NISAR: ভূমিকম্প থেকে জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা জানাবে স্যাটেলাইট! ‘নিসার’-র থেকে কী কী জানা যাবে?
NISAR satellite : মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সমগ্র ভূখণ্ড, এমনকি তুষারাবৃত অঞ্চলের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করে ফেলবে।
শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে বুধবার বিকেল ৫ টা ৪০ মিনিটে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে নাসা ও ইসরোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ, ‘নাসা-ইসরো সিনথেটিক অ্যাপারচার রেডার’ বা ‘নিসার’। প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার খরচা করে নির্মিত ২,৩৯২ কেজির এই স্যাটেলাইটটি জিএসএলভি-এমকে২ রকেটে চেপে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে। মিশন সফল হলে আগামী পাঁচ বছর ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৪২ কিলোমিটার উপর দিয়ে নীল গ্রহকে পর্যবেক্ষণ করবে এবং আমাদের উন্নত মানের ছবি ও তথ্য পাঠাবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এতে দুটো আলাদা আলাদা তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট অ্যাপারচার রেডার রয়েছে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠে কয়েক মিলিমিটারের মধ্যেও যদি কোনো পরিবর্তন হয়, তাও ধরা পড়বে এই কৃত্রিম উপগ্রহের রেডারে।
স্যাটেলাইটের কথা বললেই রেডারের প্রসঙ্গ চলে আসে, তখন আমাদের চোখের সামনে ভাসে বড় বড় অ্যান্টেনার ছবি, যেগুলো থেকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সংকেত (মাইক্রো ওয়েভ, রেডিও ওয়েভ) পাঠানো হয়, আবার বিভিন্ন বস্তু থেকে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা সংকেতগুলোকে সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। সেখান থেকে জানা যায় তাদের দূরত্ব, গতিবিধি, আকার ইত্যাদি।
‘সিনথেটিক অ্যাপারচার রেডার’ এক বিশেষ ধরণের উন্নত প্রযুক্তির ইমেজিং রেডার, যেটিতে বিশাল আকারের অ্যান্টেনার ব্যবহার না করেও উন্নত মানের ছবি তোলা সম্ভব। সাধারণত মহাকাশে ব্যবহারের জন্যই এটি বানানো। নিসারে স্থাপিত অ্যান্টেনার ব্যাস ১২ মিটার, যেটি থেকে প্রাপ্ত ছবি পৃথিবী পৃষ্ঠে অবস্থিত ২০ কিমি ব্যাস বিশিষ্ট অ্যান্টেনার সাথে পাল্লা দেওয়ার মতোও ক্ষমতা রাখে।
আরও পড়ুন- একটি তারার দু-বার মৃত্যু! বিজ্ঞানীদের পাওয়া নতুন তথ্য কী বলছে?
বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে কাজ করা এই স্যারের সুবিধা কি?
সাধারণত L-ব্যাণ্ড ও S-ব্যাণ্ড দুই ধরনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের জন্য কাজ করে নিসার। উচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট মাইক্রো ওয়েভ ব্যবহার করে L-ব্যাণ্ড রেডার- ধোঁয়া, মেঘ, ঘন জঙ্গল ভেদ করে ছবি তুলতে সক্ষম। অপরদিকে ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ব্যাবহার করায় S-ব্যাণ্ড রেডার শস্য ক্ষেত, জলাশয় ইত্যাদির ছবিও তোলে। এমনকি শস্যের বৃদ্ধি কেমন হচ্ছে সে তথ্যও আমাদের সামনে হাজির করে দিতে পারে। নিসারে এই দুই ব্যাণ্ডের রেডার একসঙ্গে কাজ করায় কোনো অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের ছবি একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়, যেটি আলাদা আলাদাভাবে কখনো সম্ভব হতো না। কারণ সেক্ষেত্রে একই সময়ে একই জায়গা পর্যবেক্ষণ করা যেত না।
ইসরো ও নাসার যৌথ উদ্যোগে তৈরি স্যাটেলাইট 'নিসার' উৎক্ষেপণ
দুটো ভিন্ন স্যারকে একত্রে স্থাপন করা প্রযুক্তিবিদদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এ কাজ করতে প্রায় এক দশক লেগে যায় বিজ্ঞানীদের। কোভিডের সময় নাসার জেট প্রপালশান ল্যাবরেটরি ও ইসরোর স্পেস অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও প্রোকৌশলীদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল এই নিসার। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর মার্কিন সফরের পর নাসার তৎকালীন প্রশাসক চার্লস বোল্ডেন ও ইসরোর চেয়ারম্যান কে রাধাকৃষ্ণানের মধ্যে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারি স্যাটেলাইট মিশন পরিচালনার জন্য চূক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ছিল দুটি মহাকাশ জয়ী দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত চুক্তি।
এই মিশনে L-ব্যান্ড সিনথেটিক অ্যাপারচার রেডার, অ্যান্টেনা, উন্নত প্রযুক্তির যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস রিসিভার, সলিড স্টেট রেকর্ডার, পেলোড সিস্টেম প্রভৃতি সরবরাহ করেছে নাসা।আবার ইসরো জোগান দিচ্ছে S-ব্যান্ড রেডার, লঞ্চ ভিকেলের, সেই সঙ্গে উৎক্ষেপণের ব্যবস্থাও করেছে। এই মিশনে মোট খরচের বেশীরভাগটাই (প্রায় ১.১৬ বিলিয়ন ডলার) করেছে নাসা। ইসরো খরচা করেছে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার। দুটি সংস্থাই স্বতন্ত্র ভাবে নিজেদের জায়গা থেকেই পরিচালনা করতে পারবে।
আরও পড়ুন- আলোর রং পরিবর্তন হয়ে যাবে! পদার্থ বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা মেটালেন্স কী?
নিসার যা তথ্য আমাদের দিতে পারবে
পৃথিবী পৃষ্ঠে ভূমিরূপের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, গাছপালার পরিবর্তনের পাশাপাশি কোন হিমবাহ কত দ্রুত গলে যাচ্ছে সে-সব তথ্য পৃথিবীতে পাঠাবে এই উপগ্রহ। ভূমিকম্পের আগে ফল্ট-লাইনের পরিবর্তন, জলবায়ুর হঠাৎ কোনো পরিবর্তন হলে, এই যে বছর বছর আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা হয়, পাহাড়ে ধস নামে, এসব ক্ষেত্রে বন্যার আগাম হদিশ দিতে পারবে নিসার। এর পাশাপাশি, সমুদ্রের বরফের শ্রেণিবিন্যাস, জাহাজ শনাক্তকরণ, উপকূলরেখা পর্যবেক্ষণ, ঝড়ের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ, মাটির আর্দ্রতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও ভূপৃষ্ঠের জল সম্পদের ম্যাপিং করতে পারবে এই উপগ্রহ। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, এই স্যাটেলাইট প্রতি ৯৭ মিনিটে পৃথিবীকে একবার চক্কর দেবে; এবং মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সমগ্র ভূখণ্ড, এমনকি তুষারাবৃত অঞ্চলের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করে ফেলবে।
আমাদের ইসরো যেখানে মহাকাশ অভিযানে একের পর এক ইতিহাস সৃষ্টি করছে, সেখানে এই যৌথ অভিযানের কি খুব দরকার ছিল?
এর উত্তর দেওয়ার আগে আমরা একটু পিছিয়ে যাই। ২০১৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও নিসারের মতো যৌথ মিশনের ধারণার জন্ম হয়েছে আরও ৭ বছর আগে। ২০০৭ সালে একটি মার্কিন কমিটি গঠন করা হয়, যারা ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, মেঘাচ্ছন্ন ভূমিরূপের পরিবর্তন, হিমবাহের প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ জলস্তর, হাইড্রোকার্বন ভাঁড়ারের মতো বিষয়ের উপরে বিরামহীন নজরদারি চালানোর জন্য একটা উপগ্রহ ভিত্তিক মিশনের পরিকল্পনা করে। পরের বছর থেকে সেই মতো কার্যক্রমও শুরু করে নাসা। চার বছর পরে ইসরো এই মিশনে সামিল হয়। যদিও এটিই প্রথম নয়, এর আগে, চন্দ্রযান-১ মিশনেও পেলোড সরবরাহ করেছিল নাসা, কিন্তু একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিযান এই প্রথমবার।
এই মিশন প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থা গুলি একে অপরের প্রতিযোগী না হয়ে পরিপূরক হতে পারে। এর ফলে শুধু যে মিশনের খরচের বোঝা ভাগাভাগি হয়ে যাবে তা নয়, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত খামতি মিটবে। দরকার কেবল একটা সমন্বিত লক্ষ্য, তবেই প্রস্তুত করা সম্ভব পারস্পারিক সহযোগিতা পূর্ণ মহাকাশ অভিযানের নীলনকশা ।