বাবার ঘরে প্রবেশ নিষেধ ছিল পি সি সরকার জুনিয়রের, কেমন ছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্ক?
P C Sorcar Junior : প্রদীপচন্দ্রের জীবনের প্রথম মঞ্চ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাবার সহকারী হিসেবে। সেটাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ম্যাজিক শো বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত বাঙালিদের নাম স্মরণ করলে প্রথম সারিতেই চলে আসেন পি সি সরকার তথা প্রতুলচন্দ্র সরকার। ভারতের জাদুবিদ্যার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। স্বমহিমায় তাঁর এই কৃতিত্ব বহন করেছেন পুত্র প্রদীপ চন্দ্র সরকার, যিনি পি সি সরকার জুনিয়র বলে খ্যাতি লাভ করেছেন স্বভূমে এবং বিশ্বদরবারে। লুকিয়ে বাবার থেকে জাদুবিদ্যা শিখেছিলেন প্রদীপচন্দ্র। বাবার থেকে ম্যাজিক করার অনুমতি পেতে সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কেমন ছিল পিতা-পুত্রের সম্পর্ক?
পিসি সরকার জুনিয়রের মতে, তৎকালীন এবং তাঁর পূর্ববর্তী সময়ের জাদুকর সমাজ বা জাদুকর জগৎ, জাদুকর বৃন্দ সবাইকে মন্থন করে পি সি সরকার তৈরি হয়েছেন। যেমন সমুদ্র মন্থন করে অমৃত তৈরি হয়েছিল।
জাদুসম্রাট পি সি সরকার
পি সি সরকার মনে করতেন, ভারত ম্যাজিকের দেশ। ম্যাজিক মানে, বাস্তবে যেটা সম্ভব হয় না সেটা সম্ভব করে দেখানো। কেউ ভালো ফুটবল খেললে, তার নাম হয়ে যায় ফুটবলের জাদুকর। একইভাবে ক্রিকেট, হকি, লেখার জাদুকর। সেরার সেরা মানেই জাদুকর। লোকে জাদুকর বললে অপমান বোধ করতেন পিসি সরকার। তিনি মনে করতেন সবই বিজ্ঞান। কেবল জাদুকরের মত অভিনয় করেন তিনি। আর পিসি সরকার জুনিয়র মনে করেন — ম্যাজিক অভিনয় নয়, ম্যাজিক হচ্ছে অভিদশ।
উন্নতি করতে করতে প্রতুলচন্দ্র যখন পিসি সরকার হলেন, তখন সমালোচনা শুরু হল সবার। ওই সমালোচকদের শিক্ষক মনে করতেন প্রদীপচন্দ্র। তাদের মুখ বন্ধ করে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। বাবার ম্যাজিক দেখে সমালোচকরা বলতেন, ‘ওই যে মঞ্চের পিছনটা দেখাল না’। তখন তিনি বুঝে গেছিলেন যে তাঁকে মঞ্চের পিছনটা দেখাতে হবে আর সমালোচকের কল্পনাটাকে চুরমার করে দিতে হবে। সেটাই করেছেন তিনি। সারা বিশ্বে আর কারোরই সংশয় নেই তাঁর জাদুবিদ্যা নিয়ে।
পি সি সরকার জুনিয়রের স্টেজ শো
বাবা বলেছিলেন, ম্যাজিক হচ্ছে বড়দের আসর। সেই কথার যথার্থতা বড় হয়ে বুঝতে পারেন প্রদীপচন্দ্র।
বাড়িতে বসত আড্ডার আসর। কিন্তু সেই ঘরে প্রবেশ নিষেধ ছিল প্রদীপচন্দ্রের। বাবা তাঁকে বলতেন, এটা ‘ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক’। ঢুকলে অনন্তকালের যাত্রী হতে হবে, এগিয়েই যেতে হবে। শৈশবে এই কথার অর্থ বুঝতে পারেননি তিনি। মা বুঝিয়ে বলতেন সেই ঘরে না যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই ঘরে প্রবেশের উপায় বের করেছিলেন পি সি সরকার জুনিয়র। আড্ডার আসরে যাঁরা আসতেন, তাঁরাও ছিলেন বড় বড় শিল্পী। ৫০ থেকে ৫৫ জন ঘিরে বসে থাকতেন তাঁর বাবাকে। সাধারণত কারোর বাড়িতেই এতগুলো চায়ের কাপ থাকে না। তাই পালা করে করে অতিথিদের হতে চায়ের কাপ তুলে দিতেন প্রদীপচন্দ্র। সেই দায়িত্ব মা তাঁকে দিয়েছিলেন। এই সময়ে তাঁদের মধ্যেকার কথপোকথন শুনতেন তিনি। এইভাবেই বাবার কথা শুনে শুনে তাঁর ম্যাজিক শেখা।
আরও পড়ুন - আস্তাকুঁড় হল স্বভূমি! হর্ষ নেওটিয়া যে ভাবে গড়েছিলেন বাঙালির প্রিয় ডেস্টিনেশন
বাবা বলতেন এইভাবে ধরতে হয়, এইভাবে দাঁড়াতে হয়, এইভাবে দর্শকদের বোঝাতে হয় যে আমি দূরে তাকিয়ে আছি — এই আলোচনাগুলো বা মুদ্রার ব্যাপারটা একা একা অভ্যাস করতেন প্রদীপচন্দ্র। বাবা আর বাবার বন্ধুরা বেরিয়ে গেলেও তাঁর ছুটি হত না। কারণ অতিথিদের রাউন্ড করে চা দেওয়ার সময় যে কাপের চা ঠান্ডা হয়ে যেত, পান করে নিতেন। এভাবে চার-পাঁচবার চা পান হয়েই যেত তাঁর। ফলে রাতে ঘুম আসতো না। তখন তাঁর প্রোগ্রাম শুরু হত। কল্পনার দৃষ্টিতে খুলে যেত বিরাট মঞ্চ। প্রোগ্রামটা করতেন পি সি সরকার জুনিয়র। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখতেন, গায়ে কী সুন্দর পোশাক! ডানদিকে, বামদিকে সহকারী-সহকারিণীরা এবং ম্যাজিকের যন্ত্রপাতি। সবগুলো নিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতেন হাজার হাজার দর্শক। আর তারা আনন্দ পাচ্ছেন তাঁর ম্যাজিক দেখে। এটা শুয়ে শুয়েও হত, আবার জেগে জেগেও হত। জেগে থাকা, আর ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা, দুটোর অর্থই একই প্রদীপচন্দ্রের কাছে।
পি সি সরকার জুনিয়র
ম্যাজিক শিখতে চেয়ে যখন বাবার কাছে গেছিলেন প্রদীপচন্দ্র, পি সি সরকার বলেছিলেন — ম্যাজিক শেখানো যায় না। ম্যাজিক শিখে নিতে হয়। আর সেটাই আর্টের লক্ষণ। তখন খুব অভিমান হয়েছিল প্রদীপচন্দ্রের। বাবা তাঁকে বলেছিলেন, ম্যাজিশিয়ান হতে গেলে পেটে বিদ্যা থাকা দরকার। তিনি তখন গ্র্যাজুয়েট, বিএসসি পাশ করেছেন। বাবাকে সগর্বে সেই সার্টিফিকেট দেখান প্রদীপচন্দ্র। কিন্তু বাবা বলেছিলেন — বিজ্ঞান দিয়েই সবকিছু করা হচ্ছে ম্যাজিকের, কিন্তু ম্যাজিক আদতে একটা আর্ট। তখন লুকিয়ে লুকিয়ে আবার স্পেশাল বি.এ-এর আবেদন করেন তিনি। কিন্তু বি.এ পাশ করে বাবাকে সার্টিফিকেট দেখালেও বাবা অনুমতি দেননি। বাবা বলেছিলেন, “ম্যাজিক জন্ম নেয় দর্শকের মনে। দর্শকের মন জয় না করতে পারলে মনোরঞ্জন করবে কী ভাবে?”
তখন প্রদীপচন্দ্র ঠিক করেন সাইকোলজি নিয়ে পড়বেন। তারই সঙ্গে বাবার থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে নেন, যে এমএসসি পাশ করলেই ম্যাজিক করার অনুমতি দিতে হবে। ছেলের এই কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেছিলেন প্রতুলচন্দ্র সরকার। নাটকীয়ভাবে প্রদীপচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “ঠিক আছে কথা দিলাম।” ভালো রেজাল্ট করেছিলেন প্রদীপচন্দ্র। কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস। ছেলের জীবনের শুরুতে, থেমে যায় বাবার হৃদস্পন্দন। পি সি সরকার জুনিয়র খবর পান বাবার মৃত্যুর।
আরও পড়ুন- বাজারের পাশাপাশি আড্ডার ঠেক, যেভাবে গড়ে উঠেছিল বাঙালির প্রিয় মল সিটি সেন্টার
জাপান থেকে বাবার মৃতদেহ দেশে সেখানেই রয়ে যান তিনি। কারণ বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, শো যেন বন্ধ না হয়। সেই কথা রাখতেই পরদিনই শো শুরু করেন প্রদীপচন্দ্র সরকার। বাবার মৃত্যু মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু জাপানের চুক্তি শেষ করে দেশে ফিরে মাকে সাদা থান পরে দেখে মেনে নিতে পারেননি।
পিতা-পুত্রের সম্পর্ক কেমন ছিল, তা ধরা পড়ে বাবার সঙ্গে পি সি সরকার জুনিয়রের প্রথম ম্যাজিক শো-তে।
প্রদীপচন্দ্রের জীবনের প্রথম মঞ্চ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাবার সহকারী হিসেবে। সেটাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ম্যাজিক শো বলে মনে করেন তিনি। বাবার শোয়ের আগের দিন দলের কয়েকজন সহকারী দল ছেড়ে চলে গেছিলেন। সেই সময় বাবাকে প্রদীপচন্দ্র বলেছিলেন, “আমাকে সুযোগ দাও, আমি করে দেখাচ্ছি।” শোয়ের পর দর্শকরা যখন হাততালি দিলেন, পি সি সরকার জুনিয়রের মনে হয়েছিল দর্শক তাঁকে হাততালি দিলেন। কিন্তু বাবা তাঁকে কোনো উৎসাহ দেননি। খুব মন খারাপ হয়েছিল তাঁর। মা মাঝরাতে তাঁর ঘরে এসে বলেছিলেন, বাবা বলেছে “ও ভীষণ ভালো করেছে। ওকে বললে ও নষ্ট হয়ে যাবে, ওকে বোলো না ও ভালো করেছে।” মা তাঁকে দশটাকা দিয়েছিলেন। সেই নোটটা এখনও রেখে দিয়েছেন তিনি। জীবনের প্রথম উপার্জন।
‘পি সি সরকার জুনিয়র’ আখ্যা পছন্দ করেন না প্রদীপচন্দ্র। তিনি মনে করেন, ‘পি সি সরকার কনটিনিউয়েশন’ তিনি। পি সি সরকার শেষ হবেন না।