সংশোধনাগার নাকি হোটেল! বাস্তয় বন্দিশালায় কী কী সুবিধা পান আসামিরা?

Bastoy Prison : পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দরতম সংশোধনাগার সম্পর্কে বলতে গেলে অবশ্যই প্রথম যে-নামটি উল্লেখ করতে হয়, সেটি হলো 'বাস্তয় সংশোধনাগার।' এটি নরওয়ের একটি সংশোধনাগার, যা বাস্তয় দ্বীপে অবস্থিত।

'সংশোধনাগার' বলতে আমরা কী বুঝি? সামাজিকভাবে চিহ্নিত অপরাধীদের যেখানে বন্দি করে রাখা হয়। সংশোধনাগার এক বিচিত্র জায়গা। স্থানভেদে সারা পৃথিবীতে এর অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। কোনো দেশের সংশোধনাগারে হয়তো রয়েছে বিলাসবহুল পরিকাঠামো, সেখানে পৃথিবীর কোনো-কোনো সংশোধনাগার নরকের মতো পৈশাচিক! খাদ্য, পোশাক ও বন্দিঘর কোথাও অভিজাত হোটেলকে টেক্কা দেয়, আবার তার পাশেই কোথাও-কোথাও এমন সংশোধনাগারেরও হদিশ মেলে যার তুলনা বিশ্বের নিকৃষ্ট চিড়িয়াখানাকেও অনায়াসেই লজ্জায় ফেলতে পারে। 

বাস্তয় সংশোধনাগার

পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দরতম সংশোধনাগার সম্পর্কে বলতে গেলে অবশ্যই প্রথম যে-নামটি উল্লেখ করতে হয়, সেটি হলো 'বাস্তয় সংশোধনাগার'। এটি নরওয়ের একটি সংশোধনাগার, যা বাস্তয় দ্বীপে অবস্থিত। দ্বীপটি নির্জন হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। শুনলে অবাক হতে হয়, এই কারাগারের কোথাও কোনো দেওয়াল বা প্রাচীর নেই। এমনকী এখানকার বন্দিরা, পালানোর চেষ্টা পর্যন্ত করে না। বন্দিদের ওপর কঠিন নজরদারি নেই। এখানে অনায়াসে দিন কাটান শতাধিক বন্দি। 

আরও পড়ুন-

নীতিপুলিশের উলটোদিকে ভালবাসাই পুঁজি! রমরমিয়ে চলছে লভ হোটেল

পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক সুযোগ প্রাপ্ত এই কারাগারে প্রতিটি বন্দির জন্য নির্ধারিত রয়েছে পৃথক-পৃথক কক্ষ। অবশ্য, 'কক্ষ' না বলে আবাসস্থল বলাই ভালো। কী নেই সেই সব আবাসস্থলে! এ প্রায় যেন বিলাসবহুল হোটেলের কোনো ঘর। শয়নকক্ষ থেকে শুরু করে ড্রইংরুম, রান্নাঘর, শৌচালয়, টিভি, গিজার, এসি, ফ্রিজ, সোফাসেট, রিডিং টেবিল, আলমারি, সংবাদপত্র, পড়াশোনার জন্য কম্পিউটার, বই রাখার র‌্যাক প্রভৃতি সবকিছুরই ব্যবস্থা থাকে এখানকার প্রতিটি আবাসে। বন্দিরা এই কারাগারে একত্রে থাকলেও বসবাস করেন নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করা আবাসগুলিতেই। যেখানে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বর্তমান। যদিও তাদের জন্য সার্বজনীন রান্না ও খাওয়ার পরিষেবাও দেওয়া হয় কারাগার কর্তৃপক্ষের তরফে। আর যদি কোনো বন্দি নিজের জন্য নিজেই রান্না করে, তাহলে পৃথকভাবে সে ভাতা পেয়ে থাকে। বাস্তয় কারাগারে বন্দিদের জন্য আয়-সংস্থানেরও বন্দোবস্ত রয়েছে। সবজি ও খাদ্যশস্য উৎপাদন, সাইকেল মেরামতি, ঘোড়াশালের দেখাশোনা, কারাগার পরিচ্ছন্ন করার মতো কাজে যুক্ত হতে হয় এখানকার বন্দিদের। পরিবর্তে তারা পেয়ে থাকে তাদের শ্রম অনুযায়ী উপার্জিত অর্থ। এছাড়া জীবনের উন্নতি সাধনের জন্য বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হয় এখানকার বন্দিদের।

বাস্তয়-এর ভেতরে

এই সংশোধনাগারে বর্তমানে ১১৫ জন বিচারাধীন আসামি রয়েছে। আর কারাকর্মী আছেন ৬৯ জন। শুনতে অবাক লাগে রাতের বেলায় এখানে কর্মরত অবস্থায় থাকেন মাত্র পাঁচ জন কারা-কর্মচারী। অবসর সময়ে আসামিরা এখানে মাছ ধরতে পারে, বই পড়তে পারে, ঘোড়ায় চড়তে পারে, গির্জায় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে যেতে পারে, টেনিস খেলতে পারে, এমনকী চুটিয়ে প্রেম ও স্বেচ্ছার যৌনমিলনেও লিপ্ত হতে পারে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানে কর্মরত কারাকর্মীরা বেশিরভাগই সমাজসেবী হিসেবে সমাজে পরিচিত।

আরও পড়ুন-

ভিয়েনার ক্যাফেতে: গুলাশ, রাই ব্রেড আর দুই পলিটিক্যাল রিফিউজির কিসসা

আরও অবাক হওয়ার মতো ফিরিস্তি এখানে মজুত রয়েছে। এই জেলটির আয়তন এক বর্গমাইল পরিধিতে আবদ্ধ। এক প্রান্তে রয়েছে একটি কলোনি। রয়েছে বাজার। আছে, প্রাথমিক স্কুলও। বন্দিদের পরিবারের সদস্য-সদস্যারা মনে করলে স্বেচ্ছায় এই কলোনি এসে বসবাস করতেই পারেন। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বাজার থেকে কেনাকাটা করা এবং পরিবারের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর মতো পরিষেবা এখানে পেয়ে থাকেন বন্দিদের পারিবারিক পরিজনেরা। ফলে, সংসার-ধর্ম পালন করা থেকে বিলাসবহুল জীবনযাপন-সহ কর্ম সংস্থানের মতো যাবতীয় সব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পেয়ে থাকেন এই সংশোধনাগারের বন্দিরা।

 নরওয়ের এই সংশোধনাগারে স্থিত বন্দিদের বক্তব্য সম্পর্কে 'দ্য গার্ডিয়ান' পত্রিকার প্রতিক্রিয়া হলো:

এ যেন একটি গ্রাম। একটি বন্দি সম্প্রদায় এখানে বসবাস করছে। প্রত্যেককে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমাদের অবসর সময় আছে যাতে আমরা কিছু মাছ ধরতে পারি অথবা গ্রীষ্মে আমরা সৈকতে সাঁতার কাটতে পারি। আমরা জানি, আমরা বন্দি। কিন্তু এখানে আমরা নিজেদেরকে সুন্দর স্বাভাবিক মানুষের মতোই অনুভব করি।

একটা মজার তথ্য হলো পৃথিবীতে বেশ কিছু সংশোধনাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কেবল কয়েদির অভাবে। ভাবা যায়? আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে যেখানে দিনের পর দিন আসামির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির সরকার অহরহ বিচলিত হয়ে পড়ে এই ভেবে যে সংশোধনাগারের পরিকাঠামো কোন উপায়ে আরও ভালো করা যায়! অথচ সুইডেন, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ড, লিস্টেনস্টাইন, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে বছরের পর বছর ধরে একটার পর একটা সংশোধনাগার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে আসামির সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার কারণে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সুইডেনে ২০০৫ সালে দণ্ড-প্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার। এখন তার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজারে। ফলে, অনেকগুলো জেল বন্ধ করে দিয়েছে সুইডিশ কারাবিভাগ। একই কারণে, নেদারল্যান্ডে ২০১৩ সালে তেরোটি সংশোধনাগারকে হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে অতিরিক্ত পাঁচটি সংশোধনাগারের ফটকে চিরকালের জন্য তালা ঝোলানো হয়। চৌত্রিশ হাজার নাগরিকের দেশ লিস্টেনস্টাইনের তথ্য দেখে সত্যিই হতবাক হতে হয়। বর্তমানে এই দেশে কারাগারের সংখ্যা হলো, কুড়ি। সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির সংখ্যা কত হতে পারে? বিস্ময়কর হলেও সেখানে এখন আসামির সংখ্যা মাত্র উনিশ। অর্থাৎ ওই দেশে উনিশজন অপরাধীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে কুড়িটি সংশোধনাগার!

গীতারামা-র বন্দিরা

পৃথিবীতে যদি বাস্তয় কারাগার থাকতে পারে তবে বিপরীতে অবশ্যই শিকড় গেড়ে বসে থাকবে গীতারামা সংশোধনাগার। কারণ আলোর বিপরীতেই তো অন্ধকারের প্রবল রাজত্ব! এই সংশোধনাগারে আসামিদের সংশোধন করার প্রয়াস তো দূর অস্ত, এখানে কয়েদিদের নরখাদকে রূপান্তরিত করা হয়ে থাকে। পাঁচশো থেকে ছ-শো জন আসামি থাকতে পারে এমন জায়গায় পাঁচ থেকে ছ-হাজার কয়েদিকে রাখা হয়। সুতারাং একে 'নরকবাস' উল্লেখ করাই শ্রেয়। বলা যায়, এই হল দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম বন্দিক্ষেত্র। পূর্ব আফ্রিকার অন্তর্গত দেশ রুয়ান্ডা। সেখানেই রয়েছে মনুষ্যত্বের অভিশাপ এই গীতারামা সংশোধনাগার। এখানকার বন্দিরা একে অপরকে খুন করে। তারপর মৃত ব্যক্তির মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে অন্যেরা। এমনই চাঞ্চল্যকর খবর একদা প্রকাশিত হয়েছিল আফ্রিকার এক দৈনিকে। কুখ্যাত গীতারামা জেলে শোয়া-বসা তো দূরে থাক, ঠিকমত দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। প্রত্যেক দিন, খাওয়ার দেওয়া হয় মেরেকেটে একশো জনের জন্য, তাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র দু-বার। গায়ের জোরে সেইসব খাবার কেড়ে খেয়ে নেয় পঞ্চাশ-ষাটজন বন্দি। অভুক্তই থেকে যান বাকিরা। প্রচন্ড খিদেতে এরপর শুরু হয় একে অপরকে খুন করার পালা। খুন করার একমাত্র লক্ষ্য হলো সহ-বন্দিদের মাংস খেয়ে খিদের জ্বালা মেটানো। এভাবে সারাদিনে অন্তত সাত-আটজন বন্দি মারা যায়। খুন করে মাংস খেয়ে চিত্‍কার করতে থাকে বন্দিরা। দুর্বল হয়ে পড়লেই পরদিন সহ-বন্দিরা তাকেও মেরে ফেলে। এই খবর সামনে আসার পরই নড়চড়ে বসে বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। 

জীবনে যেমন আলো থাকে। তেমনই অন্ধকারও থাকে। বৈপরীত্যের শীর্ষে থাকা এই দুটি পৃথক সংশোধনাগার বুঝিয়ে দেয় মানুষ কতদূর পাশবিক হয়ে উঠতে পারে এবং পাশাপাশি এ-কথাও শেখায় যে মনুষ্যত্ব ঠিক কেমন হওয়া উচিত!

More Articles