শতাধিক মন্দির কেন ধ্বংস করেছিলেন এ-দেশীয় রাজারা?

Demolition of Indian Temple : মুসলমানরা ভারতে আসার আগেও এই মন্দিরভাঙনের ঘটনা ঘটত। কারা করত? অবশ্যই এদেশীয় মানুষরা, নিজেদের মধ্যে।

ভারতের মুসলমান সম্রাটদের ‘হাজার হাজার’ মন্দির ধ্বংসের কথা বলা হয়ে থাকে প্রচলিত ইতিহাসে। এক্ষেত্রে, অনেকেই সীতারাম গোয়েলের তথ্যকে তাঁদের মূল রেফারেন্স হিসেবে তুলে ধরে থাকে। গোয়েলের এই তথ্য প্রধানত ইলিয়ট ও ডউসনের বই থেকে সংগৃহীত, যে-গ্রন্থটির মূল উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিম শাসকদের বর্বর প্রমাণ করে, ব্রিটিশ রাজত্বের গুনগান গাওয়া ও ইংরেজদের গ্রহণযোগ্যতা উপনিবেশিক ভারতীয় জনমানসে বৃদ্ধি করা। কিন্তু বিখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক রিচার্ড এম ইটনের গবেষণায় জানা যায়, পাঁচ শতাব্দীর বেশি সময়ে (১১৯২-১৭২৯ খ্রীঃ) মোট একশো একত্রিশটি মন্দির মুসলিম সুলতান তথা লুন্ঠনকারীদের দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছে। সেসব মন্দিরগুলির মধ্যে, গুজরাটের সোমনাথ শিব মন্দির, অসমের গৌহাটিস্থিত কামাখ্যা মন্দির, উড়িষ্যার লিঙ্গরাজ মন্দির প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু মুসলমানরা ভারতে আসার আগেও এই মন্দিরভাঙনের ঘটনা ঘটত। কারা করত? অবশ্যই এদেশীয় মানুষরা, নিজেদের মধ্যে। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকার কলহনের বিখ্যাত 'রাজতরঙ্গিনী' থেকে জানা যায়, একাদশ শতকে কাশ্মীরের হিন্দুরাজা হর্ষ (১০৮৯-১১০১ খ্রীঃ) নিজের রাজকোষের বৃদ্ধির জন্য, বহু হিন্দু মন্দির লুন্ঠন করেন। কলহন লিখছেন:

কোনও গ্রাম, শহর বা নগরে এমন একটা মন্দির অবশিষ্ট ছিল না যার মূর্তি রাজা হর্ষের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি।

হর্ষের শাসনকালে, 'দেবোৎপাটননায়ক’ নামক একটি সরকারি পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল, এই জঘন্য কাজের দায়িত্ব পালন করার জন্য। দ্বাদশ শতকে গুজরাটের পারমার হিন্দু রাজারাও যেমন সুভাত বর্মন (১১৯২-১২১১ খ্রীঃ)সম্পদের লোভে ‘দাভয়’ ও 'ক্যাম্বে অঞ্চলের বহু জৈন মন্দির লুঠ করেন। আসলে, এই মন্দিরগুলো তৎকালীন সময়ে ধনসম্পদের অকল্পনীয় ভান্ডারে পরিণত হয়েছিল। চোলরাজ প্রথম একাই সুবিশাল তাঞ্চোর মন্দিরে, ৪১,৫৫৭ কলঞ্জু (প্রায় ৪৮৪ পাউন্ড) ওজনের স্বর্ণসামগ্রী, ১০,০০০ মন মণিরত্ন, সমপরিমাণ সোনাও ৫৭টি গ্রাম দান করেছিলেন। সোমনাথের মন্দির, ১০,০০০ গ্রামের রাজস্ব ভোগ করত, তেমনই নালন্দা ও বলভীর মঠ তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির প্রত্যেকে ২০০টি গ্রাম থেকে রাজস্ব পেত। ফলে, ধনসম্পদে পূর্ণ মন্দির ও ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলি ভারতীয় শাসক ও বিদেশী আক্রমনকারী, উভয়কেই আকর্ষন করেছিল।

আরও পড়ুন-

হিন্দু দেবতার দেখভাল করেন মুসলিমরা, ধর্মের ভেদাভেদ মিলেমিশে যায় বাংলার এই শিব মন্দিরে

কাশ্মীরের বেশ কয়েকজন রাজা মন্দিরের দেবতার সম্পদ কেড়ে নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে শংকর বর্মন (৮৮৩-৯০২খ্রীঃ) ৬৪টি শিব ও শক্তিপীঠ-এর মতো শৈব ও শাক্তক্ষেত্রগুলি লুঠ করেছিলেন। বৈষ্ণবভাবাদর্শে বিশ্বাসী মহারাজা শংকর, বিষ্ণু বা নারায়ণ ব্যাতীত অন্য যে-কোনও হিন্দু দেবতার পুজোকে অনৈতিক ও নিরর্থক বলে মনে করতেন। মহর্ষি শঙ্করাচার্য্য নিজের একাধিক লেখায় এমনটাই মতামত তুলে ধরেছেন, সম্রাট শঙ্করের ধর্মীয় ভাবনা ও মন্দিরধ্বংসগুলির প্রসঙ্গে। রাজা কলশ (১০৬৩-৮৯ সাল) নামক বকাটক বংশীয় গানপত্যমতাদর্শে বিশ্বাসী জনৈক রাজা, একাধিক সূর্যমন্দির ও দক্ষিণ ভারতীয় ‘আলোয়ার’ নামক ধর্মীয় গোষ্ঠীর আঁখড়া ধ্বংস করেছিলেন। বকাটক বংশীয় রানি শিরোমনি, তাঁর নিজের রাজত্বকালেও, বহু বৌদ্ধ মঠ থেকে বহু মূল্যবান মূর্তি ও অলঙ্কার লুণ্ঠন করেন।

আদি ও মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে হিন্দু রাজাদের নিজেদের মধ্যেকার লড়াইয়ের ফলে বেশ কিছু মন্দির বিনষ্ঠ হওয়ার উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন, ১. পল্লববংশীয় রাজা প্রথম নরসিংহ বর্মন (৬৩০-৬৬৮) চালুক্যদের রাষ্ট্রদেবতার মন্দিরের মূল-বিগ্রহ গণেশ মূর্তি ৬৪২ সালে লুণ্ঠন করেন। ২. চালুক্যরাজা ৬৯৩ সালে উত্তরভারতে অভিযান চালিয়ে, পরাজিত রাজাদের মন্দির থেকে একাধিক শাক্ত দেবীদের মূর্তির অলঙ্কার লুণ্ঠন করেছিলেন। উত্তরাখণ্ডে স্থিত, গঙ্গাদেবীর মন্দির সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করার পেছনেও চালুক্যরাজা পুলকেশীর নাম, আজও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে, নানা জনশ্রুতিতে বিদ্যমান। এবং গঙ্গামন্দির ধ্বংসের কারণ হিসেবে, পুলকেশীর দক্ষিনি গোদাবরী ও নর্মদা নদীকে গঙ্গা অপেক্ষা অধিকতর, পুন্যসলিলা নদী, এ-বিশ্বাসই ফলপ্রসু হয়েছিল বলে, ঐতিহাসিক লক্ষ্মী সুব্রমনিয়াম-এর ব্যাক্তিগত অভিমত। ৩. মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর শুঙ্গ রাজবংশীয় পুষ্যমিত্র অসংখ্য বৌদ্ধবিহার ভেঙে ফেলেছিলেন, বহু বৌদ্ধ ভিক্ষুককে নরবলিও দিয়েছিলেন। ৪.  অষ্টম শতকে, কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্যের (৬৯৯-৭৩৬) রাজ্যে হানা দিয়ে, বাংলার পাল রাজারা কাশ্মীর রাজাদের, রাষ্ট্রদেবতা ‘রামস্বামী’ নামক বিষ্ণুমূর্তি ও ‘চন্দ্রমৌলিক ঈশ্বর’ নামক শিবমূর্তি ভেঙে দেন বলে জানা যায়।  ৫. একাদশ শতকের প্রথমদিকে চোল রাজা প্রথম রাজেন্দ্র (১০১৪-১০৪২) বিভিন্ন রাজমন্দির থেকে বহু দেবমূর্তি লুঠ করেন। ৬. ওড়িশার গজপতি বংশীয় শাসক রাজা কপিলেন্দ্র, ১৪৬০ সালে তামিল রাজাদের রাজত্বে যুদ্ধাভিযান চালিয়ে একাধিক শৈব ও বৈষ্ণব মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। ৭. বর্গী আক্রমণকালে, বাংলার রাঢ় অঞ্চলের একাধিক শাক্তমন্দির ও বৈষ্ণবীয় মঠ আখড়াগুলি ধ্বংস হয়েছিল, যার সাক্ষ্য আজও বহন করে, বাঁকুড়ার একাধিক কৃষ্ণ মন্দির।

মহাকালী টেম্পল, ওয়ারাঙ্গল, তুলুভা শাসক নির্মিত

শৈবভাবাপন্ন মারাঠা শাসকেরা, শিবমন্দির ব্যাতিত, যে-কোনো মন্দিরকেই বিধ্বস্ত করতেন বলে, তৎকালীন এদেশীয় বহু জমিদার শাসক, একাধিক শিব মন্দিরের একেবারে কেন্দ্রে নিজেদের ‘দুর্গাদালান’ নির্মাণ করতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই শিবমন্দিরের আড়ালে বর্গী হামলা থেকে নিজেদের কূলদেবদেবীদের মন্দির তথা মূর্তিকে রক্ষা করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বীরভূম জেলার কড়িধ্যা অঞ্চলের একাধিক স্থানীয় শক্তিদেবীর মন্দিরগুলি ও বিষ্ণুমন্দিরগুলিকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে একাধিক ছোট-বড়ো শিবমন্দির।গড়পঞ্চকোট অঞ্চলের বহু কৃষ্ণ ও বিষ্ণু মন্দিরে, শিব ও বিষ্ণু যে এক ও অভিন্ন সে-ধারণার নানাচিহ্ন পোড়ামাটির কারুকার্যরূপে আজও সেখানকার বহু মন্দিরেরগাত্রে দেখতে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য ছিল মারাঠা আক্রমণ মূর্তিগুলিকে রক্ষা করা।

আরও পড়ুন-

মাটির তলায় মহাদেব।। উত্তরবঙ্গের জল্পেশ মন্দির আলাদা কেন?

মুঘলসম্রাট ঔরঙ্গজেব-এর শাসনকালে যেমন, কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস করা হয়, নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একাধিক শৈবসাধুকে। এ তথ্য যেমন সত্য, ঠিক তেমনই, বহু আগেও কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন  কালাচুরি বংশীয় শাক্তধর্মাবলম্বী শাসকগোষ্ঠী। কালাচুরি রাজা গঙ্গেয়াদের, বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংসের পরেই, ‘পরমহারাজধীরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন বলে, কন্নড় কাব্যসাহিত্য, বিরূপাক্ষ পণ্ডিতের ‘বিজ্জ্বলরায়চরি’-তে ও ‘চেন্নাসবপুরাণ’-এ উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি, খিলজি-বংশের শাসনকালে ওয়ারাঙ্গল (১৩১০) দক্ষিণভারতীয় অঞ্চলের যে ভদ্রকালী মন্দিরে অভিযান চালিয়ে, বহু সম্পদ লুণ্ঠন করেন, যার মধ্যে ‘কোহিনুর’-এর মতো জগৎবিখ্যাত হীরেও ছিল। ওয়ারাঙ্গালস্থিত সেই ভদ্রকালীমন্দিরেই খিলজি শাসনের বহুপূর্বেই, লুঠ ও ধ্বংসকার্য চালিয়েছিলেন ওড়িষ্যার গজপতি শাসককূল। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ধ্বংস বা লুণ্ঠনের পেছনে রাজাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জাগতিক সম্পদের লোভ।

এছাড়াও, মন্দির ধ্বংসের কারণরূপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিহ্ন স্যার রিচার্ড ইটন ও রোমিলা থাপা, উভয়েই তুলে ধরেছেন, তা হল এর পেছনে শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল আসলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা। কোনও এক অঞ্চলের শাসক যখন, অন্য অঞ্চলের রাজার কূলদেবতার মন্দির বা নগরদেবতার মন্দির ধ্বংস করত, তখন সে-অঞ্চলে আধিপত্য সহজেই প্রতিষ্ঠা পেত। কারণ, তৎকালীন জনমানসে রাজনৈতিকভাবে এমন বিশ্বাস ছিল, যে রাজা তাঁর কূলদেবতাকে রক্ষা করতে অসফল, সে নিজরাজ্যের সাধারণ প্রজাদের রক্ষা করতেও অপরগ। রিচার্ড ইটন অসংখ্য শিলালিপি, ঘটনাপঞ্জি ও বিদেশী পর্যটকদের বিবরণী পর্যালোচনা করে, এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছেন যে, মুঘল পিরিয়ডে যেসব মন্দিরগুলি ধ্বংস বা কলুষিত হয়েছে, সেগুলির পেছনে ধর্মীয় কারণের থেকেও বেশি ছিল দেশীয় রাজাদের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের বাসনা।

তথ্যসুত্র:

১.Temple Desecration and Muslim State in Medieval India. Richard M Faton/ lives of Indian images, Richard H Denis, P. 66-70.

২. An Introduction to the study of Indian History, DD Koshamki/ভারতে ইতিহাসচর্চার ভূমিকা, কেপি বাগাটি, পৃ. ৩০৮

৩. সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত ইতিহাস রচনা, জে পি বাগচি এন্ড কোম্পানি, পৃ. ৪৭

৪. রোমিলা থাপার, কমিউনিজম অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল লিগাসি, সাম ফ্যাক্টরস, জুন-জুলাই ১৯৯০, পৃ.১৩ 

More Articles