ভারতের যেসব মন্দিরে দেবতার বদলে পূজিত হন রাক্ষস!

Temple of Rakshas in India: এ-দেশের পাঁচটি মন্দিরের কথা এক্ষুনি বলা যায়, যেখানে দেবতার বদলে পূজিত হন রাক্ষস-রাক্ষসী কিংবা পুরাণগল্পের কোনো অনিষ্টকারী চরিত্র। সেসব মন্দিরেও সাধারণ মানুষ আসেন। নিত্য, পূজা-অর্চনা হয়।

দেবতা আর রাক্ষস। এই দুই স্পষ্ট বিভাজনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের ভালো আর খারাপের বোধ! কিন্তু ‘রাক্ষস’ মানেই যে সব সময় অশুভ বা অনিষ্টকারী, তা কিন্তু নয়। অন্তত ইতিহাসের দলিল তাই বলছে। কথিত যে, তখন সত্য যুগ শেষের দিকে, সে-সময় নিদ্রিত ব্রহ্মার নিঃশ্বাস থেকেই নাকি রাক্ষসদের জন্ম হয়েছিল। জন্মমাত্রই রাক্ষসেরা ব্রহ্মাকে হত্যা করে তাঁর রক্ত পান করতে উদ্যত হয়। তখন ভয়ার্ত ব্রহ্মা চিৎকার করে বলেছিলেন : রক্ষ মাম্! সংস্কৃতে যার অর্থ হল: রক্ষা করো। বলা বাহুল্য, বিষ্ণু এসে ব্রহ্মাকে সেবার উদ্ধার করেছিলেন। এবং মনে করা হয়, ব্রহ্মার সেই ‘রক্ষ মাম্!’ আর্তনাদ থেকেই নাকি ‘রাক্ষস’ কথাটি এসেছে।

আরও পড়ুন-

যে রথ পুরাণের গল্প দেখায়

ভারতীয় মহাকাব্যে ও বিভিন্ন পুরাণগল্পের খলনায়করা মানুষ হলেও তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই রাক্ষসের সঙ্গে একই মনোভাব-আসনে বিচার করা হয়। এ-কথাও ঠিক, অনেক সময়ে এই সব দুষ্ট চরিত্রগুলির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে রাক্ষসদের একটা সংযোগও খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশে এইসব খলনায়কদের সব সময় যে বাজে চোখে দেখা হয়, তা কিন্তু নয়। এ-দেশের পাঁচটি মন্দিরের কথা এক্ষুনি বলা যায়, যেখানে দেবতার বদলে পূজিত হন রাক্ষস-রাক্ষসী কিংবা পুরাণগল্পের কোনো অনিষ্টকারী চরিত্র। সেসব মন্দিরেও সাধারণ মানুষ আসেন। নিত্য, পূজা-অর্চনা হয়।

রাক্ষসী পুতনার দুগ্ধপানরত গোপাল

প্রথমেই উল্লেখ করব, পুতনা মন্দিরের। বিষ্ণু যখন কৃষ্ণ অবতারে জন্ম নিয়েছিলেন, কৃষ্ণের নিজের মামা কংস তাঁকে বধ করতে পুতনা নামক রাক্ষসীকে গোকুলে পাঠায়। মায়ের মতোই পুতনা নিজের দুধ খাওয়ানোর অজুহাতে গোপালকে বিষ দিয়ে মারবার পরিকল্পা করলে গোপাল তাকে হত্যা করে। এ-গল্প প্রায় সকলেরই জানা! উত্তরপ্রদেশের গোকুলে গেলে এখনও দেখতে পাওয়া যায় পুতনার মন্দির। এই মন্দিরে, রাক্ষসী পুতনাকে রীতিমতো পুজো করা হয়। পুতনার দুগ্ধ পান করছে গোপাল, এমনই একটি বিগ্রহরূপ দেখতে পাওয়া যায় মন্দিরে। যেহেতু, পুতনা কৃষ্ণকে দুধ পান করিয়েছিলেন তাই স্থানীয়রা অনেকেই পুতনাকে কৃষ্ণের একজন পালকমাতাও মনে করেন।

মানালি-র হিড়িম্বা মন্দির

এরপর আসব মহাভারতের এক রাক্ষসীর প্রসঙ্গে। তিনি, ভিমপত্নী হিড়িম্বা। হিড়িম্বার খ্যাতি অবশ্য পুতনার মতো নেতিবাচক নয়, বরং এক ভালো মনের রাক্ষসী হিসেবেই তার পরিচয়। উত্তরপ্রদেশের মানালি-তে রাক্ষসী হিড়িম্বার একটি জনপ্রিয় মন্দির আছে। মন্দিরটি প্রায় ২৪ মিটার উঁচু। এটি একটি প্রাচীন গুহামন্দির। স্থানীয় লোকেরা এই মন্দিরকে ‘ধুংগিরি মন্দির’ নামেও ডাকেন। মন্দিরটি হিমালয়ের পর্বত শ্রেণি ও দেবদারুর জঙ্গল দিয়ে ঘেরা! বহু সংখ্যক পর্যটক ও দর্শনার্থী এখানে প্রায় প্রত্যেক দিনই পুজো দিতে আসেন!

শকুনির পূজিত মূর্তি

এর পরে যে মন্দিরটির কথা বলব, তা কোনো রাক্ষস বা রাক্ষসীর না-হলেও, তার মতো খলনায়ক ভারতীয় অখ্যানের ইতিহাসে খুব কমই আছে। তিনি, মহাভারতের শকুনি। এ-কথা অবশ্য ঠিক, জীবদ্দশাতে নানারকম তন্ত্র ও প্রেতচর্চার উদাহরণ শকুনির জীবনে রয়েছে। কিন্তু শকুনিকে নিয়েও কি মন্দির আছে ভারতে? হ্যাঁ আছে। কেরালায় শকুনিকে কেন্দ্র করে একটি মন্দির রয়েছে। এবং মন্দিরটি প্রধানত তন্ত্রসাধনার জন্যই প্রসিদ্ধ। মন্দিরে প্রত্যেক দিন পূজিত হয় শকুনির একটি মূর্তি। প্রধানত পুজো দেওয়া হয় নারকেল ও রেশম দিয়ে। দেওয়া হয়, তাড়িও। লোককাহিনি অনুযায়ী, এই স্থানেই মহাদেবের  ধ্যানে লীন হয়েছিলেন শকুনি। অনেকের মতে, এখানেই কৌরবরা নিজেদের যুদ্ধ-অস্ত্র ভাগ করে নিয়েছিলেন। এবং আশ্চর্য হওয়ার মতো কথা হল, মন্দিরের এলাকার কাছেই এখনও এক সম্প্রদায় বাস করে, যারা নিজেদের ‘কৌরব’ বংশের উত্তরসূরি বলে দাবি করে।

আরও পড়ুন-

কেন অষ্টম আশ্চর্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয় একে? যে রহস্য বয়ে বেড়াচ্ছে স্বয়ং রাবণের রাজপ্রাসাদ

এবার একটু রামায়ণের দিকে আসি। ‘রাবণ’ চরিত্রটি একই সঙ্গে যেমন একজন খলনায়ক, তেমনই রাবণ একজন পিতা, বীর যদ্ধা, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরের শিবালয় এলাকায় রাবণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল দশানন মন্দির। এ-মন্দিরে রাবণকে জ্ঞানীরূপে পুজো করা হয়। উল্লেখ্য যে, দশানন মন্দিরের দরজা সারা বছর বন্ধ থাকে। এবং একমাত্র দশহরা-র দিন তা খোলা হয়। এই দিন বহু সংখ্যক মানুষ এখানে দশাননের মূর্তি দর্শন করতে আসেন। এ-তথ্য গুরুত্বপূর্ণ যে, দশহারা-র দিন এখানেই একমাত্র রাবণের পুজো করা হয়। সারা দেশে রাবণের সাতটি মন্দিরের মধ্যে এই মন্দির অন্যতম!

রাবণের প্রসঙ্গে বলতে হয় রাবণের ভাই অহিরাবণের কথাও! কথিত যে, অহিরাবণ রাম ও লক্ষণকে অপহরণ করে পাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। উত্তর প্রদেশের ঝাঁসি এলাকায় রয়েছে অহিরাবণের মন্দির। মন্দিরে, হনুমানের সঙ্গেই রয়েছে অহিরাবণের মূর্তি! মন্দিরটির আনুমানিক বয়স প্রায় তিনশো বছর। বহু মানুষ এখানে এসে নিয়মিত পুজো দেন, মানত করেন। এই মন্দিরগুলির অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেয় ভালো খারাপের দন্দ্ব অনেকটাই আপেক্ষিক, কিছু-বা পক্ষপাতযুক্তও। যাদের সর্বদা নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখে এসেছি আমরা, তাদেরও অনেক ইতিবাচক দিক থাকতে পারে। দেশের প্রাচীন কাব্য ও পুরাণের নানান কাহিনি মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে, খলনায়কদের ইতিবাচক দিকগুলির থেকেও আমাদের শেখার কথাই বলে! 

More Articles