বাস্তিল দুর্গের পতন আজও কেন প্রাসঙ্গিক?

Bastille Castle: দুর্গটির নির্মাণ হয়েছিল নিরাপত্তার প্রয়োজনে। ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের মধ্যে সংঘটিত শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সময় দুর্গটি নির্মিত হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল, সম্ভাব্য ইংরেজ আক্রমণ থেকে প্যারিসের পূর্ব দিকের পথকে রক্ষ...

ফ্রান্সের জাতীয় দিবস ১৪ জুলাই। এই তারিখটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসের কথা ভাবলে মনে পড়ে যায়   স্বৈরাচারিতার কথাও। স্বৈরাচারিতা মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। কী হয়েছিল সেদিন? বলছি। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজারা হয়ে উঠেছিলেন চরম স্বৈরাচারী। বুরবোঁরাজ চতুর্দশ লুই ঘোষণা করেছিলেন: ‘আমিই রাষ্ট্র’। তখন থেকেই ফ্রান্স পরিণত হয়েছিল ‘রাজনৈতিক কারাগার’-এ। বুরবোঁ রাজাদের স্বৈরাচারিতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল প্যারিসে অবস্থিত বাস্তিল দুর্গ।

এই দুর্গটির নির্মাণ হয়েছিল নিরাপত্তার প্রয়োজনে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সংঘটিত শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সময় (১৩৩৭-১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ) দুর্গটি নির্মিত হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল, সম্ভাব্য ইংরেজ আক্রমণ থেকে প্যারিসের পূর্ব দিকের পথকে রক্ষা করা। ১৩৫৭ সাল নাগাদ এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু হলেও বাস্তিল দুর্গের মূল নির্মাণপর্ব শুরু হয় ১৩৭০ সাল নাগাদ। সেই সময় ফ্রান্সের শাসক ছিলেন পঞ্চম চার্লস। সম্ভবত, পঞ্চম চার্লসের  মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ষষ্ঠ চার্লস বাস্তিল দুর্গের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। আটটি  টাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে উঠেছিল এই দুর্ভেদ্য দুর্গটি। এই টাওয়ারগুলির মধ্যে যে ছ-টি টাওয়ার নতুন তৈরি হয়েছিল সেগুলির প্রতিটির গোড়ায় ছিল ভূগর্ভস্থ অন্ধকূপ। ঐতিহাসিক সিডনি টয় তৎকালীন সময়ের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দুর্গগুলির মধ্যে অন্যতম হিসাবে বাস্তিল দুর্গকে অভিহিত করেছেন।

আরও পড়ুন-

ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চার আলোকে পলাশীর যুদ্ধ ও সিরাজদ্দৌলা  

পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাস্তিল একটি রাজকীয় দুর্গ হওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর অভ্যন্তরে এক নিরাপদ আশ্রয়স্থলের ভূমিকা পালন করত। সেই সঙ্গে, এই দুর্গটি প্যারিসে প্রবেশ ও বেরোনোর পথকে নিয়ন্ত্রণও করত। এই সময়, এখানে মাঝে মাঝে বন্দিদের আটক করে রাখা হত। একাদশ লুই-এর রাজত্বকাল থেকেই বাস্তিল কারাগার হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। তবে ঐতিহাসিকরা জানাচ্ছেন, কারাগার হওয়া সত্ত্বেও এখানে রাজকীয় দুর্গের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলিরও আয়োজন করা হত।

বাস্তিল দুর্গের স্কেচ

ষোড়শ শতকে বাস্তিলের দক্ষিণে রাজকীয় সেনাবাহিনীর জন্য কামান ও অন্যান্য অস্ত্রসহ একটি বৃহৎ অস্ত্রাগার নির্মিত হয়। সপ্তদশ শতকে ত্রয়োদশ লুই-এর মন্ত্রী কার্ডিনাল রিচেলিউ রাষ্ট্রীয় কারাগার হিসেবে বাস্তিলের কাঠামোগত ব্যবহার বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফরাসিরাজ চতুর্দশ লুই বাস্তিলের চারপাশের এলাকা পুননির্মাণ করেছিলেন। তিনি এই দুর্গটিকে ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। কেবল সন্দেহভাজন বিদ্রোহী বা চক্রান্তকারীই নয়, ধর্মীয় বিষয়ে মতবিরোধের কারণেও বহু মানুষকে এখানে আটক করে রাখা হত। পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুই-এর সময় বাস্তিলে বন্দির সংখ্যা হ্রাস পেলেও দুর্গটি বৃহত্তর পুলিশি-ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। ‘লেত্রে-দ্য-ক্যাশে’ আইনের দ্বারা বহু মানুষকে গোপনে দীর্ঘদিনের জন্য বিনা বিচারে বন্দি রাখা হত এই বাস্তিল দুর্গের কারাগারে।

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম ঘটনা ছিল ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতন। ফ্রান্সের উন্মত্ত জনতা সেদিন বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে, দুর্গের গভর্নর দ্য লোনে-কে হত্যা করে এবং দুর্গের দখল নিয়ে নেয়। এর ফলে, পতন ঘটে স্বৈরাচারী শাসনের প্রতীক বাস্তিল দুর্গের। দুর্গ-পতনের সংবাদে রাজা ষোড়শ লুই বলেছিলেন: ‘That is a revolt’ । এর উত্তরে রাজার এক সহচরের বলা কথাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাজার সহচর তখন বলেছিলেন, ‘Sir, it is not a revolt, it is a revolution’। 

আরও পড়ুন-

কৃষ্ণচন্দ্রই সনাতনীদের উদ্ধারকর্তা? কী বলছে ইতিহাস?

আজ একবিংশ শতকে, সভ্যতা নানা দিক থেকে উন্নত। রাষ্ট্রের হাতে বহু আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম। বিজ্ঞানের বিকাশ, আকাশ-ছোঁয়া। মুঠোফোনের দৌলতে মুহূর্তে এক দেশ থেকে অন্য দেশের অন্দরমহলে আমরা পৌঁছে যাচ্ছি। অথচ আমাদের স্বৈরাচারী প্রবৃত্তির কি পরিবর্তন হয়েছে? আমরা কি অপরদিকে থাকা মানুষটির ওপর নিজেদের ইচ্ছার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি না? দিচ্ছি। বাস্তিল দুর্গে এগারো বছর যাবৎ বন্দি-থাকা কনস্টান্টিন ডি রেনেভিল তাঁর কারাগার-জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছিলেন। নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ওপরে বাস্তিল-এ অকথ্য অত্যাচার করা হয়। তাই হয়তো, ভলতেয়ার এই দুর্গটিকে বলেছিলেন ‘প্রতিশোধের প্রাসাদ’। বর্তমানেও দেখা যায় কখনো পরিবার, কখনো সমাজ, আবার কখনো রাষ্ট্র, নৃশংসতার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে বারংবার নির্যাতনের শিকার-হওয়া ছেলেটির কাছে কলেজ হস্টেলটি বাস্তিলের দুর্গ অপেক্ষা কম কিছু নয়! একজন গৃহবধূ, দেরাজে সযত্নে রাখা ঘুঙুরটি হাতে তুলে নিয়ে কপালে ঠেকায় আর ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলে ‘পরের জন্মে নিজের ইচ্ছাপূরণের অধিকারটুকু দিও।’ রান্নাঘর থেকে ডাক আসে। সে তার ভালোলাগাকে, তার স্বপ্নকে তালা বন্ধ করে তড়িঘড়ি পা বাড়ায় সাংসারিক জীবনে। এই তরুণীটির কি কখনো-কখনো তার সংসারের দায়-দায়িত্বকে বাস্তিল দুর্গের সমতুল্য মনে হয় না? সমাজের ভয়ে মনের মধ্যেকার নারীত্বকে দীর্ঘদিন গোপন করে রাখার পর একদিন যখন ছেলেটি তার নারীত্বকে বাইরে বাইরে আনে, তখন রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো অন্য ছেলেরা, যারা একসময়ে ওই ছেলেটির সহপাঠী ছিল, তারাই তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে শুরু দেয়। বাস্তিল দুর্গের কারাগারে বন্দি ব্যক্তিস্বাধীনতাহীন মানুষগুলোর মতো আমাদের সমাজের কত মানুষই আটকে আছেন এক অঘোষিত কারাগারে ভেতর। 

বাস্তিল দুর্গ

 রাষ্ট্র কি তাদের সেই ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম? রাষ্ট্র যদি নাগরিক অধিকারের রক্ষকই হয় তবে হকের চাকরিটা কেন বিক্রি হয়ে যায়? নিজ-নিজ ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে অনেক সময় আক্রান্ত হতে হয় কেন? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। আজ থেকে প্রায় দু-শো ছত্রিশ বছর আগে বাস্তিল দুর্গের পতন হয়েছিল। সেদিন যেমন প্যারিসের, ভার্সাইয়ের জনতা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল স্বৈরাচারিতার অহংকারকে, পতন ঘটিয়েছিল বাস্তিল দুর্গের, তেমনই যেদিন আমরা নিজেদের অধিকারের কথাগুলি জোরের সঙ্গে বলতে পারব, সেদিন হয়তো অন্ধকার কিছুটা কাটবে!

More Articles