আবারও ফিরেছে 'কালাপানি'! সরকারের বিরুদ্ধে কথা মানেই হাজতবাস, একেই বলে আজাদি
জনতার দ্বারা নির্বাচিত স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকার। তাহলে আজও এই দেশে কেন গলা তুলে ক্ষমতাকে সত্যি কথাটা শোনাবেন না সাংবাদিকরা? কেন ভারভারা রাওদের দমন করা হবে?

ব্রিটিশ শাসনে 'কালাপানি’ দেখেছে দেশ। কালাকানুন আজ অতীত। সত্যি?
স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর পার করেছে দেশ। আজ দেশে স্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকার। জনতার দ্বারা নির্বাচিত স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকার। তাহলে আজও এই দেশে কেন গলা তুলে ক্ষমতাকে সত্যি কথাটা শোনাবেন না সাংবাদিকরা? কেন ভারভারা রাওদের দমন করা হবে? দেখানো হবে জেলের পথ? এরপর কালা কানুনের সঙ্গে তুলনা আসা কি অবান্তর? স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পালন করছে দেশ। দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার এই চেষ্টা খারাপ কী? কিন্তু দেশের বিবেক জেগে উঠলে, তা দমন করার নির্লজ্জ প্রয়াস দেখতে হবে! স্বাধীনতার এত বছর পরে এমন দিন দেখার ছিল? মধ্যপ্রদেশ পুলিশ সাংবাদিক-নাট্যকর্মীদের অর্ধনগ্ন করে হেনস্থা করে। এই ঘটনা শুধুমাত্র একটা দেশকে কলঙ্কিত করে না, বরং একটা সুস্থ সমাজের বিবেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। দেশের অন্তর দিয়ে বয়ে যাওয়া চোরাস্রোত বহন করছে কত সাংবাদিক আর সমাজকর্মীর হেনস্থার যন্ত্রণা! স্বাধীনতার ৭৫ কি তাহলে ক্যালেন্ডারের কতগুলি পাতা উল্টে যাওয়া? দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি সমাজের চোখ খুলবে না এইসব ঘটনা-পরম্পরা?
সাংবাদিক-নাট্যকর্মীদের অর্ধনগ্ন করে হেনস্থা
খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। এই বছরের এপ্রিল এমনই এক নির্লজ্জ ঘটনার জন্ম দেয়। একদল সাংবাদিক ও নাট্যকর্মীকে জামাকাপড় খুলিয়ে অন্তর্বাস পরিয়ে মধ্যপ্রদেশের এক পুলিশ স্টেশনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এই ছবি সামনে আসতেই উত্তাল হয় সোশ্যাল মিডিয়া। ওই ছবিতে সনাক্ত করা গিয়েছে, এক স্থানীয় সাংবাদিক তথা ইউটিউবারকে। অভিযোগ, তাঁকে হেনস্থা করা হয়, মারধর করা হয়, পুলিশকর্মীদের দ্বারা তাঁর জামাকাপড় খোলানো হয়। সাংবাদিকের অপরাধ তিনি স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের বিরুদ্ধে করা প্রতিবাদের খবর করতে গিয়েছিলেন। জানা গিয়েছে, ওই সাংবাদিক সিদ্ধি জেলার নাট্যকর্মী নীরজ কুন্দারের গ্রেফতারের খবর করতে গিয়েছিলেন। স্থানীয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক কেদারনাথ শুক্লা এবং তাঁর ছেলে গুরু দত্ত সম্পর্কে ভুয়ো ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন।
তিহার জেলে বন্দি ছিলেন মহম্মদ জুবের
অল্ট নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ জুবের। তাঁর বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার কয়েকটি অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁকে কাটাতে হয় তিহার জেলে। সুপ্রিম কোর্টে সেই সবক'টি মামলাতেই জামিন পেলেও মহম্মদ জুবেরকে জেলের ভাত হজম করতে হয়েছে। পরে আদালত এইসমস্ত মামলা দিল্লিতে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, একটি অদ্ভুত বৃত্তের মধ্যে পড়ে গিয়েছে প্রশাসন। সেই বৃত্তের মধ্য থেকেই একটি কেসে মুক্তি পেলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য আরও একটি কেসে জামিন আটকে দেওয়া হচ্ছে, মহম্মদ জুবেরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার একাধিক অভিযোগ ছিল। ভুয়া খবরের সত্যতা জানানো এবং সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পেশাগত ধর্ম পালন করায় তাঁকে কি দেখানো হয় জেলের পথ?
প্রণয় রায়ের বাড়িতে সিবিআইয়ের তল্লাশি
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সময় এগিয়েছে, নিজের দেশে তত বেশি করে দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে গিয়েছে মজুর/শ্রমিক শ্রেণি। মুক্তিসুধা কী বস্তু জানেনই না তাঁরা, বরং নিজের লোকেদের হাতেই বঞ্চিত রয়ে গিয়েছে।
সিবিআইকে ব্যবহার করে শাসক লাল চোখ দেখায় প্রণয় রায়কেও। সরকারের বিরুদ্ধে সরব হওয়ায় কি এই ব্যবস্থা? এনডিটিভি-র প্রতিষ্ঠাতা প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকার বাড়ি ও কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই। ব্যাঙ্ক জালিয়াতির অভিযোগে সিবিআই কর্তারা এই অভিযান চালায় বলে খবর।
সূত্র জানিয়েছে, এনডিটিভি-র কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়নি। ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার এই টেলিভিশন চ্যানেলটির অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান আরআরপিআর হোল্ডিং লিমিটেডে সিবিআই কর্মকর্তারা অভিযান চালান। তাঁরা এই প্রতিষ্ঠানটির দিল্লি, দেরাদুন ও উত্তরাখণ্ডর চারটি কার্যালয়েও তল্লাশি চালিয়েছে।
এদিকে এনডিটিভি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘পুরনো ভিত্তিহীন মিথ্যা অভিযোগের’ ভিত্তিতে একটি ‘সর্বাত্মক হয়রানি’ করা হয়েছে তাঁদের। তাঁরা এমন ‘চরম হয়রানিমূলক’ অভিযানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। সংবাদমাধ্যম লড়াই করবে, এটাই তো স্বাভাবিক; তবে সরকার আবারও সেই সিবিআই জুজু ব্যবহারের নজির তৈরি করল সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।
বুখারির হত্যা, কাশ্মীর নিরাপদ নয়
কাশ্মীরে খবর করতে গিয়ে পুলিশ ও আধা সেনার হেনস্থার মুখে পড়েছেন কত সাংবাদিক! অনেকে বছরের পর বছর জেলে বন্দি! বুখারির মতো অনেককে প্রাণও দিতে হয়েছে ভূস্বর্গের বুকে। ২০১৮ সাল। কোনও এক বৃহস্পতিবার সন্ধেয় সাংবাদিক সুজাত বুখারির হত্যা। 'রাইজিং কাশ্মীর'-এর এই সম্পাদক সন্ধেয় অফিস থেকে বেরিয়েছিলেন একটি ইফতার পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য। তখনই আততায়ীর অতর্কিত গুলিতে লুটিয়ে পড়ে তাঁর রক্তাক্ত শরীর।
কাশ্মীর যে সাংবাদিকদের জন্য মোটেও ‘সেফ’ নয়, তা নিশ্চিত করতে বুখারি-হত্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার ছিল না। এ যেন নিরাপত্তাহীনতার দিকে আর একবার আলো ফেলে মনে করিয়ে দেওয়া, মুখ খুলো না। কলম তুলো না। আওয়াজ উঠিও না। তা হলেই বাকিদের মতো ঝাঁঝরা হতে হবে বুলেটে।
ভারতে 'ফ্রিডম অফ প্রেস' কোথায় দাঁড়িয়ে? এই নিয়ে পরিসংখ্যান লজ্জায় মুখ লুকোতে বলতে পারে এই দেশকে। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বাকস্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সূচকে আরও অবনতি হলো ভারতের। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দিবসে 'রিপোর্টস উইদাফট বর্ডার্স’ সংগঠনের তরফে প্রকাশিত ২০২২ সালের রিপোর্ট ও সূচক অনুযায়ী এখন ১৫০তম স্থানে রয়েছে ভারত। ২০১১ সালের সূচকে ভারতের স্থান ছিল ১৪২তম। এ তো গেল স্বাধীন দেশের স্বাধীন সাংবাদিকদের হাল-হকিকত। এবার দেখা যাক, এখানে কেমন আছেন সমাজের বিবেক সেইসব মানুষ, যাঁরা ক্ষমতাকে সত্যিটা শোনানোর চেষ্টা করেন।
'ভীমা কোরেগাঁও’ প্রশ্ন তোলে মানবাধিকার নিয়ে
ভীমা কোরেগাঁও হিংসা মামলায় বারবার প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার নিয়ে। রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা সমাজকর্মী, প্রতিবাদীদের শহুরে নকশালের তকমা দিয়ে জেলে পুরে রাখার অপর নাম যেন এই মামলা। মিথ্যে মামলায় বিনা বিচারে বুদ্ধিজীবীদের জেলে ফেলে রাখার উদাহরণ ভীমা কোরেগাঁও হিংসা মামলা। বছরের পর বছর চলছে মামলা, এখনও দোষী সাব্যস্ত করা গেল না কোনও অভিযুক্তকে। অথচ তত্ত্বের পর তত্ত্ব তুলে ধরে আটক রাখা হচ্ছে অভিযুক্তদের।
ভীমা কোরেগাঁও হিংসার মামলা নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে কেন্দ্র। ২০১৮-র ১ জানুয়ারি ভীমা কোরেগাঁওয়ে দলিতদের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, মাওবাদীদের মদতে হিংসার পরিকল্পনা করেন সমাজকর্মীরা। নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট জনদের। ভারভারা রাও থেকে শুরু করে সুধা ভরদ্বাজ, ফাদার স্ট্যান স্বামী-সহ বহু বিশিষ্ট জনকে গ্রেফতার করা হয় সেসময়। গ্রেফতার হওয়া ১৬ জনকে আরবান নকশালের তকমা দেওয়া হয়। মামলা চলাকালীন কার্যত বিনা চিকিৎসায় জেলে মারা যান ফাদার স্ট্যান স্বামী। বারবার অভিযুক্তদের জামিনের আবেদন আদালতে খারিজ হলেও, তিন বছরে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। প্রতিবাদীদের কণ্ঠরোধে কার্যত তাঁদের জেলে ফেলে রাখা হয়। মানবাধিকারের বিষয়টিও অগ্রাহ্য করার অভিযোগ ওঠে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি এই মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন আইনজীবী ও সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজ। তাঁর জামিন বম্বে হাই কোর্ট মঞ্জুর করলেও, তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল এনআইএ। সব মিলিয়ে সমাজের প্রতিবাদীদের কণ্ঠস্বর রোধেই যেন শহুরে নকশালের তকমা লাগিয়ে জেলবন্দি করার কৌশল নেয় কেন্দ্র। তিন বছর পর ২০২১ সালে শর্তাধীন জামিন পেয়েছিলেন অসুস্থ কবি ভারভারা রাও। তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছিল বম্বে হাই কোর্ট। কবিকে দু'টি শর্তে অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য তাঁর জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সমাজের বিবেক কবি, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী– এই মানুষকে যে সরকার জেলের দরজা দেখায়, তা কি আদতে ব্রিটিশ রাজের দমনপীড়নের সঙ্গে তুলনীয় নয়?
পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার তিস্তা শীতলাবাদ
গুলবার্গ সোসাইটি হত্যাকাণ্ডে নিহত কংগ্রেস সাংসদ এহসান জাফরির স্ত্রী জাকিয়া জাফরি এবং সমাজকর্মী তিস্তা শীতলাবাদ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। সেই মামলার মূল কথা ছিল ২০০২-এর গুজরাত দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদিকে দেওয়া ক্লিনচিট খারিজ করুক আদালত। এরপর তিস্তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা এবং আমেদাবাদ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে এআইআর। গুজরাতের জঙ্গিদমন শাখার হাতে গ্রেফতার হন তিস্তা। আদালতে তিনি বলেন, পরোয়ানা ছাড়া তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এবং তাঁকে নাকি গ্রেফতারের পর মারধর করা হয়েছে। তাঁর গ্রেফতারি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রসংঘও।
বলাই বাহুল্য, মিলিটারি জুন্টা কিংবা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার বলে কিছু হয় না। শাসক সমালোচনা কিংবা গণবিতর্ক সহ্য করে না। সাংবাদিকরা সাহসী হলে, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদী হলে, তাঁদের জেলে পচতে হবে? এটাই আমার দেশ?






