বাঙালি অস্মিতাকে চুম্বক করেই ছাব্বিশের লড়াই, একুশের সভায় বুঝিয়ে দিলেন মমতা
Mamata Banerjee: বাঙালি অস্মিতা, বাঙালির অপমানের কথা বলে, বাঙালির অধিকারের প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আঘাতের কথা। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চুম্বক করে টান দিতে চাইছেন নারিতে।
বাংলা ভাষা এবং বাঙালির জাতিগত অস্মিতাই হতে চলেছে ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পাখির চোখ। শুরু থেকে শেষ, এক ঘন্টার ঝাঁঝালো বক্তৃতাই বুঝিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে মমতার মূল নিশানা ছিল বিজেপির কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যাবহার করা। কারণ সেই সময়পটে তাঁর পারিষদদের শ্রীঘরে পাঠাচ্ছিল ইডি-সিবিআই। সেই তালিকায় ছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অনুব্রত মণ্ডল, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকরা। এমনকি সিবিআই সারদা চিটফান্ড মামলার তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে গেলে, এর বিরুদ্ধে ধর্মতলায় ধর্ণায় বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
দুর্নীতি ইস্যুতে খড়গহস্ত বিজেপিকে থামাতে সেবার মমতা রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দশভূজা হিসেবে। বলেছিলেন, সব কেন্দ্রে তিনিই প্রার্থী। অর্থাৎ যে-ই দুর্নীতি করুক না কেন, তাঁর সাদা বস্ত্রে কোনো কাদা নেই। তাঁর সততার প্রতীক ইমেজেই ভোট হোক, এমনটাই চেয়েছিলেন মমতা। কার্যত হয়েছেও তাই। বিজেপির শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ২৯২ আসনের মধ্যে ২১৫ আসনে ৪৭.০৩% ভোটে জয়লাভ করে তৃণমূল। তবে, সাফল্যের দুফোঁটা চুনা ছিল নন্দীগ্রামে মমতার হার।
তারপর গঙ্গা দিয়ে বহু কিউসেক জল বয়ে গিয়েছে। শিক্ষা দুর্নীতি থেকে আরজি কর ঘটনায় তৃণমূলের ইমেজে দাগ লেগেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি দলই যখন ভাবতে শুরু করেছে এবার ভোটের লাইন কী হবে! মমতা তখন তৃণমূলের সুরটা বেঁধে দিলেন। ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “নির্বাচন কমিশনের চেয়ারকে আমি সম্মান করি। কিন্তু বিহারে যেভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ৪০ লক্ষের বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, বাংলায় তা করলে ঘেরাও কর্মসূচি হবে”। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র সরকারের বক্ষলগ্ন বলে চিহ্নিত করে সরাসরি রাঘব বোয়ালের সঙ্গে লড়াইয়ের ডঙ্কা বাজিয়ে দিলেন মমতা।
একুশের মঞ্চ থেকে ছাব্বিশের লড়াইয়ের ঘোষণা মমতার
সম্প্রতি বিজেপির রাজ্য সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। পর্যবেক্ষকদের মত, যেহেতু শহরাঞ্চলে বিজেপির ফলাফল ক্রমাগত ভালো হচ্ছে। তাই শহুরে মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব সম্প্রসারণ করতে চাইছে বিজেপি, সেই কারণেই সুবক্তা শমীককে সামনে আনা। অন্যদিকে মমতা এদিন যখন পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্দেশ্য করে গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করলেন, বললেন তাঁদের ঘরে ফিরে আসতে — বোঝা গেল মমতার পাখির চোখ আসলে গ্রাম বাংলার ভোট।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে পুলিশি ধরপাকড় এবং স্থানীয়দের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। অনেকের মতেই, পহেলগাঁও কাণ্ড ও অপরেশন সিঁদুরের পর সেই ঘটনা পর্যায়ক্রমে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৪৪৪ জন বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা সন্দেহে গ্রেফতার করেছিল ওড়িশা পুলিশ। পরে আদালতের হস্তক্ষেপে ২৭৭ জনকে মুক্ত করা হয়। বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে শুধু আটক করেনি পুলিশ, বাংলাদেশে ‘ঘাড়ধাক্কা’ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে সম্প্রতিই। কলকাতা হাইকোর্ট এই সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে।
১৬ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর এই আক্রমণের বিরুদ্ধে পথে নামে শাসকদল, পা মিলিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। একুশে জুলাইয়ের সমাবেশ থেকেও বাঙালির অপমানের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গেল তাঁকে। এই প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা বাংলায় ফিরে আসুন। রাজ্যে এখন কাজের অভাব নেই। আপনারা এখানেই কাজ পাবেন। বাইরে থাকতে হবে না।”
পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরে আসার বার্তা মমতার
গত কয়েক মাস দেখা গেছে তৃণমূল বিরোধীরা সরব হচ্ছেন ডিএ নিয়ে। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পের জন্মদাত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভালই জানেন, ডিএ আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমস্যা নয়। ডিএ-র প্রশ্ন সংগত হলেও, তা বেতনভুক সরকারি কর্মীদের সমস্যা। কিন্তু তৃণমূলকে অক্সিজেন যোগানোর জন্য সে সংখ্যাটা যথেষ্ট নয়। সে কারণেই জোড়াফুলের টার্গেটে গ্রাম বাংলার ভোট। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মত প্রকল্পের সুবাদে তৃণমূলের বেশ মজবুত মহিলা ভোটব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছে রাজ্যে। বলা হয়ে থাকে ‘তিন ম’-তে নির্ভরশীল মমতা। এক মহিলা ভোটব্যাঙ্ক, দুই মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক এবং তিন হল স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সততার প্রতীক ইমেজ। এখানে একটা চতুর্থ অক্ষ তৈরি করতে চাইছেন তিনি। সেই অক্ষটি হল, গ্রামীণ পরিযায়ী মানুষের ভোট। তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে চাইছেন ‘ঘরে কাজ আছে’ বলে। একইসঙ্গে বাঙালি অস্মিতা, বাঙালির অপমানের কথা বলে, বাঙালির অধিকারের প্রশ্ন তুলে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আঘাতের কথা। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চুম্বক করে টান দিতে চাইছেন নারিতে। মমতা এও জানেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তিনি ‘বাংলাপক্ষ’-এর মতো বহু প্রেসার গ্রুপের পক্ষ সাহায্যই পাবেন। কাজেই আপাতভাবে তাঁর চিরাচরিত বক্তৃতার মতোই একটু অগোছালো লাগলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিটি তাস ফেললেন বুঝে-শুনেই এবং কোন সুরে, কোন স্বরে ভোটের মাঠে তৃণমূল মুখ খুলবে বুঝিয়ে দিলেন। এখন দেখার তাঁর প্রতিপক্ষ কী ভাবে লড়াই দেয়।