মানুষের বিভিন্ন সম্পর্কের চিহ্নকে বাঁচিয়ে রাখে জাগ্রেব শহরের এই মিউজিয়াম

Zagreb Tour : যে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, যার রেশ রয়ে গিয়েছে, যে সম্পর্ক রেখে গিয়েছে ক্ষোভ, দুঃখ, অথবা আলো, যে সম্পর্ক আর কোনদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব না তার মেটিরিয়ালিটির চিহ্নগুলো সংগ্রহ করেছে এই মিউজিয়াম।

জাগ্রেব! নামটার মধ্যেই কেমন একটা বলিষ্ঠ ম্যাসকুলিনিটির উদযাপন। বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা স্লাভিক পৌরুষের উদ্ধত বিরক্তির সূচক। আসলে তা নয় আদৌ। নামের মধ্যে তো এরকম কিছু থাকে না। থাকে আমাদের অভিজ্ঞতায়। আমার মত যারা ওই গত শতাব্দীর আট-নয়ের দশকে ভারতবর্ষের কোনো শহরে বেড়ে উঠছিলাম, আমাদের কৈশোর অথবা যৌবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল শুক্রবার রাত ন’টার সময় ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’। প্রণয় রায় আর আপ্পন মেনন সে-সময় আমাদের বুভুক্ষু মগজে ক্রমাগত ঢেলে দিচ্ছেন তমাম বিশ্ব থেকে জড়ো করে আনা খবর, আমরা পরিচিত হচ্ছি পৃথিবীর রাজনীতি আর সমাজবিপ্লবের সঙ্গে। ভারতবর্ষ তখন সত্যিই তৃতীয় বিশ্ব। টিভির পর্দায় বিশ্ব-দর্শনের অমোঘ হাতছানি ছিল আমাদের প্রতি শুক্রবারের সত্যিকারের ব্লকবাস্টার।

আরও পড়ুন-

নীল সমুদ্র ও অলিভ পেস্ট্রি, চির অবসরের শহর পিরান

অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ওয়ান আওয়ার। সেখানেই আমার প্রথম পরিচয় এই জাগ্রেব শহরের সঙ্গে। ক্রোয়েশিয়া বলে কোনো ভূখণ্ডের কথা আলাদা করে ভাবতে পারতাম কিনা মনেই পড়ে না। জানতাম শুধু গৃহযুদ্ধে ধ্বস্ত যুগোস্লাভিয়া। প্রতিদিনের যুদ্ধ, ক্ষয় আর যুগোস্লাভিয়ার তিন প্রধান জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরন্তর প্রাণঘাতী সংঘাত। আর বেশিরভাগ সময় এই সংঘাতের প্রাণকেন্দ্র জাগ্রেব বা মোস্তার বা সারায়েভো শহর।

জাগ্রেব শহর

জাগ্রেবে স্থাপত্যের কঙ্কাল

একটা শ্রীহীন গাম্ভীর্য রয়েছে জাগ্রেব শহরের। ইতিহাসের ক্ষতগুলো ঢাকবার চেষ্টা খুব একটা চোখে পড়ল না। সদ্য ভিয়েনায় দেখে এসেছি ক্ষত মনে রেখেও তা মেরামত করার প্রচেষ্টা। যে সব ঘরবাড়ি যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়েছে, তাদের মেরামতির খতিয়ান বাড়ির গায়েই দেগে দিয়েছে ভিয়েনার মিউনিসিপ্যালিটি। কবে, কীভাবে, কে ধ্বংস করল, কারা আবার কবে কোথা থেকে ফান্ড জোগাড় করে মেরামত করল এইসব। জাগ্রেবে সে-বালাই দেখলাম না। কত ঘরবাড়ি অথবা স্থাপত্যের কঙ্কাল ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে যেমন কে তেমন দাঁড়িয়ে রয়েছে। সরু রাস্তায় স্লোগান লেখা দেওয়াল, পলেস্তারা খসে গিয়েছে। 

সরু রাস্তা, স্লোগান লেখা দেওয়াল

পলেস্তারা খসা দেওয়াল

শহরের মেজাজটা বেশ মনে ধরল প্রথম দিন থেকেই, ভদ্র কিন্তু একটা তিরিক্ষি স্রোত বইছে তলে-তলে। তুমি যে এসেছ, সব দেখছ এদিক-ওদিক, এতে আপত্তি কিছু নেই। কিন্তু খেজুরে আলাপ করতে এসো না, পোষায় না। লুবলিয়ানায় অস্কার কী বলেছিল খেয়াল হল। শেষ বিকেল থেকেই বিভিন্ন ক্যাফেতে এদের আড্ডা জমে দেখলাম। কম বয়সি রয়েছে, তবে বেশিরভাগ ওই পঞ্চাশের উপর বয়স। পুরনো বাড়ির দেওয়ালে গজিয়ে ওঠা সস্তা ক্যাফের টেবিলে-টেবিলে জটলা, গুজগুজ করে কথা, হাসিঠাট্টা, আর টুরিস্টদের প্রতি একটা হালকা কৌতূহল মেশানো অবজ্ঞা।

পুরনো বাড়ির দেওয়ালে সস্তা ক্যাফে

কেউ আবার একা, আপনমনে বসে রয়েছেন, ক্যাফেতে কাজ করা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলাপ দেখে মালুম হয় প্রতিদিনের খদ্দের, কফি আর ধূমপানে মগ্ন। অতএব, এখানে যে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে খুব আড্ডা হল, তা বলতে পারি না। নিজেরাই ক্যাফেতে বসে দেখলাম এদের চলাচল, আর আপন মনে গল্প বুনে নিলাম নিজের মত।

জাগ্রেবের ক্যাফেতে স্থানীয় মানুষজন

ক্যাফেতে আরেকজন স্থানীয় মানুষ

এই সুযোগে একটা মজার গল্প বলি। আমি এইসব লেখা দুপুরের দিকে কোনো একটা ক্যাফেতে বসে লিখে ফেলি। সামনে চলমান অচেনা শহরটা দেখতে-দেখতে লিখেতে মন্দ লাগে না। তা জাগ্রেবে এইরকম একটা ক্যাফেতে বসে লিখছি। আমাদের বাসা থেকে খুব কাছে। ক্ষিদে পেয়েছে, একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করেছি। কামড় দিয়ে দেখলাম বেশ ভালো। মেনুতে দেখলাম নানাবিধ আরও সব খাবারদাবার পাওয়া যায়। দামও যথেষ্ট সাধ্যের মধ্যে। মনে ভাবলাম কোনোদিন এখানে রাতের বেলায় এসে ডিনার খাওয়া যাবে। ওয়েটার ছেলেটি সপ্রতিভ, মিটি মিটি হাসে সবসময়। ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “কটা অব্দি খোলা থাকে ভাই?” হেসে জবাব দিল, “রোজ সকাল আটটা থেকে রাত বারোটা।” তারপর দুদিন কেটে গিয়েছে। সেদিন রাতে ফেরার সময় ওখানেই ডিনার করব মনস্থ করেছি। ন’টা নাগাদ পৌঁছে দেখি ক্যাফেটার কোনো অস্তিত্বই নেই। মানে, টেবিল, চেয়ার, বাইরের বসার জায়গা, উপরের চাঁদোয়া, বেমালুম ভ্যানিস! প্রথমে ভাবলাম রাস্তা গুলিয়েছি। না। বাকি সব যেমন ছিল তেমনই আছে, শুধু ক্যাফেটা নেই। এমন হয়! হতে পারে! যে বাড়িতে ক্যাফেটা সেই বাড়ির একতলায় ঢুকলাম। একটি যুবতী মেয়ে একটা টেবিলে বসে কীসব হিসেব করছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা এখানে একটা ক্যাফে ছিল না?” বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে মেয়েটি জবাব দিল, “হ্যাঁ, কাল অব্দি ছিল। আজ থেকে উঠে গেল। একটা সুপারমার্কেট হবে এখানে।” ক্রোয়াট ছোঁড়ার ইয়ার্কিতে কেমন জব্দ হয়েছি ভেবে খুব একচোট হেসে নিলাম রাস্তায় বেরিয়ে! জিতে রহো জাগ্রেব!

আরও পড়ুন-

ভিয়েনার বৃষ্টিদিন: ক্যাফে কামু আর সাশার নিজের দেশ

বাকি সব বাদ দিয়ে যে দুটো মিউজিয়াম জাগ্রেব শহরে আমাদের মন কেড়ে নিল, সেগুলোর কথা বলব, পরপর দুটো কিস্তিতে। দুটোই ব্যতিক্রমী, ওই জাগ্রেবের মেজাজটা ধরে রেখেছে বলা যায়। প্রথমটার নাম, ‘দ্য মিউজিয়াম অফ ব্রোকেন রিলেশনশিপ্‌স’। এমন অভিনব মিউজিয়াম বিশ্বের আর কোথাও রয়েছে কিনা জানা নেই। মানুষের সঙ্গে মানুষের, অথবা মানুষের সঙ্গে না-মানুষের (আমরা যাকে আজকের ভাষায় পোস্টহিউম্যান বলতে পারি) সম্পর্কের এক আশ্চর্য দলিল এই জাদুঘর। যে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, যার রেশ রয়ে গিয়েছে, যে সম্পর্ক রেখে গিয়েছে ক্ষোভ, দুঃখ, অথবা আলো, যে সম্পর্ক আর কোনদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব না তার মেটিরিয়ালিটির চিহ্নগুলো সংগ্রহ করেছে এই মিউজিয়াম। সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এক মহিলা পাঠিয়েছেন একটা আদার টুকরো। অনেক বছর আগের কথা। তার ভাই, নেহাত তরুণ, সদ্য রান্না শিখছে। মা-বাবা-দিদিকে রান্না করে খাওয়াবে, তাই বাজারে গিয়েছে। আরও নানা জিনিসের সঙ্গে কিনে এনেছে একটা আদার টুকরো। আদা কীভাবে রান্নায় ব্যবহার হয় তার জানা নেই। দিদিকে জিজ্ঞেস করে। দিদি বলে দেয়, আর ভাই একটা চমৎকার স্যালাড বানিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। পরদিন ট্রেন ধরে দূরে পড়তে চলে যাবে ভাই, তাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে নিয়ে যাচ্ছে দিদি, গাড়ি চালিয়ে। পথে নিয়ন্ত্রণ হারায় গাড়ি, ধাক্কা মারে গাছে, তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় ভাইয়ের। একটা পরিবারের একটা অধ্যায় শেষ হয় যেন, মুহূর্তে যেন জীবনটাই থেমে গিয়েছে মনে হয়। ঘটনার সপ্তাহ দুয়েক পরে ফ্রিজ খুলে সেই আদার টুকরো আবিষ্কার করে দিদি। শুকিয়ে গিয়েছে। এই আদার টুকরো দিয়ে শেষ রান্না করেছিল তার ভাই। রেখে দিয়েছিল দিদি, নিজেকে ক্ষমা করতে না পারার চিহ্ন স্বরূপ। এই মিউজিয়ামের কথা জানতে পেরে এইখানে পাঠিয়ে দিয়েছে সে আদার টুকরোটা, আর সঙ্গে নিজের জীবনের এই মর্মন্তুদ কাহিনি। এও যেন একরকমের ক্যাথারসিস।

নেকলেসের ছবি

সদ্য, ২০২৪ সালে, একজন পাঠিয়েছেন একটা নেকলেস। অসমাপ্ত সমকামি প্রেমের নজির, আর সঙ্গের নোটে লেখা, “Queer Arab love stories are rare, as much as queer Arab heartbreak stories since we are not allowed to love at the first place”। একজন আমেরিকা নিবাসী প্যালেস্তিনিয়, আর একজন ইউরোপ নিবাসী উত্তর আফ্রিকার মানুষ। কোনো ভবিষ্যৎ নেই জেনেই যেন ভালোবেসেছিলেন একে-অপরকে। দুজনে-দুজনকে দিয়েছিলেন একটা করে নেকলেস, ভালোবাসার বন্ধনের চিহ্ন, বেদনার স্মারকের মতো। উত্তর আফ্রিকার পুরুষটি তাঁর নেকলেস পাঠিয়ে দিয়েছেন এই জাদুঘরে। সঙ্গে লম্বা নোট, লেখা আছে, “We loved each other… despite and during a live streamed genocide your people are facing…too Arab for the West, too queer for the East”। ভালোবাসার এই তীব্রতা, এই অপারগতা দর্শককে বিদ্ধ করে। নেকলেস আর তার পাশে রাখা এই চিঠি ভাবিয়ে তোলে বিশ্বের নিরিখে, বিশ্ব রাজনীতি অথবা সমাজনীতির নিরিখে ব্যক্তি মানুষের ভালোবাসার এই বিদারক পরিণতি। চিঠির শেষ কথাগুলো গভীর দাগ টেনে দেয় চিন্তার অন্দরে, “May we meet in free Palestine where our love can be holy”।

কসোভো থেকে একটা রেশমের আলখাল্লা পাঠিয়েছেন একজন। এও রাজনীতির রং-লাগা ভালোবাসার গল্প। যে বলকান যুদ্ধের কথা লেখার শুরুতে বলেছি সেই সময়ের কথা। এক প্রদেশের মেয়ের সঙ্গে আরেক প্রদেশের ছেলের ভালোবাসা। হয়তো প্রিস্টিনা শহরের মেয়ে, মোস্তার শহরের ছেলেকে ভালোবেসেছে। সে-কথা অবশ্য বলা নেই। শুধু বলা আছে এই ভালবাসা নিষিদ্ধ। তখন দুজনেই নিউ ইয়র্ক শহরে, যে কোনো কারণেই হোক। একদিন ছেলেটি এই আলখাল্লা নিয়ে আসে মেয়েটির জন্য। বিদায় উপহার। কিছু বলে না ছেলেটি। নিজের হাতে রান্না করে প্রেমিকার জন্য: “After the dinner he’d prepared, he wrapped the robe around me and hugged me for a long time. At that moment, I knew it was over.”

একটা বিষণ্ণতার চাদরে নিজেদের মুড়ে নিয়ে বেরলাম মিউজিয়াম থেকে। মনটা জাগ্রেব শহরের মতই গম্ভীর হয়ে রয়েছে। পাশে সেন্ট মার্ক গির্জা (ছবি ৮) থেকে তখন মন্দ্র ধ্বনিতে ঘণ্টা বাজছে। জাগ্রেব ধরা দিচ্ছে আমাদের কাছে প্রিয় শহর হয়ে, একাত্ম হয়ে যাচ্ছি তার সমাহিত মননের সঙ্গে।

সেন্ট মার্ক গির্জা

More Articles