দেশজুড়ে বাঙালি খেদাও অভিযান! কী বলছে বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল?
Bengali Migrant Workers: এর আগেও ১৯৬০-১৯৭০-এর দশকে আসামে 'বঙ্গাল খেদা আন্দোলন' দেখেছেন, তিনি তখন সদ্য যুবক। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, বাংলা ভাষা শুনলেই মারা হত।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হেনস্থার শিকার পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা। ইতোমধ্যেই এই ঘটনায় উত্তপ্ত রাজ্য-রাজনীতি। ভোট গণিতবিদরা অঙ্ক কষতে শুরু করে দিয়েছেন, আগামী বিধানসভা নির্বাচনের ইস্যু এটাই। যেহেতু বেশিরভাগ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেই বাংলাভাষী শ্রমিকরা নিগ্রীহিত হচ্ছেন। তাই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির বিরুদ্ধে ২৬-এর নির্বাচনে লড়তে 'বাঙালি অস্মিতা'-কেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে রাজ্যের শাসকদল। ইতোমধ্যেই শহিদ স্মরণ মঞ্চ থেকেই সেই ঘোষণা করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
একদিকে বিজেপি বলছে, এটা 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হটাও অভিযান'। অন্যদিকে তৃণমূলের প্রতিবাদ, 'এটা বাংলা ভাষা এবং বাঙালির অপমান'। একুশের মঞ্চ থেকে ভাষা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। কিন্তু রাজনৈতিক আকচাআকচির বাইরে গিয়ে দেখলে দেখা যাবে খেটে খাওয়া দরিদ্র বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের অনিশ্চিত জীবন ও জীবিকা। যার বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে সচেতন বাঙালি সমাজ। বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজ কী ভাবে দেখছেন এই ঘটনাকে? স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে 'বাঙালি খেদাও' অভিযানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বাঙালি বুদ্ধিজীবীমহল। ইনস্ক্রিপ্ট এই বিষয়ে কথা বলেছে মীরাতুন নাহার, কবীর সুমন, চন্দন সেন ও কৌশিক সেনের সঙ্গে। নিচে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরা হল –
আরও পড়ুন- দেশ জুড়ে ‘বাঙালি খেদাও’, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষেত্রেই কি প্রযোজ্য?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষীদের 'বাংলাদেশি' সন্দেহে আটক এবং নিগ্রহের ঘটনায় অধ্যাপিকা মীরাতুন নাহার বলেন, এটা মূলত কেন্দ্রীয় শাসকদল একেকটা প্রক্রিয়া বা পলিসি গ্রহণ করছে। যাতে বহুকালের জন্য তারা ক্ষমতায় থাকতে পারে। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসকদল ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষকে হিন্দু ভারতে পরিণত করতে চাইছে। কারণ তারা মুসলিমদের ভারতবাসী বলে মানে না। তাদের কাছে বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি, আর বাংলাদেশি মানেই মূলত তাঁরা মুসলমান। মানে আবার সেই ঘুরে ফিরে মুসলিম বিদ্বেষটাই কার্যকর করতে চাইছে তারা। হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই প্রক্রিয়াটাকে কেন্দ্রীয় শাসকদল ব্যবহার করছে বলে মত মীরাতুন নাহারের। তাঁর অভিযোগ, ভারতের বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ইতোমধ্যেই হিন্দি ভাষা চাপানোর চেষ্টা চলছে। এনআইটি-তে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, প্রফেসরদের নাম প্রথমে হিন্দিতে, তারপর ইংরেজিতে লেখা। তাঁর মতে, বাংলা প্রভাবশালী ভাষা, হিন্দু ভারত এবং হিন্দি ভাষাভাষী ভারত তৈরি করার লক্ষ্যে তাই বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতির উপরে নির্যাতন করা হচ্ছে। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে হিন্দি ভাষা চাপানোর প্রবনতা দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় শাসকদলের মধ্যে। এটা একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে মনে করেন এই বাঙালি বুদ্ধিজীবী।
এছাড়া বাঙালির অপমানের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরব হওয়া প্রসঙ্গে ড. মীরাতুন নাহার বলেন, রাজ্যের শাসকদলনেত্রী শহিদ স্মরণ মঞ্চকে কলঙ্কিত করেছেন। এটুকু লোভ তাঁরা সম্বরণ করতে পারেনি, শহিদ স্মরণ মঞ্চকে বিজেপি বিরোধী মঞ্চ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, শাসক তৃণমূল বিজেপির টোপ গিলেছে এবং আগামী নির্বাচনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তিনি আরও বলেন যে, বাইরে থেকে কাউকে দেখে বিচার করা যায় না, তাই বিজেপির বাংলা বিরোধিতাটাও বোঝা যাচ্ছে না। এমন সময় বিজেপি বাংলা বিরোধিতা করেছে যে, রাজ্যের শাসকদলনেত্রী রীতিমতো সেটা ব্যবহার করে নিলেন। আর এটা যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করবেন, বিজেপির তা অজানা ছিল বলে বিশ্বাস করেন না তিনি। তিনি বলেন, প্রবীণ নাগরিক হিসেবে তিনি অত্যন্ত বিভ্রান্ত, বুঝতে পারছেন না এটা বাইরের বিবাদ নাকি ভেতরের বিবাদ। কারণ কান পাতলেই শোনা যায় – ভেতরে ভেতরে রাজ্যের শাসকদল ও কেন্দ্রের শাসকদলের মধ্যে আঁতাত রয়েছে, আর বাইরে বিরোধীতা করছে। মীরাতুন নাহারের সংশয়, দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে হয়তো ভেতরের আঁতাত এখন দূরে সরে গেছে। তাই হাতে অস্ত্র পেয়ে নির্বাচনে জয়লাভের আশায় সেটা ব্যবহার করছে রাজ্যের শাসকদল। কারণ কেন্দ্রের শাসকদল হোক বা রাজ্যের শাসকদল জনগণের মঙ্গলের জন্য কিছু করে না। দু'পক্ষকেই 'জনগণের সরকার' বা 'গণতান্ত্রিক সরকার' বলে মনে করেন না তিনি।
আরও পড়ুন- রোহিঙ্গা সমস্যার মধ্যেই উপ্ত ছিল বাঙালি নিপীড়নের বীজ
বাংলাভাষীদের উপর এই আক্রমণ প্রসঙ্গে বাঙালি নাট্যকার-অভিনেতা চন্দন সেন বলেন, "এটা একটা রাজনৈতিক প্রকল্প বা অত্যন্ত সচেতনভাবে তৈরি করা একটা রাজনৈতিক চাল।" তিনি বলেন, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে জনসংখ্যা বাড়ছে এবং সেখানে সস্তায় পরিযায়ী শ্রমিক জোগাড় করার জন্য লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই কারণেই বাঙালিদের খেদিয়ে সেখানে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা হচ্ছে না তো? প্রশ্ন তুলেছেন চন্দন সেন।
তিনি আরও বলেন, "বাঙালি বিতারণ এর আগেও বহুবার হয়েছে – আসামে, মহারাষ্ট্রে হয়েছে। দিল্লিতে তো হামেশাই হচ্ছে। আর প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে 'বাংলাদেশি' বলে দেওয়া এবং যে কারণে কলকাতা শহরে পর্যন্ত দাঁড়িয়ে খুব জোর দিয়ে বলতে পারে – হিন্দিতে কথা বলছেন না কেন? বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশে যান।" চন্দন সেন বলেন, বাঙালি জাতির বড় পরিচয় হচ্ছে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতক। চৈতন্যদেব থেকে যার শুরু, কারণ ধর্মের গণতন্ত্রীকরণ করেছিলেন চৈতন্যদেব। তার পরবর্তীক্ষেত্রে আরও অনেক বিদ্বজন এসেছেন, কিন্তু সরাসরি সংঘাত তৈরি হয় রামমোহনের সময় থেকে। তার ফলে গোটা ভারতবর্ষে বাঙালির পরিচিতি সত্ত্বার আলোকপ্রাপ্তি। যেটা বর্তমান সরকার (কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়)-এর খুবই অস্বস্তির জায়গা। সুতরাং এটা খুব পরিকল্পিত আক্রমণ বলে মনে করছেন তিনি। সারাদেশে বাঙালি হেনস্থার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরব হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, রাজনৈতিক দল সবসময় একটা ইস্যু খোঁজে, যাতে জনসাধারণ উত্তপ্ত হয় এবং তাদের আখের গোছানো যায়। এছাড়া যদি সত্যিই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভাবতেন, তাহলে রাজ্যে যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি করতেন।
আরও পড়ুন- বাঙালির রক্তে স্বাধীন হওয়া ভারতে, আমরাই গণহত্যার দ্বারপ্রান্তে
অভিনেতা কৌশিক সেন ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, এটা শুধু রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নয়। তিনি জানান, সম্প্রতি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়কের বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। সেখানেই বিশ্বব্যাপী নব্য উদারবাদী ধনতান্ত্রিক ক্রাইসিস সম্পর্কে শোনেন তিনি। কৌশিক সেন এ-প্রসঙ্গে বলেন, "এটা এমন একটা পরিস্থিতি যখন ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারছে না। এমন সময় তারা যে দেশগুলোতে ব্যবসা করতে চাইছে, সেই দেশের সরকারের সঙ্গে একটা গাঁটছোড়া বাঁধে। এইভাবে একেকটা দেশে ফ্যাসিস্ট বা আধা ফ্যাসিস্ট সরকার তৈরি হয়। যারা মিলে একটা পরিস্থিতি তৈরি করে– যখন মানুষ বাজার-দোকান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবকিছু নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। মানুষ সরকারকে প্রশ্ন করবে, আমি এই সুবিধাগুলো পাচ্ছি না কেন? যেমন দুই কোটি চাকরির কী হল? নোটবন্দি হয়ে কী হল বা হঠাৎ যুদ্ধটা লাগল কেন? ট্রাম্প সাহেবের ধমকানিতে বন্ধই বা হয়ে গেল কেন? পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদীরা কোন পথে এসেছিল? এই প্রশ্নগুলো মানুষ যাতে না করে, তার জন্য একটা কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে তারা। সেই শত্রুটা কখনও ভাষার মাধ্যমে তৈরি হয়, কখনও পাকিস্তানের মাধ্যমে তৈরি হয়, কখনও বাংলাদেশ– এভাবে একেকটা জুজু তৈরি করে তারা। আমাদের দেশে মূলত মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে মানুষকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করবে, যেহেতু সামনে পরপর নির্বাচন আছে। যাতে মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারে। সেই কারণেই এই ন্যারেটিভগুলো তৈরি করা হয়।" এটা শুধুই বিজেপি করছে তা নয়, এর পিছনে ব্যাবসায়িক মহলের বড় অবদান আছে বলে মত তাঁর। ফলে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা বিভিন্ন রাজ্যে কাজে গিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বললে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে মারধর করে, বাংলাদেশে 'ঘাড়ধাক্কা' দিয়ে মানুষের সমর্থন পেতে চাইছে তারা। মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, "এর কারণেই কিন্তু আমার উন্নতিটা হচ্ছে না। নাহলে আমার উন্নতিটা হয়েই যেত। এইভাবে একটা ফলস ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে।"
আরও পড়ুন- বেছে বেছে বাঙালিকেই ঘাড়ধাক্কা! বিধানসভা ভোটে ‘কি ফ্যক্টর’ বাংলাদেশি জুজু?
ভিনরাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা হওয়ার ঘটনায় প্রসিদ্ধ সংগীত শিল্পী ও গীতিকার কবীর সুমন জানান, একজন বাংলাভাষী হিসবে এই ঘটনায় ধিক্কার জানান তিনি। যেকোনো ভাষার মানুষই যদি আইনের দ্বারা এবং কেন্দ্রের সরকারের প্রশ্রয়ে এভাবে নিগ্রীহিত হন, ধিক্কার জানানো ছাড়া আর কিছু করার থাকে না বলে জানান তিনি। এই ঘটনায় খুব একটা অবাক হচ্ছেন না বলেও জানান। কারণ এর আগেও ১৯৬০-১৯৭০-এর দশকে আসামে 'বঙ্গাল খেদা আন্দোলন' দেখেছেন, তিনি তখন সদ্য যুবক। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, বাংলা ভাষা শুনলেই মারা হত। তাঁর মতে, বিজেপি, আরএসএস দক্ষিণপন্থী শাসকরা বুঝতে পেরেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে তাঁরা বিশেষ দাঁত ফোটাতে পারবেন না। কারণ তাঁরা ঘৃণার রাজনীতি করেন। আর পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষই সেটা পছন্দ করেন না। তাই তাঁরা খোঁচাচ্ছে। বাংলাভাষী মানেই 'বাংলাদেশি' বলে দাগিয়ে দেওয়াটাকে গায়ে পড়ে করা অসভ্যতা-বর্বরতা মনে করেন কবীর সুমন। তিনি আরও বলেন, "হিন্দি ভাষা রাষ্ট্র ভাষা বলে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা আছে, এমনকি অনেক বাঙালিদের মধ্যেও এই ধারণা আছে। কিন্তু না, ভারতের কোনো রাষ্ট্রভাষা নেই। আমি লোকসভার সাংসদ ছিলাম, কস্মিনকালে শুনিনি হিন্দি রাষ্ট্রভাষা। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের কার্যনির্বাহের জন্য দুটি ভাষা ব্যবহার করে – একটা হলো ইংরেজি, আর একটা হিন্দি। এবার বাংলাভাষীরা অন্যান্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে গিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বললে নিগ্রীহিত হন, 'বাংলাদেশি' বলা হয়। তাহলে কী করণীয়? জানি না আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলি কী করছে। জানতে পেরেছি যে, একাধিক বামপন্থী দল এই ঘটনার বিরোধিতা করেছে, তারা মিছিল করেছে। তেমনই পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলও এর বিরুদ্ধে মিছিল করেছে।" হিংসার মাধ্যমে কোনো কিছুর সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন না কবীর সুমন। তাঁর মতে, দলবদ্ধভাবে নানান ভাষার মানুষকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। তার মধ্যে হিন্দিভাষীরাও থাকবেন, পাঞ্জাবিরাও থাকবেন। তিনি বলেন, "কলকাতা শহরে কত ভাষাভাষীর মানুষ থাকেন, আমরা সবাই সৌভাতৃত্বের বন্ধনে বাঁধা। আমরা হাতে হাত ধরে এই ঘটনার বিরুদ্ধাচরণ করব।"