নীল সমুদ্র ও অলিভ পেস্ট্রি, চির অবসরের শহর পিরান

Piran Tour: ভিয়েনার মতই এখানেও একটা মনের মত ক্যাফে আবিষ্কার করেছি আমরা। অথবা বলা যায়, ক্যাফেটাই আমাদের আবিষ্কার করে নিয়েছে। এখানেও সাহিত্যের অনুষঙ্গ কেমন আপনা থেকেই তৈরি হয়ে গেল।

লুবলিয়ানা শহরটা দুদিনেই কেমন চেনা হয়ে গেল। এত ছোট শহর, আর আমরা মোটের উপর শহরের কেন্দ্রেই ঘোরাফেরা করি। আধুনিক শহরটা যত্ন করে তৈরি করেছিলেন যে স্থপতি সেই ইয়োজে প্লেচনিকের বাড়িটা যাওয়া আসার পথেই একদিন চোখে পড়ে গেল। অনাড়ম্বর শহরের আর্কিটেক্টের অনাড়ম্বর বাড়ি, এখন একটা ছোট মিউজিয়াম রয়েছে সেখানে। ভিয়েনার মতই এখানেও একটা মনের মত ক্যাফে আবিষ্কার করেছি আমরা। অথবা বলা যায়, ক্যাফেটাই আমাদের আবিষ্কার করে নিয়েছে। এখানেও সাহিত্যের অনুষঙ্গ কেমন আপনা থেকেই তৈরি হয়ে গেল। ভিয়েনায় ক্যাফের নাম ছিল ক্যাফে ক্যামু, লুবলিয়ানার ক্যাফের নাম ‘মাউস’।

ক্যাফে মাউস

একদম নদীর গায়ে, রাস্তার উপরে রোদ্দুর মাখানো কয়েকটা টেবিল চেয়ার পাতা, নিরিবিলি সময় কাটানো যায় অনেকক্ষণ। ছোট শহরের মজা হল, হাঁটাচলার পথেই চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। এক সন্ধ্যায় ঘুরেফিরে খানিক ক্লান্ত হয়ে ক্যাফেতে বসেছি, একটা টেবিল দূরে দেখি সেই বইয়ের দোকানের মান্‌সা বসে রয়েছে। সঙ্গে তার পুরুষবন্ধু। দিনের কাজের শেষে দু-জনে দুটো বিয়ার নিয়ে বসেছে। কথায়-কথায় বেশ একচোট আড্ডা হয়ে গেল।

আরও পড়ুন-

ভিয়েনার বৃষ্টিদিন: ক্যাফে কামু আর সাশার নিজের দেশ

আগের লেখায় বলেছিলাম যে লুবলিয়ানা শহরটা অসম্ভব শান্ত আর নির্বিবাদী মনে হয়েছে। মানে, আজকের ভাষায় যাকে বলে ‘ভাইব’, সেই ভাইবটা খুব দুলকি চালের আর আন্তরিক। সকলেই বেশ গোপ্পে আর আলাপী টাইপের। একেবারে অন্যরকম ভাইব পেয়েছিলাম ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগ্রেবে পৌঁছে। সে-কথা বলব পরের কিস্তিতে। তা মান্‌সা আর তার বয়ফ্রেন্ড অস্কারের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে ব্যাপারটা খানিক খোলসা হল। কথায়-কথায় স্বাভাবিকভাবেই বারবার পুরনো যুগোস্লাভিয়ার কথা চলে আসে। সে-দেশ এরা দেখেনি, একেবারেই তরুণ প্রজন্ম। যুদ্ধও দেখেনি এরা সে-সময়ের। “আমাদের মা-বাবারাও যে খুব দেখেছে তা বলা যায়না অবশ্য”, বলে ওঠে অস্কার। “কেন?”, জিজ্ঞেস করি। তড়বড় করে মান্‌সা জবাব দেয়, “আরে, আমাদের এখানে তো যুদ্ধের কোনো আঁচই লাগেনি বলা যায়। মাত্র হপ্তা দুয়েক যুদ্ধ হয়েছিল। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্কারমিশ’। আর বোধহয় গোটা দশেক ক্যাজুয়াল্টি হয়েছিল।” বিয়ারে একটা লম্বা চুমুক দেয় অস্কার। তারপর প্রায় বিশেষজ্ঞের মত বলে, “তোমরা তো যুগোস্লাভিয়া ভেঙে তৈরি হওয়া আরও দেশে যাচ্ছ। মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা, আমরাই সবচেয়ে ফ্রেন্ডলি।” সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে মান্‌সা। সে তো ক্রমাগত বোঝা যাবে, তবে এঁদের শান্ত, পড়ুয়া স্বভাবের একটা সাম্ভব্য ঐতিহাসিক কারণ বোঝা গেল একরকম।

কুটনা হোরায় হাড়ের তৈরি গির্জার ভিতর

লুক্কা শহরে সান মিকেল গির্জার অংশ

ঘুরে বেড়ানোর নিত্যনতুন জায়গা আবিষ্কার করতে বলা চলে নন্দিনীর জহুরির চোখ। সে ঠিক খুঁজে-খুঁজে চমৎকার সব বেড়াবার জায়গা আবিষ্কার করে ফেলে। সেগুলো ঠিক সাবেকি টুরিস্ট স্পট নয়, অথচ একটা মনে রাখার মত অভিজ্ঞতা হয়। এ ভাবেই আমরা প্রাগ থেকে গিয়েছি কুটনা হোরা নামের এক আশ্চর্য গ্রামে, ফ্লোরেন্স থেকে গিয়েছি বিখ্যাত সুরকার আর অপেরা প্রণেতা পুচ্চিনির জন্মস্থান লুক্কা শহরে, অথবা গ্রানাডা শহরের অদূরে কবি লোরকার গ্রামের বাড়ি দেখতে প্রত্যন্ত ফুয়েন্তে ভাকেরোস আর ভালদেরুব্বিওতে। সে সব আজব যাত্রার গল্প তোলা থাক। পরে কখনও বলা যাবে। এই যাত্রায় আমাদের গন্তব্য লুবলিয়ানা থেকে ঘণ্টা দুয়েক দূরে পিরান শহর।

লোরকার গ্রাম ফুয়েন্তে ভ্যাকেরোস

ভালদেরুব্বিও গ্রামে লোরকার লেখার ঘর

সকাল সকাল বাস স্টেশনে পৌঁছে অবশ্য একটা সুখের বিপত্তি দেখা দিল। টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছি, সামনের ভদ্রলোক ইংরেজিতে তার স্ত্রীর সঙ্গে একথা সেকথা বলছেন। খেজুরে আলাপ করলাম। এসেছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। আজ চলেছেন লুবলিয়ানা থেকে মাত্র ঘণ্টা খানেক দূরে ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরে। “ছবির মত শহর শুনেছি”, বললেন ভদ্রলোক, “টুক করে দেখে আসি”। আমরা খানিক আতান্তরে পড়লাম। উঠল বাই তো ত্রিয়েস্তে যাই? লাইন এগিয়ে চলেছে, এদিকে আমরা ঠিক করে উঠতে পারছি না। শেষমেশ নন্দিনী বিধান দিল, “ইতালি তো আসিনি এবারে, এসেছি স্লোভেনিয়া। অতএব পিরানেই যাব!” কথায় অবশ্য যুক্তি আছে একরকম। পিরান পাঁচ শতাব্দীর উপর ইতালির অংশ ছিল, ভেনিশিয়ান সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইতিহাসের নানা অভিঘাতে আজ সে স্লোভেনিয়ার অংশ। যদিও অনেকেই আজও এখানে ইতালিয়ান ভাষাই বলে থাকে। তাহলে ইতালিও হল, আবার স্লোভেনিয়াও হল! টিকিট কেটে উঠে পড়লুম পিরানের বাসে।

পিরান শহর

নীল এড্রিয়াটিক সাগরের গায়ে যেন ভেসে রয়েছে পিরান শহর। সমুদ্রকে একদিকে রেখে গোটা শহর ঘুরে দেখতে লাগে বড়জোর দেড় ঘণ্টা। শহরের মাঝখানে ছোট্ট একটা খেলনা স্কোয়ার, মাঝে তারতিনির মুর্তি। প্রখ্যাত সুরকার আর বেহালা বাদক জুসিপ্পে তারতিনির জন্মস্থান পিরান, তাঁর নামেই শহরের এই কেন্দ্রস্থল তারতিনি স্কোয়ার।

তারতিনি স্কোয়ার, পিরান।

আবার আপনমনেই খেয়াল করি এঁদের কাছে সংস্কৃতির গুরুত্ব। একেবারেই তথাকথিত ধনী দেশ নয় স্লোভেনিয়া। তবু জীবনের অনেকটা সময় সংস্কৃতির চর্চায় ব্যয় করে অনুভব করি। এখানকার বিখ্যাত মিষ্টি হল অলিভ পেস্ট্রি। রেস্তোরাঁয় বসে অর্ডার দিলে বেশ অভিনব উপায়ে এঁরা পরিবেশন করেন। পেস্ট্রির গায়ে একটা ড্রপার, তার মধ্যে অলিভ অয়েল। ড্রপারে অল্প চাপ দিলে অলিভের তেল পেস্ট্রির ভিতরে প্রবেশ করে, এতে নাকি স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। সে যাহোক, অলিভ পেস্ট্রি খেয়ে সমুদ্রের গা দিয়ে শহর ঘুরতে বেরলাম। টুরিস্ট হাতে গোনা, বেশীরভাগ স্থানীয় মানুষ। কেউ সাঁতার কাটছে, কেউ মাছ ধরছে, কেউ পাড়ার রেস্তোরাঁয় খানিক স্থানীয় ওয়াইন নিয়ে বসে স্রেফ গুলতানি করছে, যুবক-যুবতী প্রেম করছে পাখির মত নিশ্চিন্তে। পৃথিবীর এইটুকু অংশের যেন কোনো কাজ নেই। সারা বিশ্ব যে ‘স্লো লিভিং’ বলে হেদিয়ে মরছে সে খবর বুঝি পিরান অব্দি এসে পৌঁছয়নি, নীল সমুদ্দুরের দিকে তাকিয়েই বুঝি এঁদের দিন কাটে। আমরাও একটা গোটা দিন হেঁটে, চলে, বসে স্লো লিভিং মকশো করে ফেরার বাস ধরলাম।

পিরানের বিখ্যাত অলিভ পেস্ট্রি

আরেকদিনের কথা ছোট করে বলি। বিশ্বজোড়া খ্যাতি যে জায়গার, সারা বিশ্বের পর্যটক যেখানে আসতে চান, বহু ধনী মানুষ তাদের ডেসটিনেশন ওয়েডিং করেন যে জায়গায়, সেই লেক ব্লেড লুবলিয়ানার অদূরেই। সেখানেও গেলাম একদিন। সুন্দর, শান্ত লেক, দূরের একটা দ্বীপে ছোট গির্জা, নৌকো করে পৌঁছনো যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। মনোরম। তবে এত বেশী সংখ্যায় পর্যটক যে নিস্তরঙ্গ জলের সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায় না মোটে। তবে কিনা খেয়াল করে দেখবার মত বস্তুটি বুঝি লেক ব্লেড নয়, তার পাশে একটা প্রাসাদোপম অট্টালিকা। এক সময়ে যুগোস্লাভিয়ার অবিসংবাদী কমিউনিস্ট নেতা মার্শাল টিটোর সামার হাউস।

লেক ব্লেড

অদূরে কাঁচ দিয়ে মোড়া তাঁর মিটিং রুম। লেক ব্লেডের উপর তার ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জানলাম মার্শাল টিটোর এই প্রাসাদে অতিথি হয়ে এসেছেন হলিউডের তারকা এলিজাবেথ টেইলর থেকে রিচার্ড বারটন, অথবা সোফিয়া লোরেন, কিংবা রাজনীতিবিদ নিকিতা ক্রুসচেভ থেকে ইন্দিরা গান্ধী। আজকাল টিটোর এই প্রাসাদ একটা বিলাসবহুল হোটেল হয়েছে। সেই অব্দি অবশ্য আর যাওয়া হল না। দূর থেকে দেখতে-দেখতে টিটোর গ্রীষ্মকালীন জীবন কল্পনা করার চেষ্টা করলাম খানিক। খুব যে পেরে উঠলাম বলতে পারি না। এই জোসিপ টিটোকে নিয়ে সে-সময়ের যুগোস্লাভিয়া ভেঙে তৈরি হওয়া বিভিন্ন দেশের মানুষের মতামত কত আলাদা সে-কথা পরের কোনো কিস্তিতে বলব।

লেক ব্লেডের গায়ে টিটোর প্রাসাদ আর মিটিং রুম

লেক ব্লেড থেকে লুবলিয়ানা ফিরতে লাগল ঘণ্টা দুয়েক। সময় গড়িয়েছে অনেকটাই, সন্ধ্যা সাতটার রোদ পিঠে নিয়ে টুকটুক করে হেঁটে এসে পৌঁছলাম সেই ক্যাফে মাউসে। যে ছেলেটি বেশীরভাগ সময় বিস্তর ছোটাছুটি করে ক্যাফের সব খরিদ্দারের ফরমায়েশ হাসিমুখে জোগান দেয় তার নাম দামিয়ান। বছর বিশ-বাইশের হাসিখুশি ছোঁড়া। এ ক-দিনে আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে ভালই। আমাদের ঘোরাঘুরি কেমন হচ্ছে রোজই খোঁজ নেয়, মতামতও দেয় টুকটাক। আগেই একদিন আমরা খেয়াল করেছিলাম যে ক্যাফে মাউস যে বাড়িটার একতলায় সে বাড়িটার খানিকটা রঙ করা, খানিকটা বেমানানভাবে পলেস্তারা খসা।

একতলার পলেস্তারা খসা বাড়ি

আজকেও আমরা দু-জনে সেদিকেই তাকিয়ে বলাবলি করছিলুম কেমন উত্তর কলকাতার ভাগের বাড়ির মত ব্যাপার। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আন্দাজ করতে পেরে দামিয়ান নিজেই যোগ দেয় আমাদের কথায়, “যুগোস্লাভ হ্যাবিট বুঝলে?” দুজনেই মাথা নাড়লাম, বুঝিনি বিলকুল। “আরে ওই যে পলেস্তারা খসা অংশ ওখানে এক বুড়ি থাকে। এখনও যুগোস্লাভিয়া থেকে বেরোতে পারেনি। বাড়ির মেরামত করা, রঙ করা, সব রাষ্ট্রের দায়িত্ব, নিজের পয়সা খরচা করবে না মোটে।” “আগে বুঝি রাষ্ট্র এই সব মেরামত আর রঙ করে দিত?” নন্দিনী জিজ্ঞেস করে।

আরও পড়ুন-

ভিয়েনার দিবারাত্র: মিউজিয়াম, উনিশ শতক আর রোদ্দুরমাখা ক্যাফেটি

“আদৌ না। যতটুকু করত, তাতে সাধারণ ভদ্র জীবন যাপন করা সম্ভব ছিল না একেবারেই।” দামিয়ান প্রায় গরগর করে ওঠে। “তুমি কী করে জানলে? তোমার তো তখন জন্মই হয়নি।” “আমি আমার মা-বাবা, ঠাকুমার কাছে শুনেছি। পার্টির সদস্য হলে একরকম জীবন। না হলে, অন্যরকম।” “তা মা-বাবা কি বলেন যে এখন অনেক ভাল আছেন?” আমি জিজ্ঞাসা করি। “অবশ্যই”, উত্তর দেয় দামিয়ান। “এখন আমরা স্লোভেনিয়া হিসেবে অনেক স্বচ্ছল, অনেক মুক্ত, we are able to look out towards the world”। আমরা তিনজনেই চুপ করি খানিক। পরে ভেবেছি, এটা একরকম মত, দামিয়ান বা তার পরিবারের। শাসার কাছে আরেকরকম শুনেছি। আবার পরে, বসনিয়ায় গিয়ে শুনেছি অন্য রকম যুক্তি। নানা ভাষা, নানা মত। তবে বিবিধের মিলন যে মনের মিলন ছিল না তা এই যাত্রায় বেশ বুঝতে পারছি। পরের গন্তব্য ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী, জাগ্রেব। সে-গল্প পরের কিস্তিতে।

More Articles