দু’বছরের রক্তঘাম আন্দোলনের ফসল: যেভাবে সার্বিয়ায় নিরঙ্কুশ জয় পেল ছাত্র জোট
Serbia student movement: নোভি সাদ ট্র্যাজেডি থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলনের মুখে সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের ভুচিচ সরকারের অবসান ঘটল। দু’বছরের ছাত্র আন্দোলন কীভাবে সার্বিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে ছাত্র জোটকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিল?
২৫ অক্টোবর ঐতিহাসিক জয়ের পর বেলগ্রেডের রাজপথে ছাত্র-জনতার উল্লাস
দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ। সেই আন্দোলনই ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে। রাস্তায় নেমে আসেন সাধারণ মানুষ, কৃষক, শিক্ষক, শিল্পী এবং বিভিন্ন পেশার নাগরিকেরা। প্রায় দু’বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের শেষে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হন দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতা আলেকজান্ডার ভুচিচ। ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ বা ছাত্রদের নির্বাচনী জোট এই নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে। এই ফল সার্বিয়ার রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে আন্দোলনের নির্বাচনী সাফল্যই শেষ কথা নয়। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে ক্ষতিগ্রস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে পুনর্গঠন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। দেশের উত্তরাঞ্চলের নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ঘিরে দেশজুড়ে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কেন একটি সদ্য সংস্কার করা রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে পড়ল? নির্মাণকাজে কোনো গাফিলতি হয়েছিল কি না? সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ এবং কাজের মান যাচাই করা হয়েছিল কি? এই প্রশ্নগুলি ক্রমে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
প্রতিবাদীদের অভিযোগ ছিল, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির অভাব এই বিপর্যয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। যদিও দুর্ঘটনার প্রতিটি কারণকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না, ছাত্রছাত্রীদের কাছে ঘটনাটি হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশের উপলক্ষ।
প্রথম দিকে প্রতিবাদ ছিল ছোট আকারের। নোভি সাদ ও বেলগ্রেডের মতো শহরে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে দুর্ঘটনায় মৃতদের স্মরণে অবস্থান করেন। নিহত প্রত্যেকের জন্য এক মিনিট করে রাস্তা অবরোধ করার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হয়। কিন্তু দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্ষোভ শুধু একটি দুর্ঘটনাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকারি কাজের স্বচ্ছতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি।
আন্দোলনের প্রথম বড় শক্তি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। তাঁরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস বয়কট করেন এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করতে শুরু করেন। এই আলোচনা পরিচালনার জন্য তৈরি হয় ছাত্রসভা বা ‘প্লেনাম’। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন। কোনো একক নেতার নির্দেশের বদলে যৌথ আলোচনার মাধ্যমে আন্দোলন চালানোর পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।

২০২৩ সালের ১২ মে, সার্বিয়ার বেলগ্রেডে ভয়াবহ বন্দুক হামলার পর সার্বিয়ার পপুলিস্ট নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ়বিক্ষোভ জানায় হাজার হাজার মানুষ
এই সাংগঠনিক কাঠামো আন্দোলনের চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কারণ, সার্বিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলেকজান্ডার ভুচিচ এবং তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রভাব ছিল প্রবল। ছাত্রদের ধারণা ছিল, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বিকল্প তৈরি করতে হলে আন্দোলনের ভিতরেও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, নোভি সাদের দুর্ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করতে হবে, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সরকারি কাজের নথি ও চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি তাঁরা দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংস্কারের দাবি তোলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Brazil election analysis and Serbia student movement: ব্রাজিলে জয়ী হয়েছেন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পন্ন বামঘেঁষা শ্রমিকনেতা; সার্বিয়ায় জয়ী হয়েছে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচনী শক্তি, যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে এখনই সুসংহত বামপন্থী বলে চিহ্নিত করা যায় না। দুই দেশের সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক সংগ্রামের চরিত্র এবং নির্বাচনী ফলাফলের তাৎপর্য তাই আলাদা করে বিচার করা জরুরি।
প্রথমে সরকারপক্ষ আন্দোলনকে সীমিত রাখার চেষ্টা করলেও তা ক্রমশ ব্যর্থ হয়। ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান কৃষক, শিক্ষক, অভিনেতা, আইনজীবী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিলোস ভুচেভিচ পদত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন ভুচিচের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী। বেলগ্রেডে বড় আকারের অবরোধ এবং ধারাবাহিক প্রতিবাদের পর এই পদত্যাগ আন্দোলনের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু তাতেও আন্দোলন থামেনি।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে রাজধানী বেলগ্রেডে ছাত্রদের নেতৃত্বে বিশাল সমাবেশ হয়। তাতে কয়েক লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সার্বিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম বড় সরকারবিরোধী জমায়েত।
এই পর্যায়ে আন্দোলনের একটি প্রতীকও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে—লাল হাতের ছাপ। প্রতিবাদীদের বক্তব্য ছিল, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য যে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। লাল হাতের ছাপ সেই দায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই সময় আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। ছাত্রছাত্রীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁরা ছোট শহর ও গ্রামেও পৌঁছতে শুরু করেন। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হেঁটে যাওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়। পথে সাধারণ মানুষ তাঁদের খাবার, জল এবং থাকার জায়গা দিয়ে সাহায্য করেন।
এই যোগাযোগ আন্দোলনকে শহুরে শিক্ষিত যুবসমাজের গণ্ডি থেকে বের করে আনে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ একই দাবিতে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পান। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নোভি সাদের দুর্ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তিতে বেলগ্রেড থেকে সেখানে পদযাত্রা করে পৌঁছন ছাত্রছাত্রীরা। এই পদযাত্রাও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কোনো একক মুখকে আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে তুলে না ধরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসভা এবং কর্মীগোষ্ঠী নিজেদের কর্মসূচি নির্ধারণ করত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, সমাবেশের আয়োজন, যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজও ভাগ করে নেওয়া হয়।
এই পদ্ধতির সুবিধা ছিল, কোনো একজন নেতাকে গ্রেফতার করা বা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আন্দোলনকে দুর্বল করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে। আবার এর সীমাবদ্ধতাও ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। আন্দোলনকে নির্বাচনী রাজনীতিতে নিয়ে যাওয়ার সময় এই সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবু ছাত্ররা একটি বিষয় স্পষ্ট করতে পেরেছিলেন—তাঁদের আন্দোলন কোনো একটি দলের ক্ষমতায় যাওয়ার দাবি নয়, বরং রাষ্ট্রের কাজকর্মে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার দাবি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার মান উন্নত করার মতো বিষয়কে সামনে রেখে তাঁরা বৃহত্তর জনসমর্থন গড়ে তোলেন।
এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও পরে ছাত্রদের নির্বানী উদ্যোগকে সমর্থন করে।
নির্বাচনের আগে আন্দোলনকারীরা ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম আটকানোর প্রস্তুতিও নেন। ভোটের হিসাব পরীক্ষা করা এবং ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষক রাখার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিআরটিএ-র বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রে দেশীয় পর্যবেক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এর ফলে ভোটের সময় অনিয়মের সুযোগ কমানোর চেষ্টা করা সম্ভব হয়।
২৬ অক্টোবরের দ্য গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৯৬.৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের হিসাব প্রক্রিয়াকরণের পর ছাত্রদের সমর্থিত তালিকা প্রায় ৫২.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অন্যদিকে ভুচিচের জোট পেয়েছিল প্রায় ৩৯.২ শতাংশ। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ছাত্রদের জোট সংসদের ২৫০টি আসনের মধ্যে প্রায় ১৪০টি আসন পেতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১২৬টি আসন।
তবে নির্বাচনে জয় পাওয়া এবং সরকার পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের প্রশাসন চালানোর অভিজ্ঞতা সীমিত। আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন মতের মানুষ রয়েছেন। তাঁরা কীভাবে সরকার গঠন করবেন, কে নেতৃত্ব দেবেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবেন, তা এখনও বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। ভুচিচের আমলে সার্বিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছিল। নতুন সরকার এই ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখবে, তা ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সার্বিয়ার ছাত্রছাত্রীদের জয় কতটা স্থায়ী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনতে পারবে, তার উত্তর নির্ভর করবে আগামী দিনে তাঁদের কাজের উপর।






