গাজায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষ, কেন শতাধিক সংস্থার এই দাবি?

Gaza : ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী(আইডিএফ) একাধিকবার বলেছে, ত্রাণ নিতে গিয়ে মানুষজন সামরিক ব্যারিকেডের খুব কাছে চলে এলে, সতর্ক করতে গুলি চালানো হয়।

গাজাবাসীরা ব্যাপক মাত্রায় অনাহারে ভুগছেন বলে সতর্ক করেছে ১০০টিরও বেশি মানবধিকার সংস্থা। তাদের অভিযোগ, ইজরায়েল গাজার ভেতরে ত্রাণ পৌঁছতে দিচ্ছে না। সেভ দ্য চিলড্রেন এবং মেডেসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ের্স (এমএসএফ)-সহ ১০০টিরও বেশি সংস্থা একটি যৌথ বিবৃতিতে এই অভিযোগ করেছে। এই ব্যাপক দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে তারা।

সংস্থাগুলি চিঠিতে দাবি করেছে, এখন দিনে মাত্র ২৮টি ট্রাক গাজায় যায়। অথচ জাতিসংঘ আগেই কমপক্ষে ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক পাঠানোর কথা বলেছিলো। গাজায় ইজরায়েলের হামলায় ২৩ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১০০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জনের ত্রাণ নিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে। গাজায় খাদ্য সংকট দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। বিবিসি-তে লেখা হয়েছে, খাবারের সন্ধানে ছোটাছুটি করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। জাতিসংঘ জানিয়েছে, খাবার নিতে গিয়ে গত ২৭ মে থেকে এখনও পর্যন্ত, ইজরায়েলি সেনাদের গুলিতে অন্তত ১০৫৪ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। অনাহারে মারা যাওয়া অধিকাংশই শিশু। গত কয়েক সপ্তাহে ক্ষুধার্ত ও অপুষ্টিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সমস্ত জিনিস প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে ইজরায়েল। তারা দাবি করছে কোনো অবরোধ নেই এবং অপুষ্টির যে কোনো ঘটনার জন্য হামাস দায়ী। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, তারা গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৮০ দিন গাজায় কোনো খাদ্য সরবরাহ করতে পারেনি। সংস্থাটি দাবি করেছে, এখনের খাদ্যসহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এই নিয়ে সম্প্রতি ১১১টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, গাজায় গণহারে মানুষ অনাহারে রয়েছে। কিন্তু গাজার বাইরে প্রচুর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে রয়েছে। দাবি করা হয়েছে, ত্রাণ বিতরণ করতে সংস্থাগুলোকে গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

আরও পড়ুন- ত্রাণ দেখিয়ে প্রাণ নেওয়া? যা চলছে গাজায়

আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইজরায়েল মার্চ থেকে গাজায় কোনো পণ্য প্রবেশ করতে দেয়নি। মে থেকে যাও সামান্য পরিমাণে ত্রাণ ঢুকতে দিয়েছে, তা ফিলিস্তিনবাসীদের জন্য যথেষ্ট নয়। আর ওই ত্রাণও মূলত বিতরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)। সংগঠনটির ত্রাণ বিতরণ কর্মকাণ্ড নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, গাজায় ত্রাণ বিতরণের নতুন ব্যবস্থাটি ‘অনিরাপদ' এবং এই ব্যবস্থায় আরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন৷ গুতেরেস সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘মানুষ নিজের এবং তাদের পরিবারের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে হত্যার শিকার হচ্ছেন৷ খাবারের সন্ধান কখনোই মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না৷''

গাজায় ইজরায়েল ও মার্কিন-সমর্থিত বিতর্কিত ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা প্রাক্তন এক কর্মী বিবিসি-কে জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের উপর গুলি চালানো হয়েছে। তাঁর কথায়, কয়েকজন নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি ত্রাণশিবির থেকে একটু দূরে, শুধুমাত্র একটু ধীরে চলায় ওয়াচ টাওয়ার থেকে ইজরায়েল বাহিনী গুলি চালায়।

এই পরিস্থিতিতে অক্সফাম, সেভ দ্য চিল্ডরেন-সহ আরও ১৩০টি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও জিএইচএফ-কে বলেছে, তারা যেন ত্রাণশিবির বন্ধ করে দেয়। কারণ, ওই ত্রাণশিবিরে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। কিন্তু জিএইচএফ-এর চেয়ারম্যান জনি মুর ব্রাসেলসে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন, ত্রাণশিবির বন্ধ করা হবে না। ব্রাসেলসে দাবি করেন, তারা এখনও পর্যন্ত পাঁচ কোটি ৫৫ লাখ মিল বিতরণ করেছেন।

ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী(আইডিএফ) একাধিকবার বলেছে, ত্রাণ নিতে গিয়ে মানুষজন সামরিক ব্যারিকেডের খুব কাছে চলে এলে, সতর্ক করতে গুলি চালানো হয়। তবে এর ফলে এত দিনে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে সেই সংখ্যা তারা জানায়নি। এখন গাজার ২৩ লাখ মানুষ পুরোপুরি ত্রাণে নির্ভরশীল। গাজার প্রায় প্রতিটি পরিবারই ঘরছাড়া। চলতি বছরের মে মাসের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগছেন।

আরও পড়ুন- যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে মুনাফা লুটছে মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট?

এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন-কে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। জি-সেভেনের প্রথম কোনো দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে। জি-সেভেন হল শিল্পোন্নত সাতটি দেশের জোট। ফ্রান্সের পাশাপাশি  এই জোটের সদস্য- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, কানাডা ও জাপান। ফ্রান্সের এই ঘোষণার পর ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলে হামাসের হামলার পর এই পদক্ষেপ আসলে "সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত" করা।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিন-কে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে স্পেন ও আয়ারল্যান্ড-সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশও রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, ইজরায়েলের প্রধান সমর্থক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য-সহ তার মিত্ররা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে দক্ষিণ ইজরায়েলে হামলার পর থেকে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, তখন থেকে এখনও পর্যন্ত গাজায় কমপক্ষে ৫৯ হাজার ১০৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, গাজায় প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টিতে রয়েছে এবং প্রতিদিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আরও কতদিন অন্ধকারে থাকতে হবে গাজাবাসীকে? সেই প্রশ্ন থাকছেই।

More Articles