আলোর রং পরিবর্তন হয়ে যাবে! পদার্থ বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা মেটালেন্স কী?
Meta-lens: ৮০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত আলোক রশ্মি (IR rays) মেটালেন্সের মাধ্যমে প্রেরণ করা হলে, ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো উদ্ভূত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়।
সম্প্রতি ইটিএইচ জুরিখের একদল পদার্থবিজ্ঞানী বিশেষ বৈশিষ্ট্যযুক্ত খুবই পাতলা একটি লেন্স তৈরি করেছেন, যেটি আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য পরিবর্তন মানে আলোর রঙ পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া। সাংঘাতিক ব্যপার। লেন্সটি আপতিত আলোক রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য অর্ধেক করে ইনফ্রারেড আলোকে দৃশ্যমান আলোতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। বিশেষ এই লেন্সের পারিভাষিক নাম মেটা লেন্স।এটি সাধারণ লেন্সের মতো বাঁকা নয়, সমতল। কিন্তু খুবই শক্তিশালী। কীভাবে এটি বানালেন পদার্থবিজ্ঞানীরা? তার আগে আমরা দেখি এই মেটা লেন্স আসলে কী?
কৃত্রিম অ্যান্টেনার সমন্বয়ে তৈরি এটি একটি উন্নত মানের অপটিক্যাল ডিভাইস, যা আলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে মেটা পরমাণু সম্বলিত ন্যানোকাঠামো। এই মেটা পরমাণুগুলি একটি পৃষ্ঠে সুনির্দিষ্টভাবে সাজানো থাকে, ফলে আপতিত আলোর বিস্তার, দশা, সমাবর্তনের পর্যায় ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টগুলিকে প্রয়োজন মতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কী দিয়ে তৈরি এই মেটা লেন্স?
লেন্সের প্রসঙ্গ এলেই আমাদের মাথায় ভাসে কাচের কথা, কারণ চশমা, আতস কাচ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ক্যামেরা, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, দূরবীক্ষণ যন্ত্র, সবেতেই লেন্স, আর সবেতেই কাচ। কিন্তু এই মেটালেন্স কাঁচ দিয়ে তৈরি নয়। এটি তৈরি হয় অর্ধপরিবাহী দিয়ে। মূলত সিলিকন ব্যবহার করা হয় মেটালেন্স তৈরিতে।
চিত্র ১- সাধারণ লেন্স ও মেটা লেন্সের তুলনামূলক ছবি
প্রথমে একটি ১০০ এনএম (100 nm) বেধ ও ১ এনএম (1nm) উচ্চতা বিশিষ্ট ন্যানো কণা দিয়ে তৈরি করা হয় একাধিক অতি সূক্ষ্ম ও ছোট্ট ছোট্ট লেন্স। এরপর সেগুলি একটার পর একটা জোড়া দিয়ে বানানো হয় লেন্সের সমবায় বা মেটা সারফেস, যেটি মেটালেন্সের মতো কাজ করে। লেন্সের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটার সাথে একটা জুড়ে যেমন লেন্স সমবায় তৈরি করা হয়, তেমন আরকি। প্রথাগত পুরু উত্তল বা অবতল লেন্সের তুলনায় সমতল এই মেটালেন্স বহু গুণ পাতলা (আমাদের একটা চুলের থেকে ৪০ গুণ হালকা), ওজনেও অনেক কম, কিন্তু এদের বিবর্ধন ক্ষমতা অনেক বেশি।
আরও পড়ুন-
ভারতের ব্রহ্মাস্ত্র সুদর্শন চক্র! পাক হামলা রোধে কীভাবে কাজ করে এই S-400?
জুরিখের গবেষক দলটি পরীক্ষাগারে পর্যবেক্ষণ করেন- ন্যানো কাঠামো গঠনের সময় যদি এক বিশেষ ধরণের ধাতব অক্সাইড, লিথিয়াম নায়োবেট (LiNbO3) ব্যবহার করা হয়, তবে আলোক তরঙ্গ ঐ ন্যানো কাঠামোর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বদলে অর্ধেক হয়ে যায়। যদি ৮০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত আলোক রশ্মি (IR rays) মেটালেন্সের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়, তখন অন্য দিকে ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো উদ্ভূত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়। আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরের আলো ব্যবহার করে দৃশ্যমান আলোতে পরিবর্তন করতে পারা আলোক বিদ্যা চর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। অ-সরল রৈখিক আলোক বিদ্যার এই নীতি মেনে সবুজ লেজার পেন কাজ করে।
লিথিয়াম, নায়োবিয়াম আর অক্সিজেন-এর মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করা হয় এই বিশেষ রাসায়নিক যৌগ লিথিয়াম নায়োবেট (LiNbO3)। যা লিনোবেট(Linobate) নামেও পরিচিত। এই যৌগ অত্যন্ত স্থায়ী ও মারাত্মক কঠিন। এর গলনাঙ্ক ১২৫৩ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড। তাই যৌগের সাহায্যে সূক্ষ্ম ন্যানোকণা তৈরি করা বেশ শ্রমসাধ্য ও ব্যয়বহুল। আজকালকার মোবাইল ফোন, পিজোইলেকট্রিক সেন্সর, অপটিক্যাল মডুলেটর-সহ নানান রৈখিক ও অ-সরল রৈখিক (linear ও non-linear) আলোকীয় যন্ত্র নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে লিথিয়াম নায়োবেটের এই কেলাস। এককথায় এটি ব্যবহার করে এমন সব যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়, যেগুলি অপটিক্যাল ফাইবার ও ইলেকট্রনিক্সকে যন্ত্রপাতির ইন্টারফেস হিসেবে কাজ করে।
আরও পড়ুন-
লাল, হলুদ এবং সবুজ রংই থাকে সিগনাল পোস্টে, বিজ্ঞান নাকি মিথ, আসলে কী কারণ এর?
"ইনস্টিটিউট ফর কোয়ান্টাম ইলেকট্রনিকস"-এর অধ্যাপিকা রেচেল গ্রেঞ্জে-র নেতৃত্বে একদল গবেষক ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির সাহায্যে এই লিথিয়াম নায়োবেটের ন্যানো কেলাস তৈরির একটি সুন্দর উপায় বার করেছেন। প্রথমে এক বিশেয ধরণের ছাঁচ তৈরি করে উচ্চচাপে তার ভেতরে লিথিয়াম নায়োবেট যৌগের উপাদানগুলোর দ্রবণ ঢালা হয়। এবার দ্রবণ-সহ ছাঁচটিকে ৬০০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ফলে ছাঁচের মধ্যে তৈরি হয় লিথিয়াম নায়োবেটের অতি সূক্ষ্ম ন্যানোকণা। এই ন্যানোকণাগুলি ব্যবহার করে উচ্চমানের মেটালেন্স তৈরি করেছেন রেচেল গ্রেঞ্জের দল। লিথিয়াম নায়োবেটের সূক্ষ্ম ন্যানোকণা তৈরির জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি এই ছাঁচ যতবার ইচ্ছে ব্যবহার করা যায়। ফলত বোঝাই যাচ্ছে, তাদের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি অনেক সাশ্রয়ী। সম্প্রতি অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস (Advanced Materials) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের এই কাজ।

চিত্র ২-মেটা লেন্সে ব্যবহৃত বিভিন্ন ন্যানোস্ট্রাকচারের মাইক্রোস্কোপিক চিত্র। (সূত্র:Adv. Mater. 2025, 2418957)
যে কোনো উন্নত মানের ক্যামেরা বা স্মার্ট ফোনে দরকার হয় এই লেন্সের। ছবি স্বচ্ছ হওয়ার জন্য পুরু ও ভারী লেন্স ব্যবহার করা হয়। তার জন্য দরকার পড়ে অনেক জায়গা। যন্ত্রটিরও ওজন ভারী হয়। এই প্রক্রিয়া সহজ করে মেটালেন্স। এটি কেবল উন্নত মানের জুমিং লেন্স তৈরিতে ব্যবহৃত হবে তা নয়, এটি ‘কোশ্চেন ডকুমেন্ট এক্সামিনেশন’ নামক ফরেন্সিক সায়েন্সের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শাখায়ও খুবই কার্যকরী। ভবিষ্যতে এই লেন্সকে জাল নোট, জাল শিল্পকর্ম ও অন্যান্য জাল নথি শনাক্তকরণের কাজেও ব্যবহার করা যাবে।পদার্থবিদ্যা, ন্যানো প্রযুক্তি ও রসায়নের সম্মিলিত এই প্রয়াস অচিরেই উচ্চমানের মাইক্রোস্কোপিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে বিপ্লব আনতে পারবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।