সিইসি-র পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ, রাজধানীতে বিক্ষোভ শুরুর আগেই ৫০০ আটক, ৪০,০০০-এরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন
Delhi’s October 10 protest: যন্তর মন্তর ও কনট প্লেসের আশপাশ থেকে আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০০। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও।
দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর, শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ। মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করা হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা। পাশাপাশি, দিল্লিতে আসা ও দিল্লি থেকে ছেড়ে যাওয়া বহু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তাঁদের রয়েছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ।
স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার সকালে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার আগেই দিল্লি পুলিশ বিভিন্ন জায়গা থেকে আন্দোলনকারীদের আটক করতে শুরু করে। পুলিশের দাবি, শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। ককক্রোচ জনতা পার্টি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির উদ্যোগে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কৃষক সংগঠন ও আম আদমি পার্টিও এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, বাতিল বহু ট্রেন
বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লির পরিবহণ ব্যবস্থায় একাধিক বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন জানিয়েছে, শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নিউ দিল্লি স্টেশন ছাড়া বাকি প্রভাবিত স্টেশনগুলিতে মেট্রো বদলের ব্যবস্থা চালু রাখার কথা জানানো হয়। প্রথমে ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হলেও পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়।
স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির বিভিন্ন স্টেশন থেকে ছাড়ার কথা ছিল বা দিল্লিতে পৌঁছনোর কথা ছিল, এমন অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। আরও কয়েকটি ট্রেনের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের যাতায়াতে ব্যাপক সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষত, যাঁরা কাজের প্রয়োজনে বা অন্য কারণে দিল্লিতে আসছেন, তাঁদের যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মধ্য দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত জনপথ-कर्तব্য পথ সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় এই বিধিনিষেধ কার্যকর করার কথা জানানো হয়। এই এলাকার মধ্যে রয়েছে যন্তর মন্তর, কনট প্লেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং একাধিক সরকারি দফতর।
বৃহস্পতিবার রাত থেকেই দিল্লি পুলিশের তরফে ঘোষণা করা হচ্ছিল, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ নম্বর ধারায় চার বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। কিন্তু আয়োজকদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার।
আটক প্রায় ৫০০, নিরাপত্তায় হাজার হাজার কর্মী
স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুসারে, যন্তর মন্তর ও কনট প্লেসের আশপাশ থেকে আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০০। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও। ককক্রোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিমান থেকেই আটক করা হয় তাঁকেও। সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকেও আটক করা হয়। নেতৃত্বকে আটক করা হলেও আন্দোলন বন্ধ না করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। শহরে ঢোকার বিভিন্ন পথেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিপুল সংখ্যক কর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিক্ষোভের কারণে সাধারণ মানুষের যাতায়াত যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ৪০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয় বলে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে।
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ দিল্লিতে মেট্রো ও রেল পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে বাধা দেয়। আদালত জানায়, জনসাধারণের অসুবিধা যতটা সম্ভব কমিয়ে পরিবহণ পরিষেবা নিয়ন্ত্রিতভাবে চালু রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সমস্ত পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হবে। আদালতের এই নির্দেশের পর ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার প্রাথমিক পরিকল্পনা সংশোধন করে ৪৫টি স্টেশনে প্রবেশ ও প্রস্থানের উপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়।
এই বিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, এই পরিস্থিতির দায় নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী এসআইআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ফর্ম ৬, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন এবং ভোটার-তথ্যের ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় ছিল। এই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে।
২০২৫ সালের জুনে শুরু হওয়া এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়ার বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও মে মাসে এসআইআরের বৈধতা বহাল রেখেছিল। তবে আদালত স্পষ্ট করেছিল, এই প্রক্রিয়ার অর্থ এই নয় যে কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।
দিল্লির এই বিক্ষোভ তাই শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকা তৈরির স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিক্ষোভ ঠেকাতে পরিবহণ ও ইন্টারনেট পরিষেবায় ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপের ফলে সেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।





