ভিন রাজ্যে বাংলাভাষী নিগ্রহ, কী বলছে তরুণ বাঙালি লেখক সমাজ?

লেখিকা সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "এর মাধ্যমে শুধু ব্যাক্তিকে আক্রমণ করা হচ্ছে না, একটা ভাষাকে আক্রমণ করা হচ্ছে। এটা শুধু জাতীয় রাজনীতি নয়, ভাষা রাজনীতিও।"

ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে আক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা। পুলিশি ধরপাকড় তো আছেই। তারই সঙ্গে স্থানীয়দের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়েছেন বহু বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক। বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য 'বাংলাদেশি' সন্দেহে আটক এবং তারপর বাংলাদশে 'ঘাড়ধাক্কা' দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে এই ঘটনা পরম্পরায় যখন সরব বাঙালি জাতি। বাঙালি সমাজের নানা শ্রেণির মানুষকে যখন মুখ খুলতে দেখা যাচ্ছে তখন বাংলার তরুণ লেখক মহলের কী প্রতিক্রিয়া এই ঘটনায়? ইনস্ক্রিপ্ট লেখক সাদিক হোসেন, অমৃতা ভট্টাচার্য, অনির্বাণ বসু, সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়, তন্ময় ভট্টাচার্য, প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী এবং অভিষেক ঝা-র সঙ্গে কথা বললে, এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তাঁরা। 

Sadique Hossain

সাদিক হোসেন, লেখক

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে লেখক সাদিক হোসেন এ'বিষয়ে বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটা নিয়ে রাজনীতি করছেন, সেটা স্বাভাবিক। যে কোনো রাজনৈতিক দলই তাই করবে। তবে আমাদের সমস্ত সংকীর্ণ রাজনৈতিক জায়গা থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদাকে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেব।"

আরও পড়ুন- দেশজুড়ে বাঙালি খেদাও অভিযান! কী বলছে বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল?

Amrita Bhattacharya

অমৃতা ভট্টাচার্য, লেখিকা

ভিন রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপর আক্রমণের ঘটনায় লেখিকা অমৃতা ভট্টাচার্য বলেন, "মিডিয়া প্রচারিত এই সংবাদ যদি পক্ষপাতহীন সত্য বলে মেনে নিই, তাহলে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য ভারতবর্ষের কোনও মানুষের ওপর অত‍্যাচার হলে সেটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বিরোধী কাজ। পৃথিবীতে যে কোনও মানুষকে যদি কোনও ভাষা উচ্চারণের জন্য শাস্তি পেতে হয় সেটা অমানবিক এবং আইনবিরুদ্ধ। তার পাশাপাশি এটাও ঠিক যে আমাদের দেশে ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং ‘শরণার্থী’ দুটো বিষয় কিন্তু আলাদা এবং দুটোই জ্বলন্ত সমস‍্যা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাভাষা ব‍্যবহারের জন‍্য বাংলাদেশি ভেবে পশ্চিমবঙ্গের বা ভারতীয় বাঙালির ওপর অত্যাচারের ঘটনা কিংবা বাংলাদেশের বাঙালিদের ওপর অত্যাচার — কোনওটাই কোনওভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।"

Anirrban Basu

অনির্বাণ বসু, লেখক

লেখক অনির্বাণ বসু বলেন, "দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে, বাঙালিদের যেভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে। সর্বত্র আওয়াজ তুলতে হবে। আশা রাখি, এবার অন্তত আমাদের রাজ্যের শাসকদলের সাংসদরা সংসদে অনুপস্থিত থাকবেন না।" এই পরিস্থিতির জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়কেই দায়ী করেছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, "আমাদের এও মনে রাখতে হবে যে, মমতা বন্দ্যোপাধায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই রাজ্যে আরএসএস-এর জমি প্রশস্ত হয়েছে। আরএসএস বাঙালিকে ঘৃণা করে, এটা আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকেই বুঝি। বাঙালি বিদ্বেষ আরএসএস-এর চিরকাল।" 

আরও পড়ুন- কালিয়াচকের পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখকে যেভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হল

লেখিকা সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "এর মাধ্যমে শুধু ব্যাক্তিকে আক্রমণ করা হচ্ছে না, একটা ভাষাকে আক্রমণ করা হচ্ছে। এটা শুধু জাতীয় রাজনীতি নয়, ভাষা রাজনীতিও।" 

Tanmoy Bhattacharjee

তন্ময় ভট্টাচার্য, লেখক 

তন্ময় ভট্টাচার্যের বক্তব্য, "রাষ্ট্রের ভূগোল দিয়ে ভাষাকে বাঁধা যায় না। বাংলাভাষী মানেই যেমন বাংলাদেশি নয়, তেমন বাংলাদেশিরাও বাংলাভাষী। দু-বাংলার ভাষা-ঐতিহ্য দেশভাগেরও বহু শতাব্দী আগের। বর্তমান রাজনৈতিক-ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে তা কিছু মানুষের মধ্যে অসূয়া জাগালেও ইতিহাস বদলে যায় না। আমি বাঙালি এবং আমি ভারতীয় – এই পরিচয়ে লজ্জা নেই৷ ইতিহাস ও রাষ্ট্রের পট-পরিবর্তনই আমাকে এই পরিচয় দিয়েছে৷ যাঁরা বাংলাভাষাকে শুধুমাত্র বাংলাদেশে বেঁধে ফেলতে চাইছেন, তা তাঁদের সংকীর্ণতা, অজ্ঞতা ও বাংলার প্রতি অসূয়ার বহিঃপ্রকাশ। কিছু রাজনৈতিক সমীকরণও রয়েছে বইকি এর পিছনে! শুধুমাত্র বহিরাগত তত্ত্ব দিয়ে সব ডিফেন্ড করা যায় না।"

Priyanka Chaudhury

প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী, লেখিকা

লেখিকা প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী বলেন, "আমার জন্ম অসমে। আমার জন্মের বহু আগেই ১৯৬০ সালে অসমে 'বঙ্গাল খেদা' শুরু হয়েছিল, উত্তরপূর্বের বাঙালিদের প্রতি অসমীয়া জাতির বিদ্বেষমূলক সংগঠিত জাতিগত দাঙ্গা। সে সময়ে ১৪ হাজারেরও বেশি বাঙালিকে পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন প্রদেশে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। কী লজ্জার, আজ ৭০ বছর পরেও ভাষা কিংবা ধর্মকে পুঁজি করে একই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে! লেখক হিসেবে যত না লজ্জার, মানুষ হিসেবে তার থেকে ঢের বেশি লজ্জার যে আমরা কীরকম রিগ্রেসিভ সময়ে বাস করছি, সংবিধানকে বেমালুম ভুলে গিয়ে। ধিক্কার শব্দের খুব জোরালো প্রভাব আজকের দিনে আছে বলে মনে হয় না। নাহলে বলতাম ধিক্কার জানাই।"

Abhishek Jha

অভিষেক ঝা, লেখক

লেখক অভিষেক ঝা-র কথায়, "পুরো দেশজুড়ে সুপরিকল্পিত ভাবে বাঙালি কারিগর, বাঙালি যোগালির উপর যে আক্রমণ নেমে এসেছে তা স্পষ্টতই বাংলা ও বাঙালি নামক অস্তিত্বকে আক্রমণ। অনেক সাবর্ণ বাংলাভাষী রয়েছেন যারা এটাকে বিশেষ শ্রেণির উপর আক্রমণ চিহ্নিত করে এই বিপন্নতার গুরুত্ব কমিয়ে দিতে চাইছেন। আমি এটাকে বাংলা ও বাঙালি অস্তিত্বের উপর সার্বিক আক্রমণ মনে করছি। এই বিপন্নতা বাঙালির এবং বাংলার।"

More Articles