সৈনিকদের তরোয়ালে গেঁথে প্রথম তৈরি হয়েছিল ভারতীয়দের প্রিয় কাবাব?
kababs in India : বাংলায় কাবাবের প্রচলন কিছুটা দেরিতে হলেও, বাংলায় কাবাব আসার সঙ্গে-সঙ্গেই খাদ্যরসিকদের মন জিতে নিয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলার বাবু ও জমিদারদের মধ্যে মুঘলাই খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকে...
‘কাবাব’ নামটি শুনলেই জিভে জল আসে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সারা ভারতে, নানা ধরনের কাবাব পাওয়া যায়। বিকেল কিংবা সন্ধে, বর্ষা কিংবা শীত, কাবাবের জুরি মেলা ভার। জানতে ইচ্ছে করে, এই কাবাবের জন্ম কি ভারতেই? নাকি কাবাবের জন্মসূত্র লুকিয়ে রয়েছে অন্য দেশে? জানা যায়, মধ্যযুগে পারস্য সৈন্যরা যুদ্ধ-বিশ্রামে খোলা মাঠের ভেতর তাদের তলোয়ারে মাংস গেঁথে, তারপর তাকে আগুনে ঝলসে কাবাবের আবিষ্কার করে। অর্থাৎ, আজকে যাকে আমরা কাবাবকে গ্রিল করা বলি, তারা সে-যুগে সেটাই প্রথম করেছিলেন।
আরও পড়ুন
বিসমিল্লাহ বলে শুরু রান্না! বিরিয়ানিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন নবাবের এই বংশধর
কাবাবের জন্ম
কাবাবের জন্মস্থান প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যে। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে পারস্য এবং তুরস্কেই প্রথম কাবাব খাওয়া শুরু হয়। শিকের মধ্যে মাংস গেঁথে, তাকে আগুনে ঝলসে নিয়ে খেতে শুরু করেছিল এসব অঞ্চলের যাযাবর ও সৈনিকেরা। ‘কাবাব’ শব্দটি এসেছে তুর্কি শব্দ ‘কেবাপ’ থেকে। ‘কেবাপ’-এর অর্থ হল 'পোড়ানো মাংস' বা 'ভাজা মাংস'।

শিক কাবাব
ভারতে কাবাবের অনুপ্রবেশ
ভারতে প্রথম কাবাব কীভাবে এল? এদেশে কাবাবের আগমন প্রধানত আফগান ও তুর্কি সৈনিক এবং বণিকদের মাধ্যমে। একাদশ শতকে লেখা সংস্কৃত গ্রন্থ 'মানসোল্লাসা'-তে শিকে গেঁথে মাংস পোড়ানোর পদ্ধতির কথা উল্লেখ থাকলেও, বর্তমানে আমরা যে কাবাব দেখতে পাই, তার আগমন কিন্তু আফগান ও তুর্কিদের হাত ধরেই। তুর্কিরা একে 'শিশ কাবাব' বলত। 'শিশ' অর্থ তলোয়ার বা শলা, এবং কাবাব অর্থ 'পোড়ানো'।
মুঘল আমল ও কাবাবের বিবর্তন
দিল্লি সুলতানি (১২০৬-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ) ও বিশেষ করে মুঘল সাম্রাজ্যের (১৫২৬-১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) সময় কাবাব ভারতে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইবনে বতুতা, বিখ্যাত মরোক্কোর পরিব্রাজক, তাঁর লেখায় বলেছেন যে, চতুর্দশ শতকে তুঘলুক দরবারেও কাবাবের বেশ কদর ছিল। এমনকি সাধারণ মানুষও তখন সকালে নান দিয়ে কাবাব খেত। মুঘল রন্ধনশৈলী, যা পারস্য, তুর্কি, মধ্য এশীয় এবং ভারতীয় খাবারের একটি মিশ্রণ, তা কাবাবকে এক নতুন মাত্রা দেয়। মুঘল রাঁধুনিরা কাবাবকে আরও সুস্বাদু ও নরম করে তুলতে নতুন-নতুন মশলা, শুকনো ফল, বাদাম, ক্রিমের ব্যবহার শুরু করে এবং পুরো রান্নাটাই হয় দম পুখত বা ধীর গতিতে।

গালৌটি কাবাব
ভারতীয় কাবাবের বিশেষত্ব
পারস্য ও তুরস্ক থেকে কাবাব এলেও, ভারতে আসার পর তার স্বাদের বহু পরিবর্তন হয়েছে। এর জন্য ভারতীয় রন্ধনশিল্পীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যেমন, বিশেষভাবে বলতে হয় লখনউ-র বিখ্যাত গালৌটি কাবাবের কথা। গালৌটি কাবাবের জন্ম নিয়ে বেশ মজার গল্পও রয়েছে। বলা হয়, নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের দাঁতের সমস্যার কারণে খাবার চিবিয়ে খেতে সমস্যা হচ্ছিল। তাঁর জন্য কাঁচা পেঁপের সঙ্গে খাসির মাংস বেটে, তাতে প্রায় ১০০ রকমের মশলা যোগ করে গালৌটি কাবাব তৈরি করা হয়, যা মুখে দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে মুখে গলে যাবে, চিবানোর প্রয়োজন পড়বে না। এছাড়াও রয়েছে, কাকোরি কাবাব, শিক কাবাব, শামি কাবাব, খিরি কাবাব, দম কাবাব এবং পথর কা গোশত (পাথরের উপর রান্না করা কাবাব) সহ আরও অনেক ধরনের কাবাব যা প্রধানত ভারতীয় মশলা ও এদেশের রন্ধনশিল্পীদের দ্বারাই বিকশিত হয়েছে।

রেশমি কাবাব
নিরামিষ কাবাব
কাবাবের সঙ্গে মাংসের যোগ অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু এদেশের বহু মানুষ যেহেতু নিরামিষাশী, তাই সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে ভারতে নিরামিষ কাবাবেরও উৎপত্তি হয়েছে। পনির, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, এবং বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি এই কাবাবগুলিও ভারতে বেশ জনপ্রিয়!
বাংলার কাবাব
বাংলায় কাবাবের প্রচলন কিছুটা দেরিতে হলেও, বাংলায় কাবাব আসার সঙ্গে-সঙ্গেই খাদ্যরসিকদের মন জিতে নিয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলার বাবু ও জমিদারদের মধ্যে মুঘলাই খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকে। বিশেষ করে, নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের কলকাতায় আগমনের পর মুঘলাই খাবারের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। সেই জনপ্রিয় খাবারগুলির মধ্যে কাবাব বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত। ঈশ্বর গুপ্তের লেখাতেও সেই সময়ের বাঙালিদের মটন কাবাবের প্রতি আগ্রহের কথা পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন-
কাবাবের গন্ধ নয়, ইফতারের সন্ধে নামে মুড়ি-চপ-বেগুনিতে
বড় রেস্তরাঁ থেকে রাস্তার দোকান, সর্বত্রই নানা ধরনের কাবাব বাঙালির নিত্য জীবনের অংশ এখন। শিক কাবাব, শামি কাবাব, গালৌটি কাবাব কিংবা টিক্কা কাবাব, এসবই শুধু জিভে নয় মনেও আনন্দ এনে দেয়। কাবাব এসেছিল ভিনদেশি এক খাবারের মতন। কিন্তু সময়ের এমন প্রভাব যে কাবাবকে এখন ভারতের ভূমি থেকে আলাদা ভাবতেই পারা যায় না। ভাবতে না পারার আরও একটি কারণ হয়তো, এদেশে কাবাব আসার আগে তা তৈরি করা হত প্রধানত ম্যারিনেশন ও গ্রিলিং-এর মাধ্যমে। কিন্তু মুঘল-সময়ে, ভারতীয় মশলা অনন্য স্বাদ কাবাবের সঙ্গে মিশে খাবারটিকে চিরকালের মতো এদেশীয় করে তুলেছে!