থমথমে সুজিত বসুর পাড়া, স্থানীয়দের মনে যে সব প্রশ্ন উঠছে

Sujit Bose: উত্তর কলকাতার সেই প্রভাবশালী নেতা সুজিত বসুর এলাকায় এখন কী পরিস্থিতি? কী বলছেন স্থানীয়রা?

Sonia Sarban
৩ মিনিট
থমথমে সুজিত বসুর পাড়া, স্থানীয়দের মনে যে সব প্রশ্ন উঠছে

উত্তর কলকাতার রাজনীতিতে একসময় পাড়ার ক্লাব থেকে শুরু করে বড় রাজনৈতিক মঞ্চ—সব জায়গাতেই ছিল তাঁর দৃপ্ত উপস্থিতি। এলাকার অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন ‘দাদা’। যাঁর কাছে সমস্যা নিয়ে গেলে প্রায়ই সমাধান মিলত। কিন্তু এখন ছবিটা বদলে গিয়েছে। সেই একই এলাকায় যেন নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। কয়েকদিন আগেই ইডির হাতে গ্রেফতার হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন ক্যাবিনেট মন্ত্রী সুজিত বসু। এর ঠিক আগেই বিধানসভা নির্বাচনে হয়েছে তাঁর পরাজয়। সব মিলিয়ে একসময়কার এই জনপ্রিয় নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নিজের এলাকাতেই।

তাঁর এলাকায় এখন প্রথমেই চোখে পড়ে বদলে যাওয়া পরিবেশ। যে রাস্তায় একসময় রাজনৈতিক ব্যানার, পোস্টার, মিছিল আর কর্মীদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত, সেখানে এখন অনেকটাই স্তব্ধতা। স্থানীয় চায়ের দোকানে আলোচনা চলছে ঠিকই, কিন্তু আগের সেই আত্মবিশ্বাসী সমর্থনের সুর যেন অনেকটাই ফিকে। পাড়ার কেউ সরাসরি কথা বলতে চাইছেন না, আবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাক্তি বলছেন অতিরিক্ত দম্ভ আর অহংকারই তাঁর পতনের কারণ। কেউ বলছেন,

রাজনীতি নিয়ে এখন আর বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে করে না।

একসময় এই এলাকায় সুজিত বসুর সাংগঠনিক দখল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। স্থানীয় ক্লাব, সামাজিক অনুষ্ঠান, পুজো কমিটি প্রায় সব জায়গাতেই তাঁর প্রভাব ছিল। এলাকার অনেকেই বলছেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই ছিল তাঁর বড় শক্তি।

কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ভাবমূর্তিতে ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে শুরু করে। চাকরি দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই এলাকার মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে থাকে। যদিও আদালতে এখনও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি এবং আইন অনুযায়ী অভিযোগও প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না, তবু সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব যে পড়েছে, তা এলাকায় কান পাতলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

স্থানীয় এক চাকরিপ্রার্থীর কথায়,

আমরা অনেক বছর ধরে পরীক্ষা দিয়ে বসে আছি। এবার সেখানেও যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে মানুষের রাগ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক।

তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শুধু কোনো এক নেতাকে ঘিরে নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরই তৈরি হয়েছে।

এলাকার এক মধ্যবয়স্ক বাসিন্দা বলেন,

আগে সুজিত বসু খুব সহজে মানুষের সঙ্গে মিশতেন। এখন সেই ব্যাপারটা নেই। নেতা বড় হলে সাধারণ মানুষের থেকে একটু দূরে সরে যান, হয়তো সেটাই হয়েছে।

তাঁর দাবি, মানুষের সঙ্গে সংযোগ কমে যাওয়াও জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বড় কারণ।

তবে এর ঠিক বিপরীতে অন্য সুরও কানে এসেছে। সুজিত বসুর সমর্থকদের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই নাকি তাঁকে নিশানা করা হয়েছে। এলাকার এক তৃণমূল কর্মী বলেন,

ওঁর বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে, সবই রাজনৈতিক চক্রান্ত। সবসময় মানুষের নেতা ছিলেন আর আগামীতেও থাকবে। ভোটে হার মানেই মানুষ ওঁকে ছেড়ে দিয়েছে, এমনটা নয়।

এছাড়াও তিনি বলেছেন, সুজিতদাকে সবসময় বিপদে আপদে পাওয়া গিয়েছে। অনেক রাতে কোনো সমস্যায় সবার আগে হাজির হয়েছেন তিনি। এমনকি কাধে হাত রেখেও বলেছেন আমি আছি।

স্থানীয় এক দোকানদার বলেন,

আগে এখানে ভোটের সময় অন্যরকম পরিবেশ থাকত। কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেত, মানুষের মধ্যে একটা উন্মাদনা ছিল। এবার সেটা অন্যবারের তুলনায় কম ছিল।

তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের একটা অংশ নীরবে দূরে সরে গিয়েছেন। চাকরি দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠতেই এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ দেখা গিয়েছে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। বহু তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন। কেউ টিউশন পড়াচ্ছেন, কেউ ছোটখাটো কাজ করছেন, আবার কেউ চাকরির অপেক্ষায় বাড়িতেই সময় কাটাচ্ছেন। একজন কলেজ পড়ুয়া বলেন,

আমরা ছোটবেলা থেকে শুনেছি পড়াশোনা করলে চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন যদি টাকার বিনিময়ে চাকরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

যদিও তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বলতে চাননি, তবু তাঁর হতাশা একদম স্পষ্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন,

আগে কোনো নেতা জনপ্রিয় হলে মানুষ সেটা হৃদয় দিয়ে মেনে নিত। এখন মানুষ প্রশ্ন করে। তথ্য জানতে চায়। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো।

তাঁর মতে, শুধুমাত্র দলীয় সংগঠন নয়, স্বচ্ছ ভাবমূর্তিও এখন বড় বিষয়। তবে সুজিত বসুর এলাকায় এখনও এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা তাঁর অতীত কাজের কথা স্মরণ করছেন। কেউ বলছেন, এলাকার উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। কেউ বলছেন, বিপদের সময় সাহায্য করেছেন। তাই তাঁরা এখনও পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিতে রাজি নন।

স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন,

আমরা রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু সুজিত বসু এলাকার অনেক কাজ করেছেন। এখন কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে, সেটা আদালত বলবে।

এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, মানুষের একাংশ এখনও অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখার জন্য। রাজনৈতিক মহলের মতে, সুজিত বসুর জনপ্রিয়তা কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দুর্নীতির অভিযোগ মানুষের মনে বড় ধাক্কা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে স্থানীয়দের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাই জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত জনসংযোগ, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং মানুষের আস্থা ধরে রাখা জরুরি। একবার সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে তা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

সন্ধ্যার দিকে এলাকায় আরও একবার ঘুরে দেখা গেল, রাজনৈতিক উত্তেজনার বদলে এখন যেন একটা চাপা কৌতূহল কাজ করছে মানুষের মধ্যে। কেউ প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য করছেন না, কিন্তু আড়ালে আলোচনা চলছে জোরকদমে। চায়ের কাপের আড্ডায় উঠে আসছে ইডি, নির্বাচন, দুর্নীতি, ভবিষ্যৎ রাজনীতি সবই। একসময় যে এলাকায় সুজিত বসুর নাম উচ্চারণ মানেই ছিল দাপুটে নেতা, সেখানে এখন সেই নাম ঘিরে শুধু বিতর্ক আর সংশয় তৈরি হয়েছে। সমর্থকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। বিরোধীরা বলছেন, এটা মানুষের রায়। আর সাধারণ মানুষ? তাঁরা আপাতত পরিস্থিতি দেখছেন, শুনছেন।

সুজিত বসুর পাড়ায় ঘুরে অন্তত এতটুকু স্পষ্ট মানুষের মন আর আগের জায়গায় নেই।

লিখেছেন
Sonia Sarban
Sonia Sarban
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জঁ দ্রেজ, কে আপনি?

Jean Dreze Economic Philosophy: দ্রেজের কাছে দারিদ্র্য দূরীকরণ মানে শুধু দরিদ্র পরিবারকে কিছু আর্থিক সাহায্য দেওয়া নয়। প্রয়োজন কাজের সুযোগ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে নিজের জীবন গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ দেয়। দুই প্রশ্নের সময়ক্ষেত্র আলাদা হলেও দুটির দর্শনগত দিক একই—যেখানে শিক্ষা আনে চেতনা, আর চেতনা আনে বিপ্লব।

অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসে আহত একাধিক মহিলা

Arunachal Pradesh: সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।

পুজোর আচার না মানলে... তিন খ্রিস্টান পরবিবারের উপর চড়াও বজরং দল

১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

SBI Data Leak: কীভাবে ফাঁস হলো ৩,৮৯৭ গ্রাহকের তথ্য? কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট?

SBI Data Leak: SBI-এর ৩,৮৯৭ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়ার ঘটনায় কতটা ঝুঁকিতে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট? সাইবার প্রতারণা থেকে নিজের টাকা সুরক্ষিত রাখতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?

নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের অভিযোগে পদক্ষেপ করেনি কেন্দ্র, আরটিআইতে সামনে এল চিঠি চালাচালির তথ্য

ECI RTI revelation: নির্বাচন কমিশনের অন্দরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই কমিশনারের অসন্তোষ ও মন্ত্রিসচিবকে চিঠি দেওয়ার ঘটনাটি আরটিআই নথিতে কীভাবে প্রকাশ্যে এল, এবং সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের স্বার্থে সচিবালয় কেন সরাসরি পদক্ষেপে বিরত থাকল?

নয় দেশে বিক্ষোভ, ইউরোপে নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ?

Europe Protest: জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, আবাসনের অভাব এবং শিক্ষা খাতে অবহেলার বিরুদ্ধে ইউরোপের ৯টি দেশের তরুণদের এই গণবিক্ষোভ কি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বদলে দিয়ে নতুন এক ‘ইউরোপীয় বসন্তের’ সূচনা করবে?

ইজরায়েল নির্বাচন: হাতে রক্তের দাগ, ফিরতে পারবেন নেতানিয়াহু?

Israel elections: দক্ষিণপন্থী জোটের পরিচিত মুখ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে বাদ দিয়েও বৃহত্তর ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারেন নেতানিয়াহু।

বইয়ের স্টলে হামলা, তারপরেও রেকর্ড বিক্রি? কত টাকার বই বিক্রি করল বামেরা?

CPI(M) book sales during Durga Puja: পুজোর মরশুমে সিপিএমের বইয়ের স্টলে হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের পরেও এ বছর কলকাতা-সহ রাজ্যের ১২টি জেলায় ৬৬৫টি স্টল থেকে ৯৮ লক্ষ ৭ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা বেশি। যাদবপুরের স্টলে বিক্রিও বেড়েছে কয়েক গুণ। এই বিপুল বিক্রির নেপথ্যে কী কারণ?