কেন বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘আয়-উপার্জনের উৎস’ বলছেন আন্দোলনের মুখপাত্র নিজেই?
Bangladesh Revolution : ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের এই লাইভে তিনি জানান, কীভাবে একটি ছাত্রভিত্তিক আদর্শিক আন্দোলন ধীরে ধীরে কিছু মানুষের জন্য ‘আয়-উপার্জনের উৎস’-এ পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের গণ অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই গণ অভ্যুত্থানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাল কাটছে। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ জুড়ে মভ সন্থাস চলছে, দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র ও সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা সম্প্রতি সেই আন্দোলন থেকে বিযুক্ত হওয়ার বার্তা দিয়েছেন সমাজমাধমে। তাঁর বক্তব্য জুলাই আন্দোলন এখন একটা 'মানি মেকিং-মেশিন' হয়ে গিয়েছে।
২৭ জুলাই দীর্ঘ ফেসবুক লাইভে আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আলোচনার ঝড় তুলেছেন উমামা। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘‘জুলাই কেন ‘মানি-মেকিং মেশিন’ হবে? আনফরচুনেটলি সেটা হয়েছে’’। ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের এই লাইভে তিনি জানান, কীভাবে একটি ছাত্রভিত্তিক আদর্শিক আন্দোলন ধীরে ধীরে কিছু মানুষের জন্য ‘আয়-উপার্জনের উৎস’-এ পরিণত হয়েছে। লাইভে উমামা স্পষ্ট করে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়াটা তাঁর জীবনের একটি ‘ট্র্যাজিক ঘটনা'। তাঁর মতে, প্ল্যাটফর্মটি আন্দোলনের চেতনাকে হারিয়ে ‘চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের’ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই মাসটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা। আমি কখনো ভাবিনি যে একটা ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে এত বড় টাকার খেলা হতে পারে। মুখপাত্র হওয়ার পর প্রথম বুঝতে পারি, মানুষ কীভাবে এই প্ল্যাটফর্ম দিয়ে ব্যক্তিগত লাভ তুলছেন।’
উমামা দাবি করেন, আন্দোলনের নামে টেন্ডার বাণিজ্য, ডিসি নিয়োগে তদবির এবং বিভিন্ন প্রকল্পে ‘দখলদারি’ চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘৫ অগস্টের পরদিন থেকেই অনেকে ‘সমন্বয়ক পরিচয়’ ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গা দখল করতে শুরু করেন। কেউ কেউ এই পরিচয়ে সরকারি দফতরে গিয়ে তদবির করে, চাঁদা তোলে। আমি ভেবেছিলাম, এটা কি রক্ষীবাহিনীর মতো ‘সমন্বয়কবাহিনী’ তৈরি হচ্ছে নাকি!’ লাইভের একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে উমামা বলেন, ‘আমাকে ডেকে এনে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। আমি টিস্যু পেপার না। ন্যূনতম আত্মসম্মান আছে এমন কেউ এই প্ল্যাটফর্মে টিকে থাকতে পারবে না।’
আরও পড়ুন- বাংলাদেশের সমাজতন্ত্রের যাত্রায় সিরাজুল আলম খানের স্থানাঙ্ক, ৪য় পর্ব
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই-অগস্টে যাঁরা আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিল, তাঁদের কেউ কেউ এখন এমন সস্তা কাজ করছে, যেটা মেনে নেওয়া যায় না। আমি যদি একা কিছু করতাম, তাহলে আরও ভালো কিছু করতে পারতাম।’ উমামার অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মের বড় বড় সিদ্ধান্ত হতো ‘হেয়ার রোডে’, অর্থাৎ উপদেষ্টাদের ঘরে। তিনি বলেন, ‘আমি পুরো প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলাম। সবকিছু এতটাই অগোছালো ছিল যে মাসের পর মাস আমি মানসিক চাপে ছিলাম।’ চট্টগ্রাম-সহ বিভিন্ন জেলার অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো জেলার কাহিনি ধরলেই দেখা গেছে ব্যাপারটা অনেক দূর অবধি গড়িয়েছে। সঠিক কোনো কাঠামো না থাকায় এসব ধরাও সম্ভব হয়নি।’
উমামা বলেন, ‘আমি ভালো পরিবারের মেয়ে। আমি জীবনে কখনো টাকার জন্য আন্দোলনের মতো প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করার কথা ভাবিনি। অনেকে বলেন, আমি হাজার কোটি টাকা কামিয়েছি- এই অভিযোগ আসলে ভিত্তিহীন। আমি স্বচ্ছল পরিবার থেকে এসেছি, স্কলারশিপ পাই নিজের যোগ্যতায়, আর পরিবারেরও পূর্ণ সমর্থন আছে।’ লাইভে তিনি জানান, ৩১ ডিসেম্বর যে জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার কথা ছিল, সেটি আচমকাই বাতিল করা হয়। এরপর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি শুনতে পান, আন্দোলনের নেতারা দল গঠনের পথে এগোচ্ছে।এই প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত হতে চাননি। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে প্ল্যাটফর্মের কয়েকজন তাঁকে ফের যুক্ত করতে চাইলেও, একপর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধেই ‘প্ল্যাটফর্ম দখলের’ অভিযোগ তোলা হয়।
উল্লেখ্য, কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র অনেক নেতার বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজি বা অবৈধ আর্থিক লেনদেন-সহ নানা ধরনের অভিযোগ সামনে আসছিল। এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সংগঠনটির অনেকেই অভিযোগও তুলেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের এখনও একবছরও হয়নি। তার মধ্যেই সামনে এসেছে এই সব কর্মকাণ্ড। শুরু হয়েছে জল্পনা। আবার উমামার দাবির রেশ কাটতে না কাটতেই অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সাড়ে ৬ কোটি টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে। যদিও তিনি তাঁর ফেসবুক পেজে এই নিয়ে পাল্টা পোস্ট করে দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আসলে 'ষড়যন্ত্র'।
আরও পড়ুন- এক কথায় বীভৎস! কী রয়েছে বাংলাদেশের গুম সংক্রান্ত কমিশনের রিপোর্টে?
এর আগে ঢাকার গুলশানে সাবেক এক এমপির ঘরে সমন্বয়ক পরিচয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার মতো ঘটনা ঘটেছিল। যা নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়। এমনকি ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাঁদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এখনও তাঁদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪-এর মাঝামাঝি থেকেই বাংলাদেশের তৎকালীন হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে - তিস্তা প্রকল্প, কোটা বিরোধী আন্দোলন, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পেনশন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছিল। এরই মধ্যে কোটা সংস্কার নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় দিয়ে দিয়েছিল। এর পর থেকে টানা আন্দোলন ও অবরোধের মতো কর্মসূচি করে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে লেগে পড়েছিল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১,৪০০। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো আন্দোলনে এত কম সময়ে এত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আন্দোলন তীব্র হলে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
তারপর থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি, নির্বাচন-সহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আনবে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্তিতে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ৪০ মিনিট ভাষণ দিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। ভাষণে বলেছিলেন, শুধু জুলাই-অগস্টের হত্যাকাণ্ডেরই নয়, গত দেড় দশক যে অপকর্ম করেছে হাসিনা সরকার সে সব কিছুরও বিচার হবে।
প্রশ্ন উঠছে, দলের ভিত কি নড়বড়ে? বৈষম্যবিরোধীরা আসলে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন? তাই যদি হয়, কার উপর বিশ্বাস রাখবে বাংলাদেশের মানুষ?