান বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। এবং নিহত হয়েছেন বহু মানুষ। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড (NTSB) ১৯৯৩ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ০.৩৩% সাধারণ বিমান দুর্ঘটনার জন্য পাইলটদের আত্মহত্যা ও মানসিক অবসাদকেই দায়ী করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে, আমেদাবাদের প্লেন দুর্ঘটনাতেও পাইলটের ভূমিকা নিয়ে উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন! উঠে এসেছে পাইলটের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রসঙ্গটিও। এবং ২১ জুলাই বাংলাদেশের প্লেন ক্রাশের পরও অনেকে মনে করছেন যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াও, এই দুর্ঘটনার পেছনে পাইলটের গাফিলতি থাকতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের এই দুটি দুর্ঘটনার পেছনে কি পাইলটদের মানসিক অবসাদের কোনও ভূমিকা আছে? তদন্ত চলছে।

সারা পৃথিবীর পাইলটদের বাড়তে থাকা ডিপ্রেশন সম্পর্কে মনোবিদদের বক্তব্য, বিমানের পাইলটদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখা অন্ত্যন্ত জরুরি। দরকার নিয়মিত কাউন্সিলিং-এর! অবসাদ আসলে কী? কীভাবে তার থেকে বেরনো যায়, সে-সম্পর্কিত সেমিনার আয়োজন করতে হবে বিমানকর্মীদের জন্য। আর এক্ষেত্রে , বিমান সংস্থাগুলিকেই সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে সবার প্রথমে।   

More Articles