শক্তিমান থেকে আলিফ লায়লা, আরতি পালের মাটির পুতুল কেন এত জনপ্রিয়?

Arati Pal : আশি ও নব্বই দশকে দূরদর্শনে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ধারাবাহিকের চরিত্রগুলোকে নির্ভর করে আরতি পাল পুতুল তৈরি করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল:  শক্তিমানের পুতুল।

সাদা ধুতি পাঞ্জাবির ওপরে হলুদ উত্তরীয়র ঢেউ। মুখে হাল্কা লাজুক হাসি। চন্দন চর্চিত কপাল। মাথায় টোপর। পাশে বসে থাকা রমণীর স্থূল শরীরে আনন্দের অভিব্যক্তি খেলা করে যায়। তার, গলায় মালা। মাথায় মুকুট। টানা টানা চোখ ও গোলাকার মুখমণ্ডল। কপালে চন্দন-প্রলেপ। এভাবেই বাংলার চিরাচরিত বর-বউ-এর পুতুল তৈরি করেছেন হুগলী জেলার শ্রীরামপুর রাজ্যধরপুরের বর্ষীয়ান শিল্পী আরতি পাল। আজ নয়, বহু বছর ধরেই তিনি জড়িত আছেন মৃৎশিল্পের সঙ্গে।

বর বউ-এর পুতুল

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলার শিশুদের জন্য মাটির পুতুল তৈরি করে চলেছেন পঁয়ষট্টি বছরের আরতি দেবী। তাঁর পুতুলের বিশেষত্ব হল স্নিগ্ধতা। পুতুলগুলির মধ্যে রয়েছে  'দেখামাত্রই ভালো লেগে যাওয়া'- র মতো আনন্দের ভাব। ছোটোবেলায় পিতা নারায়ণচন্দ্র পাল ও পিসি সরলা পালের কাছে পুতুল তৈরির কৌশল শিখেছিলেন আরতি দেবী। তারপর দশকের পর দশক ধরে বংশপরম্পরায় এই মৃৎশিল্পকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। তাঁর তৈরি পুতুলগুলো নিজেদের অভিব্যক্তি দিয়ে মানব-মনের সঙ্গে কথা বলে চলে। আর এখানেই শিল্পীর সার্থকতা! তাঁর তৈরি পুতুলগুলির মধ্যে এমন এক নিষ্পাপ সরলতা থাকে, যা দেখামাত্রই ভালো লেগে যায় সবারই।

আরও পড়ুন-

মেঘলা দিনের রথের মেলা আজও রঙিন মাটির পুতুলে

প্রধানত, গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার পুতুল তৈরি করে থাকেন আরতি পাল। তাঁর তৈরি নারী পুতুলগুলির মধ্যে অন্যতম হল, কৃষক রমণী, কুয়ো থেকে জল তোলা বউ। আরতি পাল এই পুতুলগুলির মধ্যে দিয়ে মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ছেলেদের পুতুলের মধ্যে রয়েছে, হাঁটু পর্যন্ত ধুতি পরে মাথায় ঝুড়ি-ভর্তি সবজি নিয়ে চলা মধ্যবয়সি লোক। রয়েছে, গোল লাল রঙের টুপি ও গোল গলা খাঁকি উর্দি পরা পুতুলরূপী পুলিশ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বিশেষত ছেলে পুতুলগুলির মধ্যে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ-জীবনের স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠেছে। শুধু মানুষের পুতুল-ই নয়, চারপাশের প্রকৃতিও মিলেমিশে রয়েছে তাঁর তৈরি পুতুলের মধ্যে। যেমন, কাঠবেড়ালি, কচ্ছপ, বক, ব্যাঙ, ঘোড়া, ইঁদুর, গরু, খরগোশ, গাছ ইত্যাদি পুতুলও আরতি পাল তৈরি করে থাকেন।

আরতি পালের তৈরি পুতুল

আশি ও নব্বই দশকে দূরদর্শনে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ধারাবাহিকের চরিত্রগুলোকে নির্ভর করে আরতি পাল পুতুল তৈরি করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল:  শক্তিমানের পুতুল। মুকেশ খান্না অভিনীত এই চরিত্রটি গ্রাম বাংলায় যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল তার নিদর্শন আজও দেখা যায় আরতী পালের তৈরি শক্তিমান পুতুলের মধ্যে। অন্যদিকে আলিফ লায়লার ধারাবাহিকের দৈত্য ও পরী চরিত্রগুলোকে মাটির পুতুলে রূপান্তরিত করেছেন তিনি। পাশাপাশি, মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, পিতামহ বিশ্বের শরশয্যা, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, গঙ্গা ও শান্তনুর প্রণয়, এইসবই মাটির পুতুলে ফুটিয়ে তুলেছেন আরতি দেবী। তাঁর পুতুলের মধ্যে রামায়ণের কয়েকটি দৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাম-রাবণের যুদ্ধ, সীতাহরণ, রামের বনবাস ইত্যাদি।

আরতি পালের তৈরি পুতুল

বাংলার জনপ্রিয়তম পুতুলগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, হাতে হুকো নিয়ে বসে থাকা ঘাড় নাড়া বুড়ো দাদু। আরতি পালও ঘাড় নাড়া দাদুর পুতুল তৈরি করেন। কিন্তু তাঁর তৈরি পুতুলটির মধ্যে সমাজের উচ্চ বর্ণের এক ধরনের আভিজাত্যের ভাব লক্ষ্য করা যায়। আরতি পালের তৈরি পুতুলটিকে দেখতে স্থূল চেহারার। গলায় পইতে। কপালে বৈষ্ণবীও টিকা। শ্বেত শুভ্র দাড়ি নিয়ে মাথা উঁচু করে বসে রয়েছে। এছাড়াও তিনি বাংলার আরেকটি জনপ্রিয় পুতুল আহ্লাদ-আহ্লাদীও তৈরি করে থাকেন।

মৃৎশিল্পী আরতি পাল

চিরাচরিত সমাজ জীবনে যে সকল শ্রমজীবী মানুষ বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে সমাজের ভিতকে আরো জোরদার করে তোলেন সেইসব চরিত্রদের দেখাও পাওয়া যায় আরতি পালের পুতুলের ভেতর। যেমন, ব্যান্ড পার্টি, পোস্ট ম্যান, আইসক্রিম বিক্রেতা, ফুচকাওয়ালা, ট্রাফিক পুলিশ, সবজি বাজার নিয়ে বসা যুবক, সৈনিক,  এ সবই সমাজের বিভিন্ন স্তরের ভিন্ন ভিন্ন জীবিকার মানুষের কথা বলে চলে। প্রসঙ্গত, সৈনিকের পুতুলটি তৈরির ক্ষেত্রে ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর পুতুলের মধ্যে ভারতের সৈনিকের পাশাপাশি চিনের সৈনিকও দেখতে পাওয়া যায়।  প্রসঙ্গত জানাই, আগে মাটি দিয়ে যুদ্ধের ট্যাংক তৈরি করতেন আরতি দেবী!

ব্যান্ড পার্টির পুতুল

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর তৈরি বেশিরভাগ পুতুলই এক খোল ছাঁচের। কেবল হাতে হুকো নিয়ে ঘাড় নাড়া বুড়ো পুতুল এবং বর-বউ পুতুলের মতো কয়েকটি পুতুল তৈরির ক্ষেত্রে দুই কুল ছাঁচ ব্যবহার করা হয়। মাটির মিশ্রণের ক্ষেত্রে বেলে-দোয়াসের ওপর ভরসা রাখেন আরতি পাল। ব্যবহার করেন বাজার চলতি রঙ। বছরে শুধুমাত্র ঝুলনযাত্রা উপলক্ষে মাটির পুতুল তৈরি করেন আরতি দেবী। শিল্পীর কথায়, ঝুলন যাত্রা উপলক্ষে প্রায় পঞ্চাশ রকমেরও বেশি মাটির পুতুল তৈরি হয়। রাজ্যধরপুর অঞ্চলের অন্যান্য শিল্পীদেরও পুতুল তৈরির ক্ষেত্রে এক বিশেষ অনুপ্রেরণা ক্রমাগত যুগিয়ে চলেছেন মৃৎশিল্পী আরতি পাল!

More Articles