কবি রাহুল পুরকায়স্থ বাড়িতে ফিরলেই হয়ে যেতেন এক বিরাট শিশু!
Rahul Purkayastha : পুপলু! আমাদের এই নতুন বাড়ির মায়াবি শূন্যতায় তুমি যে অপেক্ষা রচনা করলে... এই কান্না আমি কোথায় জমিয়ে রাখব?
কবি রাহুল পুরকায়স্থ। আমাদের সবার রাহুলদা। যে রাহুলদা এক জায়গায় বলেছিল, 'গ্রহকেন্দ্র গৃহ কেন্দ্র ঘুম-ঘুম ঘোরে/ প্রতি জন্ম মৃত্যু নেয়, প্রতি জন্ম মরে'— সেই রাহুলদাই বাড়িতে ছোট্ট পুপলু, এক বিরাট শিশু। ঘুম থেকে উঠতেই যেভাবে কোনো শিশু তার মা-কে খোঁজে, সেইভাবেই ওই পুপলু আঁকড়ে থাকত তার পরিবারকে।
কুপির আলোয়
সুদূরের হাটে এক
সামান্য হাটুরে বটে আমি
ঘুমের দেয়াল বেয়ে নামি
পুরাতন কবিতা খাতায়
পোকা কাটা পসরা বানাই
দিন শেষে না বিকোনো পণ্য নিয়ে
ঘরে ফিরে যাই
রাঁধি বাড়ি খাই।।
এই কবিতা লেখেন যে রাহুল পুরকায়স্থ, সেই রাহুলদারই বাড়িতে কত ছেলেমানুষি, কত যে আবদার, বায়না, খুনসুটি, অভিমান! রবিবারের সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাঁর প্রথম প্রশ্ন, আজকের স্পেশাল মেনু কী? প্রতি রবিবার কিছু বিশেষ হতেই হবে, নয়তো সে অভিমানে ভরপুর। একটা আবদার শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যেত পরের আবদার। যেমন, লেখাটা শুরু করব, কয়েকটা ভালো পেন কিনে দাও না? কিংবা, ‘ওই বইটা একটু খুঁজে দাও!’, ‘নখ কেটে দাও...’, 'পিঠ চুলকে দাও’— এমন কত কী! সব সময় কিছু-না-কিছু চলতেই থাকত। আরেকদিন পুপলু আবদার করল, ‘আজ কিন্তু চুপিচুপি আইসক্রিম খাব দু-জন!’ একদিন তো ডিমের ডেভিল খেয়ে মহা খুশি! পুপলু রচনা করল ট্যাগ লাইন:
আমরা দুটি দামড়া
করি না কামড়ি-কামড়া
কবি রাহুলদা, সাংবাদিক রাহুলদা, গভীর অনুভবের রাহুলদার যাপন ছিল কখনো-কখনো এলোমেলো। পারিবারিক শিশু রাহুলদাকে এ-বিষয়ে বোঝানো হল, ‘পুপলু, ওষুধের পাতা থেকে ওষুধগুলো এমন এলোমেলো ভাবে খাও কেন? এর থেকেই বোঝা যায় তুমি অরগানাইজড নও!’ কিছুদিন এই কথা শোনার পর স্বগতোক্তি করতে-করতে ওষুধ খেত, বলত, ‘রাহুল, তুমি অরগানাইজড নও, ওষুধ খাওয়া দেখেই লোকজন সেটা বুঝে যাচ্ছে! পরপর ওষুধ খাও, পরপর...’ কিছুদিন খুব ঘটা করে মেন্টেন করার পর, আবার যে কে সেই!
স্কুল-পড়ুয়া বাচ্চাদের মতোই রাহুলদার পারিবারিক চলন-বলন ছিল ভীষণ মিষ্টি! লকডাউনের সময় বাড়িতে শুরু হয়েছিল ‘মেডিটেশন পর্ব’। প্রতিদিনই রাহুলদার প্রাথমিক চেষ্টা ছিল ‘আজ নয় কাল’ বলে কাটিয়ে দেওয়ার। তারপর শুরু হত বারগেনিং... মেডিটেশনের আধ ঘণ্টার সময়সীমাকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ মিনিটে নামিয়ে আনত, নানা অছিলায়। আবার সে পাঁচ মিনিটও চোখ পিটপিট করেই চলত!

রাহুল পুরকায়স্থ ও বর্ণালী সেনগুপ্ত, বইমেলায়
পুজো, জন্মদিন, নববর্ষ, সরস্বতী পুজোয় নতুন জামা পরে গদগদ হয়ে থাকত, একদম শিশুর মতো। প্রতি বছর লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতী পুজো ও কালী পুজোয় বাড়িতে যেন ‘ঝুলন যাত্রা’। সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে আলপনা এঁকে, খিচুড়ি রান্না হলে তবে তাঁর শান্তি! আসলে বন্ধুপ্রিয় পুপলুর এইসব আয়োজনের নেপথ্যে ছিল জমিয়ে আড্ডা, একসঙ্গে সবাই মিলে খিচুড়ি খাওয়া আর কবিতা-গান! ভালো গান শুনতে ও শোনাতে রাহুলদার সমান আগ্রহ ছিল। কিন্তু সমস্যা হত যখন আবেগপ্রবণ হয়ে নিজেও গাইতে শুরু করত, ক্র্যাকিস গলায়। তেমনই এক বর্ষার দিনে রাহুলদা গেয়ে উঠল,
এমনও দিনে তারে বলা যায়...
দু-জনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুঃখী...
স্বভাবতই, এর ফলে প্রশ্ন উঠল, ‘পুপলু, তুমি দুঃখী?’ ফলত, রবীন্দ্রসংগীত বদলে গেল এবং পরবর্তী সময়ে রাহুলদার বন্ধুকুল জানলেন, সংসার অতি বিষমবস্তু, তা করতে গেলে কত কী যে করতে হয়! রবীন্দ্রসংগীতও বদলাতে হয়, 'এমনও দিনে তারে বলা যায়.../দু-জনে মুখোমুখি, গভীর সুখে সুখি...'
দুষ্টু-মিষ্টি আর প্রচণ্ড বাধ্য এক শিশুকে আগলে রেখে ছিলাম এই ক-বছর! যে-পুপলু সবার রাহুলদা, সবার কাছে যে রাহুল পুরকায়স্থ, সে যেন তাঁর আসল ভালোবাসার কাজগুলো মন দিয়ে করতে পারে।

নিরালায় দুজনে
‘তার না-বলা কথার কাছে কান পেতে আছি’ পুপলু! আমাদের এই নতুন বাড়ির মায়াবি শূন্যতায় তুমি যে অপেক্ষা রচনা করলে... এই কান্না আমি কোথায় জমিয়ে রাখব?