আমাদের বিয়ের দিনও বৃষ্টি, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে বসেছিল কবিতাপাঠের আসর
Arpita Ghosh : একদিন কবিতা ছাড়াও আরও কতগুলো কথা বয়ে আনল ওই নীল কাগজ। শেষে লেখা, 'মুখে বলতে হলে তো চারবার লাগত, তাই লিখেই জানালাম!’ সেদিন চারিদিকে কয়লার কালোর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম রামধনুকে!
তখন সবে মফস্সল থেকে কলকাতার পড়তে এসেছি। স্কটিশ-এ পড়ি, AIWC হোস্টেলে থাকি। মাঝে মাঝে মেজ জেঠুর বাড়ি বেলঘরিয়ায় যাই। আমি আর ভাই (কৌশিক ঘোষ) পিঠোপিঠি ভাইবোন— তাই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বও জোরালো। একদিন সম্ভবত বেলঘরিয়াতেই একটা ছেলের সঙ্গে ভাই আলাপ করিয়ে দিল। বলল, ‘রাহুলদা, কবি', দেখলাম ঝকঝকে দুটো চোখ— খুব রোগা।
আরও পড়ুন-
‘এ রোমাঞ্চের জন্য বাঁচা চলে’, বাংলা কবিতায় বারবার যেভাবে উঠে এসেছে ক্রিকেট
খুব ছোটোবেলা থেকে কবিতা বলা ও পড়ার অভ্যেস ছিল, তাই আমাদের দ্রুত বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তবে আমি হস্টেলে থাকতাম বলে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ তেমন হত না। একমাত্র জেঠুর বাড়ি গেলেই রাহুল আসত— আমি, ভাই, রাহুল প্রভূত আড্ডা দিতাম। রাহুল বরাবরই খুব দ্রুত কথা বলত। আমি মজা করে বলতাম, ‘তুমি কাউকে প্রেম নিবেদন করলে অন্তত চারবার বলতে হবে, নাহলে সে-মেয়ে বুঝতেই পারবে না!' গ্ৰাজুয়েশনের পরে আমি উড়িষ্যায় চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিলাম, থাকতাম ভুবনেশ্বরে। কোল স্টকইয়ার্ড ম্যানেজার— একাই থাকতাম। সঙ্গী জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী, এমন অনেক কবি! বিখ্যাত সব সাহিত্যিকরাও সঙ্গে ছিলেন।

কবি রাহুল পুরকায়স্থ
একদিন হঠাৎ-ই ওই কয়লার কালো-কালো হাত ছুঁয়ে পৌঁছে গেল একট নীল ইনল্যান্ড লেটার— তাতে দুটো কবিতার লাইন আর নীচে রাহুলের নাম লেখা। না রয়েছে সম্বোধন, না কুশল বিনিময়! ভাগ্যিস তখন মোবাইল ছিল না! আমিও উত্তর দিলাম নীল কাগজেই, অন্য কবির ধার-করা কবিতার পংক্তি! না সম্বোধন, না কুশল! নীল কাগজের গতি বাড়তে থাকল। সপ্তাহে দু-দিন তিনদিন আসত সে! তারপর একদিন কবিতা ছাড়াও আরও কতগুলো কথা বয়ে আনল ওই নীল কাগজ। শেষে লেখা, 'মুখে বলতে হলে তো চারবার লাগত, তাই লিখেই জানালাম!’ সেদিন চারিদিকে কয়লার কালোর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম রামধনুকে!
আরও পড়ুন-
আলিপুর চিড়িয়াখানায় দুপুর কাটাতেন জীবনানন্দ
কলকাতায় আসা-যাওয়া বাড়ল আমার! থিয়েটার দেখা থেকে কফি হাউস— বেলঘরিয়া থেকে বিরলাপুর, আমাদের অবিরাম শব্দেরা ভীড় করে আসত! ফিরে এলাম কলকাতায়। চাকরি নিলাম একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায়। আমার সন্ধেবেলাগুলো ছিল কবির জন্য! রাহুলই আমাকে কবিতার সঙ্গে সম্যক পরিচয় করিয়েছিল— কবিদের সঙ্গেও। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে সাপ্তাহিক কবিতার আসরে যে কত কবিতা ও গদ্যের কাছাকাছি এসেছি তার ইয়ত্তা নেই! এভাবেই চলতে-চলতে, এইরকমই এক জুলাই মাসে আমরা পরস্পরের সঙ্গী হয়ে পথ চলার অঙ্গীকার করি। মনে আছে, সেদিন বীরেনদার (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) বাড়িতে কবিতাপাঠের আসর বসেছিল!

নাট্যনির্দেশক ও অভিনেত্রী অর্পিতা ঘোষ
একসঙ্গে পথ চলা থেমে গিয়েছিল বছর দশেক পরে। সম্পর্কের জটিল বুনন ক্রমশ আলগা হয়েছে জীবনের স্রোতে— ঢেউয়ের ধাক্কায়! হাত ছেড়ে গেলে— কেউ রাহুলকে দোষারোপ করেছে, কেউ আমাকে! কিন্তু আমাদের মধ্যে তিক্ততা আসেনি কখনো! দুজনেই বন্ধু থেকে গেছি! নিয়মিত কথা হত আমাদের— আমার নতুন নাটক— ওর কবিতার বই! দেখাও হত কখনো-কখনো! শেষ দেখা রবীন্দ্রসদনে, বাংলা আকাদেমির পুরষ্কার প্রদান অনুষ্ঠানে, খুব কষ্ট পাচ্ছিল!
রাহুল যেদিন চলে গেল আকাশ ভাঙা বৃষ্টি, ঠিক যেমনটা আমাদের বিয়ের দিনে হয়েছিল! ভালো থেকো রাহুল...
এখানে দিনের— জীবনের স্পষ্ট বড় আলো নেই
ধ্যানের সনির্বন্ধ অন্ধকার এখানে আসেনি
চারিদিকে ভোরের কী বিকেলের কাকজ্যোৎস্না ছায়ার ভিতরে
আহত নগরীগুলো কোন এক মৃত পৃথিবীর
নিহত জিনিশ বলে মনে হয়, তবু,
মৃত্যু এক শান্ত দীন পবিত্রতা...