জোড়াসাঁকোতে অসমবর্ণ বিবাহ, সম্বন্ধ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ
Rabindranath Tagore : চৌধুরী বাড়ির সেদিনের ওই বিশেষ অতিথি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বন্ধু আশুতোষ চৌধুরীর সঙ্গে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা ঠাকুরের বৈবাহিক সম্বন্ধ-প্রস্তাব নিয়ে তিনি এসেছিলেন কৃষ্ণনগরে।
১৮৮৬, আনুমানিক এপ্রিল-মে মাস। গণিতের হিসেবে, আজ থেকে একশো তেত্রিশ বছর আগেকার ঘটনা। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের দুর্গাদাস চৌধুরীর বাড়িতে বেড়াতে এলেন তিনজন যুবক অতিথি। দুর্গাদাসের জ্যেষ্ঠ সন্তান, আশুতোষ চৌধুরী ছিলেন তাঁদের বন্ধু। আর সেই বন্ধুতার টানেই এই কৃষ্ণনগর ভ্রমণ। যদিও এরই সঙ্গতে সুর লাগিয়ে ওই ত্রি-যুবকের মধ্যে বিশেষ একজনের মনের প্রচ্ছন্নে তখন জ্বলতে শুরু করেছে একটি মধুর উদ্দেশ্য! চৌধুরী বাড়ির সেদিনের ওই বিশেষ অতিথি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বন্ধু আশুতোষ চৌধুরীর সঙ্গে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভা ঠাকুরের বৈবাহিক সম্বন্ধ-প্রস্তাব নিয়ে তিনি এসেছিলেন কৃষ্ণনগরে। প্রতিভা দেবী ছিলেন পিতৃহীন। তাঁর যখন খুবই কম বয়স, হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর চলে যান। হয়তো তাই, রবীন্দ্রনাথ প্রতিভা দেবীর বিবাহ সম্পর্কে এত উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর অন্তরে কার্যত ছিল সজাগ অভিভাবকত্ব এবং কর্তব্যের বোধ।
আরও পড়ুন-
স্লোভেনিয়ায় ‘সোনার তরী’, নতুন পাওয়া বইবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ
সেবার কৃষ্ণনগর সফরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন তাঁর বড়দিদি সৌদামিনী দেবীর পুত্র সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় এবং ঠাকুর বাড়ির জামাতা রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়। আশুতোষ, রমণীমোহনের কৈশোরবেলার বন্ধু ও সহপাঠী। আর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সখ্য তৈরি হয়ে ওঠার উল্লেখ পাই ‘জীবনস্মৃতি’-তে,
দ্বিতীয়বার বিলেত যাইবার জন্য যখন যাত্রা করি তখন আশুর সঙ্গে জাহাজে আমার প্রথম পরিচয় হয়। ... কলকাতা হইতে মাদ্রাজ পর্যন্ত কেবল কয়টা দিন মাত্র আমরা জাহাজে একত্র ছিলাম। কিন্তু দেখা গেল, পরিচয়ের গভীরতা দিনসংখ্যার উপর নির্ভর করে না। একটি সহজ হৃদয়তার দ্বারা অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি এমন করিয়া আমার চিত্ত অধিকার করিয়া লইলেন যে, পূর্বে তাঁহার সঙ্গে যে চেনাশোনা ছিল না সেই ফাঁকটা এই কয়দিনের মধ্যেই যেন আগাগোড়া ভাঙিয়া গেল।
এই যাত্রাপথের আনন্দগানে ভঙ্গ দিয়ে মাদ্রাজ থেকে রবীন্দ্রনাথ ফিরে আসেন। আশুতোষ চলে যান কেমব্রিজে ব্যারিস্টারি পড়তে। রবীন্দ্রনাথের নবম কাব্যগ্রন্থ ‘কড়ি ও কোমল’-এর প্রকাশক ছিলেন এই আশুতোষ চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথও বন্ধুত্বের প্রত্তুপহারে তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন নিজের পঞ্চম গল্প সংকলন। মনে হয়, জাহাজে প্রথম আলাপেই আশুতোষের ব্যক্তিত্ব ও দৃপ্তময় শিক্ষা রবীন্দ্রনাথকে এতোধিক আকৃষ্ট করেছিল যে হয়তো তিনি তখনই তাঁর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন প্রতিভা দেবীর জন্য যোগ্যতম জীবনসঙ্গীকে। কারণ প্রতিভা দেবীর জীবনেও ছিল যথেষ্ট শিল্পগুণের সমাবেশ। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী-র স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় দেশী ও বিলাতী দুই ধরনের সংগীতেই তিনি পারদর্শী ছিলেন। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে প্রতিভা দেবী চর্চা করেছিলেন সেতার, পিয়ানো, তবলা। তিনিই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানের মুদ্রিত স্বরলিপি তৈরি করেন।

প্রতিভা দেবী
শুধু তাই নয়, সেই উনিশ শতকীয় বাতায়নে মেয়েদের অন্য পুরুষের সঙ্গে একত্র অভিনয়ের ঘটনা ছিল বিরল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি,১৮৮১ ‘বাল্মীকি প্রতিভা’-র প্রথম অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একই মঞ্চে, একই সঙ্গে, ‘সরস্বতী’ চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন এবং প্রশংসিতও হয়েছিলেন। তখনকার দিনের অন্ধ-সংস্কারের বিরুদ্ধে ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা যে আধুনিকতার পাঠ গ্রহণ করেছিল, অল্প বয়সেই প্রতিভা দেবীর মধ্যে তার প্রকাশ বেশ তারিফযোগ্য। ফলে, এমন গুণী পাত্রীর জন্য যে যথাযথ নির্বাচন আবশ্যিক, তা রবীন্দ্রনাথ জানতেন।

প্রমথ চৌধুরী
আশুতোষ চৌধুরী দেশে ফিরে এলে, কৃষ্ণনগরে, তাঁদের বিবাহ প্রস্তাবটি দুর্গাদাস চৌধুরীকে জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর অনুমোদনের পর, ২৫ আগস্ট, ১৮৮৬ আশুতোষ আর প্রতিভা দেবীর পরিণয়-সম্পর্ক উদযাপিত হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে। 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকা এই বিবাহকে নির্দেশ করে এক প্রকারের সমাজ সংস্কারের উদাহরণচিহ্নরূপে। কারণ এটি ছিল অসবর্ণ বিবাহ। বাহ্মণ বিভাজনে ঠাকুর পরিবার রাড়ি শ্রেনির আর আশুতোষ চৌধুরীরা ছিলেন বারেন্দ্র শ্রেণির ব্রাহ্মণ, কোনও সম্ভ্রান্ত বনেদী ঘরে এমন বৈষম্যের ভেতর বিবাহের প্রথা সেই সময় ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ঘটকবেশ এই প্রথাকে ভাঙল।
আরও পড়ুন-
শান্তিনিকেতনের বর্ষা: বিপর্যয়কে পূর্ণতায় শমিত করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ
কৃষ্ণনগরের সঙ্গে ঠাকুর বাড়ির আত্মীয়তার সেই প্রথম ভিত্তি স্থাপন। যদিও এর অনেক আগেই, একটা সংযোগরেখা ছিল। সরাসরি এই শহরের সঙ্গে নয়, কৃষ্ণনগর-শান্তিপুর জনপদের মধ্যবর্তী বর্ধিষ্ণু গ্রাম দিগনগরে যাদবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র সারদাপ্রসাদের সঙ্গে মহর্ষির জ্যেষ্ঠা কন্যা সৌদামিনী দেবীর বিবাহ হয়। এবং একইসঙ্গে চৌধুরী বাড়ির বিবাহের ইতিহাসও বেশ অবাক করার মতো। কেননা দুর্গাদাসের পরিবারের অনেকের সঙ্গেই পরবর্তীতে ঠাকুরবাড়ির আত্মীয়-সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। যেমন, আশুতোষের অনুজ সুহৃৎনাথ বিবাহ করেন রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথের নাতনি নলিনী দেবীকে। আবার, এই দম্পতির কনিষ্ট কন্যা পূর্ণিমার শশুরগৃহ ছিল জোরাসাঁকো। দুর্গাদাসের আরেক পুত্র মন্মথনাথ চৌধুরী বিবাহ করেন ইন্দুমতী দেবীকে।

ইন্দিরা দেবী
তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি, সৌদামিনী দেবীর ছোটো মেয়ে। এবং এই পরিবারের কিংবদন্তি স্বরূপ ব্যক্তি, বাংলা গদ্য সাহিত্যের নতুন স্রোতের পুরোধা, ‘সবুজপত্র’-এর সম্পাদক, যিনি তাঁর সমগ্র জীবন অতিবাহিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নামক বটবৃক্ষের ছায়াতলে, সেই প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে বৈবাহিক সংযোগ স্থাপিত হয় ইন্দিরা দেবীর। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রী। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর মেয়ে। যার স্বকীয় পরিচয় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলছেন,
...তোকে আমি যে-সব চিঠি লিখেছি তাতে আমার মনের সমস্ত বিচিত্র ভাব যে রকম ব্যক্ত হয়েছে এমন আমার আর কোনো লেখায় হয়নি।... তুই আমাকে অনেক দিন থেকে জেনে আসছিস ব’লেই যে তোর কাছে আমার মনের ভাব ভালো করে ব্যক্ত হয় তা নয়; তোর এমন একটি অকৃত্রিম স্বভাব আছে, এমন একটি সহজ সত্যপ্রিয়তা আছে যে, সত্য আপনি তোর কাছে অতি সহজেই প্রকাশ হয়।
তাঁদের পত্রালাপের সেই আশ্চর্য গ্রন্থনা ‘ছিন্নপত্রাবলী’ পড়লে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের সঙ্গে যেমন একমত হতে হয়, তেমনই ভাবতে ভালো লাগে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর মতো এমন একজন মহীয়সী ব্যক্তিত্ব কৃষ্ণনগরের মতো প্রাচীন শহরের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিলেন।