স্লোভেনিয়ায় 'সোনার তরী', নতুন পাওয়া বইবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ
Slovenia Tour: এমন একটা দেশে, প্রায় সম্পূর্ণ একটা অজানা সংস্কৃতির শহরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আশ্চর্য মোলাকাত হবে এ কথা ভাবিনি ঘুণাক্ষরেও।
যখন এমএ ক্লাসে পড়ি, সে সময় একটা নিতান্ত পপুলার উপন্যাস পড়ে খুব ভাল লেগেছিল। 'ভেরোনিকা ডিসাইডস্ টু ডাই'। পাওলো কোয়েলোর লেখা। যে শহরকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, পড়তে পড়তে সেই শহরটাকে, লেখার গুণেই হবে, খুবই ভাল লেগে গিয়েছিল। পড়া থামিয়ে ভেবেছিলাম, আচ্ছা আমার কি কখনও এই লুবলিয়ানা শহর স্বচক্ষে দেখা হবে! আজকালকার স্মার্ট ভাষায় যাকে বলে ‘বাকেট লিস্ট’ সেই ফর্দের বালতিতে কেমন করে যেন ঢুকে পড়েছিল এই লুবলিয়ানা। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যে সাতটি ছোট ছোট দেশ তৈরি হয়েছিল তাদের মধ্যে একটি, স্লোভেনিয়ার, রাজধানী। অনেক পরে, সাহিত্যের ক্লাসরুমে যখন সাহিত্য পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসেছে, আর প্রথম সারি দখল করে নিয়েছে তত্ত্ব, তখন জেনেছি স্লাভয় জিজেকের নাম। তিনিও এই লুবলিয়ানার মানুষ। সব মিলিয়ে লুবলিয়ানা শহরটা দেখার একটা ইচ্ছা মনের মধ্যে ছিলই।
ভিয়েনা থেকে ঘণ্টা আড়াই বাসে করে পৌঁছে যাওয়া যায় লুবলিয়ানা। ফ্লিক্সবুস (Flixbus) এর সস্তার টিকিট, সবুজ রঙের বাসগুলোও বেশ আরামের, জানালার বাইরে চমৎকার নিসর্গ দৃশ্য দেখতে দেখতে টুক করে পৌঁছে যাওয়া যায়। স্লোভেনিয়া ঢোকার মুখে একটা ছবির মত গ্রামের ধারে মিনিট পাঁচেক দাঁড়াল বাস ।

লুবলিয়ানা যাওয়ার পথে...
মখমলের মত মাঠের ধারে একটা ছোট কালো রঙের পুলিশের গাড়ি। দুজন পুলিশ অফিসার, একজন পুরুষ, একজন মহিলা। নিমেষের মধ্যে আমাদের কাগজপত্র দেখে আবার বাস রওনা করিয়ে দিলেন। এইসব অনেকদিন পর দেখলাম। বহুদিন সেনজেন (Schengen) এলাকায় একবার ঢুকে পড়লে আর কাগজপত্র দেখানোর দরকার হত না। হালে আবার সেসব চালু হয়েছে। দুনিয়াজোড়া যুদ্ধবিগ্রহ, অবৈধ অভিবাসন, নিরাপত্তা ইত্যাদি কারণেই বুঝি। তবে সাদা চোখে এসব কিছু ধরার উপায় নেই। এত নিস্তরঙ্গভাবে সব হচ্ছে, মনে হয় এমনই তো হওয়ার কথা।
লুবলিয়ানায় যার বাসা ভাড়া নিয়েছি সেই জারনেজ আমাদের আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, “বাস স্টেশনে নেমে আমার বাড়ি আসার জন্য ট্যাক্সি নিতে হবে। ওরা বলবে ওদের গাড়ির মিটার কাজ করে না। তারপর যে দাম হাঁকবে তোমরা ঠিক তার অর্ধেক বলবে!” পৃথিবী জোড়া কেমন একটা কলকাতা ছড়িয়ে রয়েছে তাই না? সে যাহোক, জারনেজের কথা যে এমন অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে ভাবিনি। গুগল ম্যাপে আগেই দেখে নিয়েছি জারনেজের বাসা বাস স্টেশন থেকে কিলোমিটার দুয়েক। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে চালকদের জটলা। আমাদের পিঠে ব্যাগ, পেছনে গরগরিয়ে আসছে সুটকেস, দেখে ভুল হওয়ার জো নেই যে আমরা ট্যুরিস্ট। “কুড়ি ইউরো”, ঠিকানা শুনে নিদান দিলেন দলের পাণ্ডা। আমাকে কোন সুযোগ না দিয়েই পাখিপড়ার মত নন্দিনী পাশ থেকে বলল, “টেন।” ওরা দোনোমনো করছে দেখে ঘুরে হাঁটা লাগাল। আমি তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছি দেখে আরেকজন হাত দেখিয়ে বলল, “ওয়েট।” তারপর রাস্তার থেকে একটা চলন্ত ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে আমাদের প্রায় ঠেলেঠুলে উঠিয়ে দিল। রফা হল কিন্তু সেই দশেই।
আরও পড়ুন-
ভিয়েনার ক্যাফেতে: গুলাশ, রাই ব্রেড আর দুই পলিটিক্যাল রিফিউজির কিসসা
ছবির মত চমৎকার একটা শহর লুবলিয়ানা । শহরের মাঝ বরাবর কুলকুল করে আপন ছন্দে বয়ে চলেছে লুবলানিৎসা নদী শহরটাকে দুভাগে ভাগ করে। দু-এক কিলোমিটার অন্তর একটা করে ছোট সাঁকো, এপার ওপার করার জন্য। রাস্তার দুধারে ছোটছোট ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, আর নানাবিধ পসরা। মে মাসের শেষের দিক, কিন্তু ভিয়েনার তুলনায় ঠাণ্ডা প্রায় নেই বললেই চলে। রোদ্দুর গায়ে এসে লাগলে আরাম লাগে, কিন্তু দিনের বেলায় গরম জামা গায়ে রাখলে গরম লাগে। আমাদের বাসা থেকে ছায়াঘেরা নদীর ধার দিয়ে খানিকটা হেঁটে এলেই মোটামুটি শহরের মাঝখানে চলে আসা যায়। এখানকার লোকেরা হাসিখুশি, কিন্তু খানিক ভাবুক প্রকৃতির। যুগোস্লাভিয়া ভাবলে আমাদের মনে যে যুদ্ধ আর অশান্তির ছবি ভেসে ওঠে তার ছিটেফোঁটাও এঁদের দেখে বোঝার উপায় নেই। যেন একটা শান্ত খেলনা শহরে কিছু নির্বিবাদী মানুষের বাস। এ ব্যাপারটা খোলসা হল কদিন বাদে। সে কথা পরের কিস্তিতে লিখব।

লুবলিয়ানা
একটা খেয়াল করার মত ব্যাপার দেখলাম এই শহরে। এত ছোট শহর, অথচ, খানিক এদিক ওদিক গেলেই একটা করে বইয়ের দোকান। যেমন বড় বইয়ের দোকান রয়েছে, যেখানে দেশের ভাষার সঙ্গে ইংরেজি ভাষার বইও থাকে, তেমনই ছোট গলির মধ্যে রয়েছে পুরনো বইয়ের দোকান।

পুরনো বইয়ের দোকান
আর নদীর পাশে বেঞ্চিতে বসে অথবা কোন ক্যাফেতে বয়স নির্বিশেষে অনেক মানুষকে বই পড়তে দেখলাম। শহরের যে প্রধান টাউন স্কোয়ার তাও এঁদের জাতীয় কবি ফ্রান্স প্রেসেরেন-এর নামে।

প্রেসেরেন স্কোয়ার
কেমন মনে হয় রাজনীতি অথবা রাষ্ট্রনীতির চেয়ে এঁদের কাছে সংস্কৃতির গুরুত্ব বেশি। এই ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবেই আমার শহর থেকে আলাদা। তবে কিনা, এমন একটা দেশে, প্রায় সম্পূর্ণ একটা অজানা সংস্কৃতির শহরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আশ্চর্য মোলাকাত হবে এ কথা ভাবিনি ঘুণাক্ষরেও। দুপুরে খানিক এদিক সেদিক চক্কর দেওয়ার পর প্রেসেরেনের মূর্তির নিচে বসে স্থানীয় বাস্কারদের বাজনা শুনছিলাম। হাতে গুগল ম্যাপ খোলা, চোখে পড়ল খানিক দূরেই একটা বইয়ের দোকান, অদ্ভুত তার নাম, ‘হাউজ অফ ড্রিমিং বুকস’।

হাউজ অফ ড্রিমিং বুকস
টুকটুক করে পৌঁছে গেলাম। শহরের সাইজের আন্দাজে বেশ বড় বিপণি। ইংরেজি ভাষার বইও পাওয়া যাচ্ছে। ঢুকে পড়লুম। আজ শনিবার, তায় বারবেলা, লোকজন নেই বিশেষ। যুবতী দোকানী আপনমনে বই পড়ছিলেন। আমাদের দিকে উৎসুক দৃষ্টি দিতে আমরাও এগিয়ে গেলাম। নাম জিজ্ঞেস করতে জানলাম, মান্সা (মেরীর নামের রূপ)। তা, মান্সার সঙ্গে খানিকক্ষণের মধ্যেই বেশ গল্প জমে গেল। আমরা কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি এইসব বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার দেশের কোন লেখকের বই পড়ব, বল।” বলল, “এখন খুব ভাল লিখছেন গোরান ভয়নোভিচ (ছবি ৪.৬)। পড়ে দেখতে পার।”

'দ্য ফিগ ট্রি'-এর প্রচ্ছদ
দেখলাম তাঁর ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে। 'দ্য ফিগ ট্রি' বলে একটা বই তুলে নিলাম। চলার পথে পড়া যাবে। “তোমরা কবিতা পড়?” দুজনেই মাথা নাড়লাম। মান্সা বলল, “তাহলে প্রেসেরেন ছাড়াও আর একজন ‘আধুনিক’ কবির কথা বলতে পারি, স্রেচকো কসোভেল। দেখ, ভাল লাগতেও পারে।”

স্রেচকো কসোভেল
ওঁর বেশ কিছু অনুবাদ রয়েছে দেখলাম। তার একখানা হাতে নিতেই যাকে বলে বেবাক বনে গেলাম। এই দুনিয়ায় যে কত রঙ্গ! যে পাতায় খুলেছি, সে পাতায় জ্বলজ্বল করছে কয়েকটা পংক্তি। ঠিক দেখছি না মনে হল। লেখা আছে,
In green India among quiet
trees that bend over blue water
lives Tagore.Time there is spellbound, a cerulean circle,
the clock tells neither month nor year
but ripples in silence
as if from invisible springs
over ridges of temples and hills of trees.
একটা সমুদ্রের মত আনন্দের ধারা বইছে সারা শরীরে। স্রেচকো কসোভেলের নাম আমি আগে শুনিনি। লুবলিয়ানা শহরে আসা একেবারেই ঘটনাচক্রে। কী আশ্চর্য এই সমাপতন! দুটো চেয়ার টেনে আমরা দুজনে বসে পড়লাম। এক পাশে মান্সাও। সেও আমাদের বিহ্বলতায় খুশি হয়েছে বুঝতে পারি। সে তো কোনদিন ভারতবর্ষে যায়নি। অত দূর দেশের দুই পাঠককে ও যে ওর দেশের এক কবির বিষয়ে এত উৎসাহিত করতে পেরেছে তার আনন্দ ওর
আরও পড়ুন-
ভিয়েনার বৃষ্টিদিন: ক্যাফে কামু আর সাশার নিজের দেশ
চোখেমুখে। দু-তিনটে বই উলটেপালটে দেখলাম আধুনিক কবি কসোভেল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে খুবই উদ্বেলিত ছিলেন। সে যখন তরুণ তখন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজোড়া খ্যাতি। যুগোস্লাভিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছে রবীন্দ্রনাথের বই। জাতীয়তাবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বিবিধ আপত্তি, একটা বিশ্বজনীনতার প্রতি যে তিনি প্রবলভাবে আকৃষ্ট, এই বার্তা দাগ কেটেছিল তরুণ কবির মনে। এতটাই, যে কসোভেল তাঁর নিজের কবিতার বইয়ের নাম দিলেন 'সোনার তরী'। ভাবা যায়! একবিংশ শতাব্দীর এক শনিবারের শেষ বিকেলে সুদূর লুবলিয়ানায় একটা বইয়ের দোকানে বসে এই কথা জানতে পারা যে কতখানি বিহ্বল করেছিল তা লিখে বোঝাতে পারব না।

স্রেচকো কসোভেল
কসোভেলের জার্নালের কিছু অংশ পড়ে তাঁর সম্বন্ধে খানিক ধারণা হল। এক জায়গায় লিখছেন, “Art is as powerful a force fuelling life, as is, say, politics, the economy”। আর একটা চিঠিতে লিখছেন, “All I know is that I am shattered and there’s no help for this terrible grey pain inside me. All I know is that I should be screaming to scream myself out, that I should scrape off this stifling ash pile that is choking and killing me”। মাত্র তেইশ বছর বেঁচেছিলেন কসোভেল। ওঁর একটা ছোট কবিতার সংকলন নিয়ে যখন বেরোচ্ছি, মনে হল এ কারণেই বুঝি আমাদের লুবলিয়ানা আসার কথা ছিল। কী অদ্ভুত এই বেঁচে থাকা!