বামপন্থীদের আক্রমণ করতেই নতুন আইন! মহারাষ্ট্র বিশেষ জননিরাপত্তা বিল ২০২৪ কী?

Maharashtra : এই বিধানগুলি সরাসরি UAPA-এর মতো সন্ত্রাস-বিরোধী আইন থেকে নেওয়া হয়েছে।

মহারাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ৯ জুলাই বিধানসভায় ‘মহারাষ্ট্র বিশেষ জননিরাপত্তা বিল ২০২৪’ পেশ করেছে। আইন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক বৃত্ত জুড়ে এই বিল বিপুল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সিটিজেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলি প্রস্তাবিত আইনটিকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের জন্য একটি অসাংবিধানিক নীলনকশা হিসাবে বর্ণনা করেছে। মনে করা হচ্ছে, জনসাধারণের সুরক্ষার কথা বলে যে কোনো সংগঠনকে বেআইনি ঘোষণা, যে কোনো সমিতিকে অপরাধী বলে দাগিয়ে দেওয়া বা যে কোনো সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং বিচারবিভাগীয় প্রতিকার অস্বীকার করার মতো ক্ষমতা দেবে এই আইন। মূলত বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী যে কোনো ব্যক্তিকে এই আইনে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করতে এই আইন আনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মানুষজন।

২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচন জিতে আসার পরে, অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য রাখার সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন– বন্দুকের নল থেকে এখন আর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা যায় না, এখন কলমধারী মানুষেরাও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। তাঁর স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল ‘আর্বান নকশাল’ বা যাঁরা ওই বন্দুকধারী নকশালদের আদর্শগতভাবে মদত দিয়ে থাকেন তাঁদের দিকে। কিছুদিন আগে যখন সিপিআই মাওবাদী দলের নেতৃত্বকে ‘অপারেশন কাগার’ চালিয়ে মারা হচ্ছে, তখন ও অমিত শাহ আরও একটি কথা বলেছিলেন, সেটাও মনে রাখা দরকার- ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ভারতবর্ষ থেকে নকশালপন্থা মুছে দেওয়া হবে। প্রশ্ন উঠছে, মহারাষ্ট্রের এই বিশেষ জননিরাপত্তা বিল ২০২৪ কি সেই উদ্দেশ্যেই আনা।

এই বিল যখন গত ২০২৪ সালের মহারাষ্ট্রের বাদল অধিবেশনে পেশ করা হয়, তখন থেকেই এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। আজকে যিনি মুখ্যমন্ত্রী, সেই দেবেন্দ্র ফডনবিস তখন ছিলেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী। এখন ভোটে পাশ হওয়া এই বিলটি রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হবে, বোঝাই যাচ্ছে এই বিলটি আইন হয়ে পাশ হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। বোঝা দরকার, কেন সেই সময়ে দেবেন্দ্র ফডনবিস এই বিলটি এনেছিলেন? ওই বিলে লেখা রয়েছে,
নকশালপন্থার ভয় শুধুমাত্র কিছু জায়গা বা অঞ্চলের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। নকশালপন্থার আদর্শ নানান রাজ্যে বিস্তার করেছে। বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন সংগঠন এবং মানুষের মধ্যে দিয়ে এই আদর্শের বিস্তার ঘটেছে। সরকারের মত অনুযায়ী এই সংগঠন এবং মানুষজন অস্ত্রধারী নকশালদের আইনি সহায়তা থেকে শুরু করে আশ্রয় দেওয়া সব কাজ করে চলেছে। যে আইন লাগু আছে, সেই আইন দিয়ে এই কাজ বন্ধ করা যাবে না, তাই নকশালপন্থী আদর্শকে থামাতে গেলে নতুন আইন আনতে হবে। বিলে বলা হয়েছে, ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্র প্রদেশ এবং উড়িষ্যা সরকার ও ৪৮টি নকশালপন্থী শাখা সংগঠনকে ইতিমধ্যেইনিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এই বিলটি সেইদিক থেকে আরও সুনির্দিষ্ট একটি পদক্ষেপ হতে চলেছে।

আরও পড়ুন- অবসরের আট মাস! কেন আজও বাসভবন ছাড়েননি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়?

মহারাষ্ট্র বিশেষ জননিরাপত্তা বিল ২০২৪-এ কী আছে?

এই বিলে সরকারকে যে কোনো সন্দেহজনক সংগঠনকে বেআইনি ঘোষণা করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। মূলত চারটি অপরাধকে চিহ্নিত করা হয়েছে এই বিলে, যা দেখলে সরকার কোনও সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে পারবে এবং যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। প্রথমত কোনও ব্যক্তি যদি ঐ সংগঠনে যুক্ত হন, দ্বিতীয়ত যদি সেই সংগঠনকে অর্থ সাহায্য করেন, তৃতীয়ত যদি অর্থ সংগ্রহ করতে সহায়তা করেন এবং যদি কোনো বেআইনি কাজে সরাসরি যুক্ত হন, তাহলে ওই ব্যক্তি সরকারের চোখে অপরাধী চিহ্নিত হবেন এবং তাঁর ২ বছর থেকে ৭ বছর অবধি কারাবাস হতে পারে এবং ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা হতে পারে, কিংবা দুটোই হতে পারে ক্ষেত্র বিশেষে। বিলে বলা হয়েছে, কোনো বেআইনি কাজ যা সমাজজীবনে ভয়ের সঞ্চার করতে পারে, সেই কাজে সমর্থন করলেও সেটা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে, এমনকি কোনো লেখাপত্র বা কোনো স্বাক্ষর থাকলেও সেটা সরকারের চোখে অপরাধ।

প্রাথমিকভাবে আপত্তি ওঠায়, এই বিলটিকে যৌথ সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। এই কমিটির মাথায় ছিলেন বিজেপির নেতা এবং মন্ত্রী চন্দ্রশেখর বাওয়ানকুলে। গত ৪ মার্চ থেকে ২৬ জুন অবধি এই কমিটি পাঁচবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে। কথা ছিল ১৫ এপ্রিল ২০২৫-এর মধ্যে এই সংক্রান্ত পরামর্শ দিতে হবে। দেখা গিয়েছিল PUCL, বিভিন্ন অসরকারি সংস্থা এবং বিরোধীরা ১২০০ মতো পরামর্শ দেয়, যার মধ্যে PUCL বা পিপলস ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবার্টিস জানায় এই বিলটি সম্পূর্ণ ফেরত নেওয়া জরুরি, কারণ এই বিলটি আসলে যে কোনো
বিরোধী মতকে দমন করার বিল। আরও যা পরামর্শ এসেছিল, তার মধ্যে থেকে মহারাষ্ট্র সরকার তিনটি বদল এনে বিলটিকে আবার পেশ করেছে।

প্রথমত, আগে প্রস্তাবনাতে পরিষ্কার করে বলা ছিল না, এই বিলটির মূল উদ্দেশ্য কী, এখন স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে, আর্বান নকশাল এবং নকশালপন্থী আদর্শ যাতে বৃদ্ধি না পায়, তাই এই বিল আনার প্রয়োজন। আগে যেহেতু বলা ছিল না, বেআইনি কাজ বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে, তাই এই বিলের প্ররিপেক্ষিতে অতি দক্ষিণপন্থী মানুষজনদের ও গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আসলে আর্বান নকশাল শব্দবন্ধ থাকলে চিহ্নিত করতে সুবিধা হবে। এই বিলের ৫(২) ধারায় আগে বলা হয়েছিল, তিনজন বিচারক থাকবেন পরামর্শদাতা কমিটিতে, তাতে বদল এনে বলা হয়েছে একজন অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারপতি, একজন সরকারি কৌসুলি এবং আরও একজন জেলা আদালতের বিচারপতি থাকবেন। আরও যে বদল আনা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে আগে একজন সাবইন্সপেক্টর অপরাধ বা অপরাধী চিহ্নিত করতে পারবেন এখন বলা হয়েছে একজন উচ্চস্তরের ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট মর্যাদার পুলিশকে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন-কেন ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এলন মাস্কের মাথাব্যথা?

এই আইনের বহু ভয়ঙ্কর দিক আছে, যা নিয়েও কথা বলা জরুরি। এই বিলের ৯ এবং ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে একজন জেলাশাসক এবং পুলিশ কমিশনারের হাতে এমন ক্ষমতা দেওয়া হবে যাতে তাঁরা একটি 'বেআইনি সংগঠনের' সাথে সংযুক্ত যে কোনো স্থানকে চিহ্নিত করতে পারেন এবং সরকারী আইনে বলিয়ান হয়ে সেই স্থান থেকে সমস্ত দখলদারকে উচ্ছেদ করতে পারেন। নারী ও শিশুদের এই ধরনের উচ্ছেদের আগে একটি অনির্দিষ্ট 'যুক্তিসঙ্গত সময়' দেওয়া হবে বলা হলেও সেটা কতদিন তা বলা নেই। সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি, অর্থ, নথি, বা ব্যক্তিগত প্রভাব সেখানে পাওয়া যায় সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা এবং যতদিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে ততদিন এই ধরনের জায়গার দখল ধরে রাখতে পারবেন।

এই বিধানগুলি সরাসরি UAPA-এর মতো সন্ত্রাস-বিরোধী আইন থেকে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কোনো সীমা নির্ধারণ ছাড়াই প্রয়োগ করা হয়েছে। অপরাধমূলক অন্যায়ের কোনো প্রমাণ ছাড়াই এই আইন অ্যাক্টিভিস্ট, অলাভজনক এবং রাজনৈতিক সমষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। উপরে উল্লিখিত এই বিধানগুলো যা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বহুবিধভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যে কোনও ব্যক্তি এবং সংস্থা উভয়কেই ক্ষমতায় থাকা যে কোনো সরকারের প্রতিবাদী বা সমালোচক করে তোলে, তাই অনেকে মনে করছেন এই আইনের মধ্যে দিয়ে বারবার মামলার মাধ্যমে হয়রানির শিকার হতে হবে বিভিন্ন ব্যক্তিদের এবং হয়তো তাঁরা জামিনও না পেতে পারেন। যেভাবে গৌতম নওলাখা, আনন্দ তেল্টুমডে, সোমা সেন বা রোনা ইউলসনদের হয়রানি করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে এরপর যে কোনো ব্যক্তিকেই এইভাবে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এমনিতেই কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি লোকসভার বিরোধী দলনেতাকেই আর্বান নকশাল বলে থাকে, এই আইনের মধ্যেদিয়ে তাঁরা এক ঢিলে কত পাখি মারলেন তা বলাই বাহুল্য। এই আইন যদি অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্য বা কেন্দ্র নিজেই আগামীদিনে আনে তাহলে যে বিরোধী পরিসরও সঙ্কুচিত হবে আগামীদিনে তা আজকেই বলে দেওয়া যায়।

More Articles