গানপিছু পঁচিশ হাজার দর হেঁকেছিলেন বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেব

rudranjan
৩ মিনিট
গানপিছু পঁচিশ হাজার দর হেঁকেছিলেন বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেব

ভোররাতের সূর্যর শরীর থেকে মেঘের আলগা আস্তরণ সরে যাচ্ছে ধীরে। আফতাবের কাল। যুবরাজ সলিম চলেছে আনারকলির গরিবখানায়, প্রভাতি প্রণয়ের নেশায়। সোহিনী রাগে রেওয়াজে বসেছেন মিয়াঁ তানসেন। পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি মুড়ে আছে তার স্বরধ্বনির অলঙ্কার। এ প্রভাত বড়ই মনোমুগ্ধকর। কিন্তু রেওয়াজের এ গুঞ্জন আসে কোত্থেকে? কে গায়? দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এ অবিস্মরণীয় গল্পকথাকে আমরা মনে রাখিনি।

১৯৬০ সাল। বড় পর্দায় মুক্তি পাচ্ছে কে আসিফ পরিচালিত ‘মুঘল এ আজম’। সঙ্গীত পরিচালক নৌশাদ। বিধি মেনেই নেপথ্য গায়িকা হিসেবে নাম নির্বাচন করা হল লতা মঙ্গেশকারের, বলিউডে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া পুরুষকণ্ঠে মহাম্মদ রফি, অন্যান্য শিল্পীর তালিকায় শমসাদ বেগম। কিন্তু সাময়িক জ্যোতিচিহ্ন পড়ল বিশেষ এক নামে এসে, তানসেন। কোন এমন মহার্ঘ কণ্ঠ হিন্দুস্থানে আছে যে নির্দ্বিধায় এ চরিত্রের লিপে গলা দেবেন? ধন্দে পড়লেন ছবির পরিচালক এবং সঙ্গীত পরিচালক। মহল্লা শাসন করছেন তখন ওস্তাদ আমির খাঁ, ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের মতো শিল্পীরা। কাকে বলা যায়? এমতাবস্থায় নৌশাদ প্রস্তাব করলেন বড়ে গোলাম আলি খাঁর নাম। প্রস্তাব তো করলেন, কিন্তু তাঁকে রাজি করানো তো আর যে সে লোকের কম্ম নয়, তদুপরি ফিল্মে গান করেন না তিনি। মাথায় রাখতে হবে, এ যুগ গলবস্ত্র হওয়ার নয়, তৎকালীন রীতি ছিল আহুতির।

রেডিওর আগমনের পরেই বিধি তৈরি হল, অনুষ্ঠান পেতে গেলে ওস্তাদদের ঢুকতে হবে পরীক্ষা দিয়ে। তাবড় ওস্তাদদের পরীক্ষাগারের কলমপেষা পরীক্ষার্থী করবেন এমন আস্পর্ধা আর কারই বা আছে? এর ফলস্বরূপ একাংশের গাইয়ে বাজিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওর নিয়মাবলীতে পদাঘাত করে জানালেন বেতারের ধারপাশ কদাচ মারাবেন না তাঁরা। খাঁ সাহেব খাস সেই যুগের ফসল। ফলত, অর্থ বা অন্য কোনও প্রলোভনে তাঁকে প্রলুব্ধ করা এক দুরূহ ব্যাপার। তা যাই হোক, দুয়ে মিলে তাঁর গৃহাভিমুখে যাত্রা করলেন।

আদাব পরবর্তী কুশল বিনিময়ের পর নৌশাদ সরাসরি খাঁ সাহেবকে প্রস্তাব দিলেন, “ওস্তাদজী, আমরা একটা ছবি বানাচ্ছি, মুঘল এ আজম, সেখানে তানসেনের চরিত্রে আপনার গলাটা যদি একটু ব্যবহার করতে দেন বড় মেহেরবানি হয়। আপনি ছাড়া এ গান আর কেই বা গাইবে?” খাঁ সাহেব নারাজ। জলসা ছাড়া আর কোথাও গান না তিনি। মাঝখান থেকে কে আসিফ তুড়ি মেরে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, “খাঁ সাহেব, গান আপনিই গাইবেন, কিমৎ যা লাগে দেব, কিন্তু না শুনব না।” সব্বনাশের মাথায় বাড়ি। সিংহের ডেরায় বসে সোজা হুকুমদারি? খাঁ সাহেব বিস্মিত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে নৌশাদকে বললেন, “ইনি কে ভাই? কাকে এনেছেন সঙ্গে করে?”

এবার নৌশাদের বিনয়ে কাঁকুইদানা হওয়ার পালা। করজোড়ে তিনি জানালেন, “খাঁ সাহেব, আপনি রাজি না হলে আমার লোকসান। আপনাকে দিয়ে যদি ফিল্মে গাওয়াতে পারি তাহলে আমার ইজ্জত কোথায় উঠবে একবার ভেবে দেখুন। রেহমত করুন।” এরপর দীর্ঘ টালবাহানা। অবশেষে পাতিয়ালা ঘরানার কুলসূর্য জানালেন, “বেশ, গাইব আমি, কিন্তু গানপিছু পঁচিশ হাজার করে নেব।”

এ যুগের নিরিখে বিচার করলে কারুর মনে হতেই পারে, “এ আর এমন কী, বোম্বের মতো জায়গায় পঁচিশ হাজার তো নস্যির কণাটুকুও নয়।” কিন্তু সময়টা আজ থেকে অর্ধ শতাব্দীরও ওপারে। রথী মহারথীরাও সে যুগে সিনেমায় গলা ফেলতে পাঁচশো-হাজারের বেশি দর হাঁকাতেন না।

শেষে সেই কথাই রইল। আসিফ বিনাযুদ্ধে পঁচিশ হাজারে রফা করলেন খাঁ সাহেবের সঙ্গে, তেহজিবের সঙ্গে এও জানালেন, “আপনার কোনো মূল্য হয়না খাঁ সাহেব। আপনি ওসবের ঊর্দ্ধে। এই নিন দশ হাজার অ্যাডভান্স রাখুন।” এই দাঁড়াল কিসসা। বাকি ইতিহাস। রেকর্ডিংয়ের সময় পরিচালক নৌশাদকে বললেন, “খাঁ সাহেবকে বলবেন তানগুলো যেন একটু হালকা অঙ্গের নেন। প্রেমের দৃশ্য তো।” তানসেনের সুরবলয়ে সলিম আনারকলির সেই বিখ্যাত প্রেমের দৃশ্যের রেকর্ডিংও ঠিক হালের এলুম, খেলুম, পালালুম ফ্যাশনে হয়নি। গাওয়ার আগে, যে দৃশ্যের জন্য গলা দিচ্ছেন, সেটা চেয়ে বসলেন খাঁ সাহেব। শুধুমাত্র তাঁর গাওয়ার সুবিধার্থে একদিনের মধ্যে সে দৃশ্য সম্পাদনার কাজ শেষ করে তাঁর সামনে এনে মজুত করা হল। অতঃপর, প্রোজেকশনে সে দৃশ্যের ঘটমান বর্তমানের দিকে তাকিয়ে সোহিনী রাগের কালজয়ী বন্দিশ, “প্রেম জোগান বন কে” গাইলেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ। এভাবেই তো সেলুলয়েড ইতিহাস নির্মাণ করে। দৃশ্যের ইতিহাস, শব্দের ইতিহাস, অবশিষ্ট থাকে কেবলমাত্র তার উপসংহারীয় সুগন্ধ। বড় চটজলদি আখ্যান বিস্মৃত হয়ে যাই আমরা।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।