অপারেশন সিঁদুর: ভারতের হারানো যুদ্ধবিমানের সংখ্যা নিয়ে কেন মাথাব্যথা ট্রাম্পের?

India-Pakistan conflict: সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে যুদ্ধবিমান ধ্বংস নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চার-পাঁচটি বিমান ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বন্ধুত্বের এই প্রতিদান দিলেন ট্রাম্প? সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে যুদ্ধবিমান ধ্বংস নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চার-পাঁচটি বিমান ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা নিজের মুখেই বারবার বলেছেন ট্রাম্প। তাহলে হঠাৎ যুদ্ধবিমান ধ্বংস নিয়ে ট্রাম্পের মাথাব্যথার কারণ কী? এর পেছনে কি ট্রাম্পের বৃহত্তর বাণিজ্যিক লক্ষ্য রয়েছে?

পাহেলগাঁও হামলার পর পাকিস্তানে প্রত্যাঘাত করেছিল ভারত। অভিযানের নাম ছিল 'অপারেশন সিঁদুর'। ভারতের দাবি, ৬ মে পাক অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাক পঞ্জাবের ন'টি জঙ্গিঘাঁটি আক্রমণ করে ভারতীয় সেনা। জঙ্গিঘাঁটি লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছিল বলে দাবি করেছিল ভারত। ৭মে থেকে ১০ মে এই চার দিন দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় যুদ্ধে পরিণত হচ্ছিল। ট্রাম্প দাবি করেন, এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যস্থতা করেন তিনিই। যুদ্ধ থামানোয় তাঁর ভূমিকার কথা নিজেই বারবার বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে পাকিস্তান ট্রাম্পের কৃতিত্ব মেনে নিলেও ভারত তাঁর ওই দাবি স্বীকার করেনি। এবার যুদ্ধবিমান ধ্বংসের প্রসঙ্গে আবার নতুন করে মন্তব্য করলেন তিনি। লোকসভায় বাদল অধিবেশন শুরুর আগে ট্রাম্পের এ হেন মন্তব্যে ব্যপক জলঘোলা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, মোদী ট্রাম্পের দূরত্ব কি ক্রমশ বাড়ছে?

আরও পড়ুন- কেন ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টাইনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক? জেফ্রি এপস্টাইন কে?

হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের নিয়ে একটি সভায় ট্রাম্প বক্তৃতা রাখেন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও হিংসার প্রসঙ্গে। ট্রাম্পের ‌দাবি, "আমরা একাধিক যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছি। এই যুদ্ধগুলি যথেষ্ট বিপজ্জনক ছিল। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে। আমার মনে হয়, সেখানে চার-পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশ পরস্পরকে আক্রমণ করছিল।"

যদিও ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেননি কোন দেশের যুদ্ধবিমান ধ্বংসের কথা বলছেন। যুদ্ধ বিমান ধ্বংস নিয়ে প্রায় দু'মাস বিতর্ক চলেছিল। পাকিস্তান দাবি করেছিল, ভারতের ৫টি  যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে তারা। তবে ভারত এই নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু না জানালেও ভারতীয় সেনা সর্বাধিনায়ক অনিল চৌহান সিঙ্গাপুরে জানিয়েছিলেন, ভারতের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যার উল্লেখ করেননি তিনি। ক্যাপ্টেন শিবকুমারের মুখেও ইন্দোনেশিয়ায় একই ধরনের স্বীকারোক্তি শোনা গিয়েছিল। এখন যুদ্ধ বিমান নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য সামনে আসার পর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ট্রাম্পের বক্তব্যকে হাতিয়ার করেছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, তিনিই যুদ্ধ থামিয়েছেন, দাবি করেও হঠাৎ কেন যুদ্ধবিমান ধ্বংসের প্রসঙ্গ আনলেন ট্রাম্প? বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারতের উপর চাপ বাড়াতেই ট্রাম্প এখন এ কথা বলেছেন।

নতুন শুল্ক নীতি আনতে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিছু মাস ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই আলোচনা এখনও চলছেই। ভারত এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। সম্প্রতি আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ''আমার মনে হয়, আমরা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে চলেছি। এটা এমন এক চুক্তি হবে, যেখানে আমরা (বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের) ভিতরে ঢুকতে পারব। ভারত সাধারণত কাউকে ভিতরে ঢুকতে দেয় না। আমার মনে হয়, এবার হয়তো তারা দেবে। ভারত যদি এমনটা করতে দেয়, তাহলে আমরা অনেক কম শুল্কে চুক্তি করতে পারব।'' ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন, ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে ঢুকতে দিলেই এই চুক্তি করা হবে।

আরও পড়ুন- ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা ‘পাগল তত্ত্ব’! ট্রাম্পের খেয়ালখুশি সিদ্ধান্ত নিয়ে যা বলছেন বিশ্লেষকরা

তবে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই নীতি আয়োগ সতর্ক করেছিল কেন্দ্রকে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে রিপোর্টও দিয়েছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়, ভারতে দুগ্ধজাত পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে প্রায় আট কোটি মানুষ জড়িত। নতুন শুল্কনীতি এলে এই ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।

ওয়াশিংটন চাইছে আপেল, বাদাম, জেনেটিক্যৈালি মডিফায়েড(জিএম) শস্যের উপর ভারত শুল্ক কমিয়ে দিক। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশে সব কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র দুধ ও দুধজাত পণ্যের উপরেও শুল্ক কমাতে চাইছে। ট্রাম্পের বাণিজ্য চুক্তির মূল উদ্দেশ্য এটাই। অন্যদিকে, ভারত চায় এখন চুক্তি হোক কিন্তু তাতে দুধ ও দুধজাত পণ্য ও জিএম শস্য বাদ থাক।

আসলে কৃষি ও ডেয়ারিতে শুল্ক কমালে, সরকারকে কৃষক-বিরোধী বলে মনে করবেন অনেকেই। কারণ, ভারতে ডেয়ারির সঙ্গে প্রায় আট কোটি মানুষ জড়িত। পেস্তা, হেজেলনাট, অ্যামন্ড-এর মতো পণ্য ভারত অনেকটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  আমদানি করে। দেশটি দাবি করছে, আপেলের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কমাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সোয়াবিন ও ভুট্টার মতো পণ্য এ দেশে রপ্তানি করতে চায়। এ ক্ষেত্রে দেশটির ভারতের বাজার দরকার। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ সব অন্যায্য দাবি মেনে নিলে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিকভাবে সমস্যায় পড়বে। আর সরকার তা চাইছে না। অন্যদিকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যর সম্পর্ক থাকাটাও জরুরি। এই পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক কমিয়ে, কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের দাবি চাপিয়ে চুক্তি করতে চাইছে ভারত। অন্যদিকে, ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারতের উপর চাপ বাড়াতে নতুন করে যুদ্ধবিমান ধ্বংসের প্রসঙ্গ তুলে আনছেন বলেই বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত। এখন দেখার, ভারত এই মন্তব্যে কী প্রতিক্রিয়া দেয়।

More Articles