মাটির তলায় মহাদেব।। উত্তরবঙ্গের জল্পেশ মন্দির আলাদা কেন?
Jalpesh Temple: বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বর্ষা এলেও, উত্তরবঙ্গে বর্ষার আগমন ঘটে কিছু সময় পরে। শ্রাবণ মাসে না-শীত না-গরম—এই আলোছায়ার দোলাচলের মধ্যেই আসে এক বিশেষ তিথি, যার নাম: শ্রাবণী পূর্ণিমা।
এক বৈচিত্রময় জেলা, জলপাইগুড়ি। আয়তনে খুব ছোটো হলেও নানাভাবে অনন্য। পাহাড়, সমতল, জঙ্গল, পাহাড়ি নদ-নদী নিয়ে এক মহাসমারহে পশ্চিমবাংলার মাটিতে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। মূলত মেচ, রাভা, টোটো, গারো, লিম্বু প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়-সহ রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছেন। যে-কারণে এখানে অনেক লৌকিক দেবদেবীর পূজার প্রচলন দেখা যায়। পাশাপাশি বাদ পড়েন না পৌরাণিক দেবদেবীরাও। সাড়ম্বরে পালিত হয় দুর্গাপূজা, কালীপূজা, শিবপূজার মতো বাঙালির পার্বণগুলো। সকল শ্রেণির, সকল সম্প্রদায়ের মানুষ, আদিবাসী সমাজ ও রাজবংশী মানুষজন, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সামিল হন এইসব উৎসবে।
আরও পড়ুন-
হিন্দু দেবতার দেখভাল করেন মুসলিমরা, ধর্মের ভেদাভেদ মিলেমিশে যায় বাংলার এই শিব মন্দিরে
বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বর্ষা এলেও, উত্তরবঙ্গে বর্ষার আগমন ঘটে কিছু সময় পরে। শ্রাবণ মাসে না-শীত না-গরম—এই আলোছায়ার দোলাচলের মধ্যেই আসে এক বিশেষ তিথি, যার নাম: শ্রাবণী পূর্ণিমা। এই তিথিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়, ‘বাবার মাথায় জল ঢালার পর্ব’। সারা মাস রাস্তায় দেখা যায়, কপালে ত্রিশূল-আঁকা, পরনে হলুদ-গেরুয়ার ফতুয়া, মাথায় 'জয় বাবা মহাদেব' লেখা ফিতে বেঁধে সানন্দে ভক্তরা চলেছেন মহাদেবের কাছে। কেউ গাড়িতে, কেউ-বা মোটরসাইকেলে, মোটর ভ্যানে কিংবা ব্যক্তিগত কোনও যানবাহনে চড়ে দলবেঁধে চলেছেন সবাই। কৌতূহল জাগে, সকলে কোথায় যাচ্ছেন? যাচ্ছেন, জল্পেশ মন্দিরে, যা জলপাইগুড়ি জেলার এক প্রাচীনতম আরাধনাক্ষেত্র!

মন্দিরের প্রবেশদ্বার
জল্পেশ মন্দির এই জেলায় ময়নাগুড়ি ব্লকের অন্তর্গত একটি প্রাচীনতম মন্দির। মন্দিরটি কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের পিতা বিশ্ব সিংহ ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন। জনশ্রুতি থেকে জানা যায় প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা জল্পেশ, মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এবং তাঁর নাম অনুসারেই মন্দিরটির নাম হয়: জল্পেশ মন্দির। এই মন্দিরের পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে জর্দা নামক এক পাহাড়ি নদী। ময়নাগুড়ি থেকে টোটো করে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে চেপে আট-দশ কিলোমিটার ভিতরে এই মন্দিরে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। আবার জলপাইগুড়ি শহর থেকে তেইশ-চব্বিশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেও এখানে চলে আসা কঠিন নয়। মূল মন্দিরটি তিন রত্ন বিশিষ্ট ও মন্দিরের পাশেই একটি একরত্ন মন্দির রয়েছে এবং এই সংযুক্ত মন্দিরগুলিতেও মহাদেবেরই পূজা করা হয়।

মাটির তলায় মহাদেব
মন্দিরটি গঠন ইসলামিক প্রভাবযুক্ত। মন্দিরে, সুন্দর, সাদা, গম্বুজ ও খিলানযুক্ত স্থাপত্য নকশা চোখে পড়ে। মূল মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে অনেক নীচে নেমে তারপর মহাদেবের কাছে পৌঁছনো যায়। এখানে মহাদেব মাটির অনেকটা নীচে অবস্থান করছেন, ফলে উপর থেকে দেখা যায় না। মাথা নামিয়ে ঝুঁকে তাঁকে দর্শন করতে হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ মূল মন্দিরে প্রবেশের ভেট ধার্য করেছেন কুড়ি টাকা। টিকিট কেটে তবেই মন্দিরে প্রবেশ করা যায়। মূল মন্দিরের পাশেই মানত রাখার একটি জায়গা রয়েছে। বেদির রেলিং-এ সুতো বেঁধে ভক্তরা মানত করেন। এই মন্দিরে মহাদেব, 'অনাদি' নামে পরিচিত।
মন্দিরটি ১৫২৪ সালে নির্মিত হলেও, পরে বেশ কয়েকবার মন্দিরটিকে সংস্কার করাহয়েছে। জানা যায়, ১৫৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। একশো বছর পর, প্রাণ নারায়ণ ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করেন। এরপর কোচবিহারের রাজা লক্ষ্মীনারায়ণের রাজত্বকালে কোচ রাজবংশের বশ্যতা অস্বীকার করার পর ১৬২১ খ্রিস্টাব্দে মহিদেব রাইকত তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কোচ রাজাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে অস্বীকার করেন। এরপর থেকে মন্দিরটি বৈকন্ঠপুরের নায়িকা গোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে ছিল। ১৮৯৯ সালের ৩০ জানুয়ারি রাজা যোগেন্দ্রদেবের স্ত্রী রানি জগদেশ্বরী দেবী মন্দিরটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
আরও পড়ুন-
হিন্দু শিব মন্দিরে মেলে জৈন ছোঁয়া, কীভাবে ‘বাঁকুড়া’ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক্তেশ্বর?
জল্পেশ মন্দিরে প্রধান উৎসব বছরে দু-বার হয়। প্রথম উৎসব হয় শ্রাবণ মাসে, মহাদেবের মাথায় জল ঢালা তিথিতে। ভক্তরা নালিনী (তিস্তা) নদী থেকে জল নিয়ে পনেরো কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে মহাদেবের কাছে আসেন। এই উপলক্ষ্যে ছোটো একটা মেলা বসে। আর, সবচেয়ে বড়ো উৎসব হয় মহাশিবরাত্রির চতুর্দশী তিথিতে। এই তিথিকে ঘিরে প্রায় এক মাস যাবৎ মেলা বসে। মেলায়, মূল মন্দির থেকে দু-তিন কিলোমিটার দূর পর্যন্ত রাস্তার দু-পাশ জুড়ে দোকান বসে। প্রায় জনবসতিহীন এক নির্জন স্থানে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন সামিল হন। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এই মেলায়। এই মেলা সমগ্র উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম মেলা। জানা যায়, ডুয়ার্স যখন ভুটানের অংশ ছিল তখন ময়নাগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলের ব্যবসাবাণিজ্য চলত। ফলে, এই মেলার বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অসীম। শোনা যায়, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগে এখানে হাতিও বিক্রি হত। এখনও নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং দেশের অন্যান্য নিকটবর্তী রাজ্যের লোকেরা এই মেলায় আসেন।
জল্পেশ মন্দিরটি যেহেতু খুবই প্রাচীন ও অনেকের মতেই ‘জাগ্রত’ তাই এই মন্দিরকে ঘিরে উত্তরবঙ্গের মানুষের যথেষ্ট আবেগ জড়িয়ে আছে। মহাশিবরাত্রি তিথিতে যে-মেলা বসে, তা এখানে ‘জল্পেশের মেলা’ নামে পরিচিত। উত্তরবঙ্গে এমন প্রত্যন্ত এলাকা রয়েছে যেখানে শিক্ষার আলো ঠিক মতো এখনও পৌঁছয়নি। সেখানে সাধারণ মানুষ জঙ্গল, পাহাড়কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে, তাঁদের খাদ্যাভ্যাস, পোশক-পরিচ্ছদ, ভাষা— এগুলোই বলে দেয় তাঁরা এখনও বাংলার সংস্কৃতির মূল স্রোতে গা মিলিয়ে চলতে পারেনি, বা বলা ভালো অনেক অর্থে তাঁরা চান না এই মূল স্রোতের সংযুক্ত হতে। তাঁরা নিজেদের সমাজ তৈরি করেছেন। জল্পেশ মন্দিরকে ঘিরে তাঁদের জীবনে বছরে অন্তত একবার যে সংস্কৃতির আনন্দ, তা তাঁদেরকে অন্তরকে ছুঁয়ে যায়! এ-এক পরম পাওয়া। এ-পাওয়া সামনে-থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। ফলত, উত্তরবঙ্গের মানুষ তথা আদিবাসী সমাজের মানুষজন, চা-শ্রমিকদের কাছে এই মন্দির বেঁচে থাকার এক বিশেষ আশ্রয়ের মসেস!