এদেশে 'সাইয়ারা'-র মতো ছবি আরও বেশি কেন বানানো উচিত?
Saiyaara : ছবিটির নাম ‘সাইয়ারা’। উন্মুক্ত হিংসার বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যেই দেশের তরুণ প্রজন্মের অন্তরকে এই ছবিটি বেশ নাড়িয়ে দিয়েছে।
একটা ছায়াছবি, যা ‘কিসসা কুর্সি কা’ বা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’-র মতো বিতর্কিত নয়। আদ্যোপান্ত নির্ভেজাল ভালোবাসার ছবি। ছবিটির নাম ‘সাইয়ারা’। উন্মুক্ত হিংসার বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যেই দেশের তরুণ প্রজন্মের অন্তরকে এই ছবিটি বেশ নাড়িয়ে দিয়েছে। ছবি চলাকালীন প্রেক্ষাগৃহের মধ্যেই দর্শকদের কান্না এক শ্রেণির কাছে বিদ্রুপের বিষয় হয়ে উঠেছে। আগে ব্যক্তির জীবনযাপনে সমাজের নাক গলানো বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিল। এখন কাঁদতে গেলেও সমাজের অনুমতি নিতে হচ্ছে। ব্যক্তি জীবনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাওয়া-পাওয়াও নিয়ন্ত্রণ করবে সমাজ? এ তো আসলে অনধিকার চর্চা!

'সাইয়ারা'-র পোস্টার
স্বাধীন ভারতের ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে সমাজের মধ্যে যখনই হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি তীব্র পর্যায় উন্মোচিত হয়েছে তখনই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ভালোবাসার গল্প দিয়ে গড়ে তোলা প্রেমের ছায়াছবিকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছে। নব্বইয়ের দশকে বাবরি মসজিদ ধ্বংস, মুম্বাই বিস্ফোরণ ও দাঙ্গা, অশান্ত হয়ে ওঠা কাশ্মীর উপত্যকা আবহের মধ্যেই শাহরুখ খান অভিনীত ‘দিলবালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-র মধ্যে মানুষ প্রেমময়তার আশ্বাসকে খুঁজে পেয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ ও কান্দাহার বিমান অপহরণকাণ্ডের ঠিক পরের বছর মুক্তি পায় ‘কহনা পেয়ার হে’। সে-সময় বলিউড পেয়েছিল হৃত্বিক রোশনকে।
আরও পড়ুন-
খোলনলচে বদলালেই একমাত্র বাঁচতে পারে বাংলা ছবি
প্রেমিক নায়ক হিসেবে তাঁর উন্মাদনা সেই সময় তুঙ্গস্পর্শী পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। বলিউডের ধারাবাহিক ইতিহাস ঘাটলে লক্ষ্য করা যাবে ১৯৬৯ সালে দেশজুড়ে যখন অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঠিক সেই সময় রাজেশ খান্না ও শর্মিলার ঠাকুরের ‘আরাধনা’ মানুষের ক্রমাগত জীবন সংগ্রামের মধ্যে মরুদ্দ্যানের মতন কাজ করেছিল।

'দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে'
সাম্প্রতিক সময় বলিউডে প্রোপাগান্ডামূলক ছায়াছবির ভিড়ে প্রেমের ছবিগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করেছিল। বিক্ষিপ্ত ভাবে কয়েকটি ছবিকে বাদ দিলে বেশিরভাগ হিন্দি ছবি অনেকটা হয়ে উঠেছিল মাংসের দোকানের মতো। যেখানে শরীরের তীব্র যৌন আবেদন ও অপরিসীম হিংসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় ‘সাইয়ারা’-র মতন ছবি মাংসের দোকানের মধ্যে একটা গোলাপ ফুল হয়ে যেন প্রস্ফুটিত হল। ‘সাইয়ারা’ আবারও প্রমাণ করে দিল যে মানুষ আজও হৃদয়ের অকৃত্রিম আন্তরিক অনাবিল অবিশ্রান্ত ভালোবাসার প্রতি আস্থা রেখেছে। ভালোবাসা মানে কেবল যৌনতা নয়। প্রেম আসলে একে-অন্যকে আগলে রাখাও। মানব-মানবীর সম্পর্কে বিরহ অভিসার থাকবে। আর সেটাই মানুষের চোখটাকে ভিজিয়ে দেয় প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে। আর যারা সেই শর্তহীন ভালোবাসার প্রতি বিদ্বেষ ছিটিয়ে দেয় তারা আদতে মানবতার শত্রু।

'কাহোনা প্যার হে'
নিন্দুকেরা বলতেই পারে, ছবিটির গল্প বিদেশি ছবির অনুকরণে বানানো হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আমাদের দেশে বিশেষ করে হিন্দি ছবির সিংহভাগ ছবি এই পদ্ধতিতে তৈরি হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষের মনকে ‘সাইয়ারা’র ছুঁয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে পরিচালকের গল্প বলার মুন্সিয়ানা। প্রথমদিকে ধীর গতির হলেও পরবর্তীতে ছবিটি চিত্রনাট্য টানটান উত্তেজনায় ভরে ওঠে। সারা সপ্তাহের পরিশ্রমের পর প্রতিটা মানুষের মধ্যে যে জীবনানন্দ বসত করে তারা এই ছবিটির মধ্যেই ভালোবাসার বনলতাকে খুঁজে পেয়েছে। সমস্ত দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে ভালোবাসার আশ্রয় মানুষ যেতে চায়। আর সেখানে এই ছায়াছবিটি বাজিমাত করে গেছে।
আরও পড়ুন-
বাংলা সিনেমার উচ্চতা থেকে পতন নিয়ে দু’চার কথা
বাংলা ছবিতেও এমন নিদর্শন রয়েছে। ষাটের দশকে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া বাংলায় ‘সপ্তপদী’-র রোমান্টিসিজম তরুণ বাঙালি মনকে আন্দোলিত করে দিয়ে গিয়েছিল। এমনকি ৯০-এর দশকের শুরুর দিকে চিরঞ্জিত অভিনীত ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ দেখে অশ্রু প্লাবিত হয়েছিল পল্লী বাংলার দুই চোখ। শূন্য দশকের শেষের দিকে রিজানু, তাপসী মালিক, সিঙ্গুরে কৃষক আন্দোলন, নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি, নেতাইয়ে দলীয় হিংসার আবহে রাজ চক্রবর্তীর পরিচালিত ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ এবং তার পরবর্তীতে ছবি ‘প্রেম আমার’ সেই সময় তরুণ মনকে অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে ভালোবাসার আশ্বাস দিতে চেয়েছিল।

'বেদের মেয়ে জোসনা'
তখনও মানুষ চোখে জল নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হত। ফলে আজকে যারা ভালোবাসার প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে চলেছে আর চোখের জলের প্রতি যারা তীব্র ব্যঙ্গ করছে তারা আদতে নিজেদের নেতিবাচক মনোভাবেরই উদাহরণ দিয়ে চলেছে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে আপনাকে টর্চ লাইট দিয়ে যে ব্যক্তি অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আসন দেখিয়ে দিচ্ছে, যে কাউন্টার থেকে আপনি টিকিট কাটছেন তার মধ্যে বসে থাকা ব্যক্তিটিরও সংসার দাঁড়িয়ে এইসব সিনেমার সাফল্যের ওপর। কলকাতা সহ রাজ্যের অন্যান্য শহরে একটা প্রেক্ষাগৃহকে ঘিরে একটা অর্থনীতি কাঠামো গড়ে ওঠে। কারণ সেখানে মানুষের সমাগম বেশি। হল-এর বাইরে যারা বিরিয়ানি-ডিমটোস্ট-বাটার টোস্ট রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করছে তাদের সংসারটা সুন্দরভাবে চলে যখন অন্ধকার মায়াবি প্রেক্ষাগৃহ জনগণের কলতানে ভরে ওঠে।
‘সাইয়ারা’ সাধারণ মানুষের ছবি। সাধারণ প্রেমের গল্প কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে,তার গল্প। যে গল্পের ভেতর অনেকেই তাঁদের জীবনের খণ্ড খণ্ড সময় চিত্রকে খুঁজে পাচ্ছেন। চোখ জলে ভরে যাচ্ছে তাঁদের। দর্শকের এই কান্না, সিনেমার সংযোগের সার্থকতাকেই প্রমাণ করে!