থমথমে সুজিত বসুর পাড়া, স্থানীয়দের মনে যে সব প্রশ্ন উঠছে
Sujit Bose: উত্তর কলকাতার সেই প্রভাবশালী নেতা সুজিত বসুর এলাকায় এখন কী পরিস্থিতি? কী বলছেন স্থানীয়রা?
উত্তর কলকাতার রাজনীতিতে একসময় পাড়ার ক্লাব থেকে শুরু করে বড় রাজনৈতিক মঞ্চ—সব জায়গাতেই ছিল তাঁর দৃপ্ত উপস্থিতি। এলাকার অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন ‘দাদা’। যাঁর কাছে সমস্যা নিয়ে গেলে প্রায়ই সমাধান মিলত। কিন্তু এখন ছবিটা বদলে গিয়েছে। সেই একই এলাকায় যেন নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। কয়েকদিন আগেই ইডির হাতে গ্রেফতার হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন ক্যাবিনেট মন্ত্রী সুজিত বসু। এর ঠিক আগেই বিধানসভা নির্বাচনে হয়েছে তাঁর পরাজয়। সব মিলিয়ে একসময়কার এই জনপ্রিয় নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নিজের এলাকাতেই।
তাঁর এলাকায় এখন প্রথমেই চোখে পড়ে বদলে যাওয়া পরিবেশ। যে রাস্তায় একসময় রাজনৈতিক ব্যানার, পোস্টার, মিছিল আর কর্মীদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত, সেখানে এখন অনেকটাই স্তব্ধতা। স্থানীয় চায়ের দোকানে আলোচনা চলছে ঠিকই, কিন্তু আগের সেই আত্মবিশ্বাসী সমর্থনের সুর যেন অনেকটাই ফিকে। পাড়ার কেউ সরাসরি কথা বলতে চাইছেন না, আবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাক্তি বলছেন অতিরিক্ত দম্ভ আর অহংকারই তাঁর পতনের কারণ। কেউ বলছেন,
রাজনীতি নিয়ে এখন আর বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে করে না।
একসময় এই এলাকায় সুজিত বসুর সাংগঠনিক দখল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। স্থানীয় ক্লাব, সামাজিক অনুষ্ঠান, পুজো কমিটি প্রায় সব জায়গাতেই তাঁর প্রভাব ছিল। এলাকার অনেকেই বলছেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই ছিল তাঁর বড় শক্তি।
কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ভাবমূর্তিতে ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে শুরু করে। চাকরি দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই এলাকার মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে থাকে। যদিও আদালতে এখনও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি এবং আইন অনুযায়ী অভিযোগও প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না, তবু সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব যে পড়েছে, তা এলাকায় কান পাতলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
স্থানীয় এক চাকরিপ্রার্থীর কথায়,
আমরা অনেক বছর ধরে পরীক্ষা দিয়ে বসে আছি। এবার সেখানেও যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে মানুষের রাগ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক।
তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শুধু কোনো এক নেতাকে ঘিরে নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরই তৈরি হয়েছে।
এলাকার এক মধ্যবয়স্ক বাসিন্দা বলেন,
আগে সুজিত বসু খুব সহজে মানুষের সঙ্গে মিশতেন। এখন সেই ব্যাপারটা নেই। নেতা বড় হলে সাধারণ মানুষের থেকে একটু দূরে সরে যান, হয়তো সেটাই হয়েছে।
তাঁর দাবি, মানুষের সঙ্গে সংযোগ কমে যাওয়াও জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বড় কারণ।
তবে এর ঠিক বিপরীতে অন্য সুরও কানে এসেছে। সুজিত বসুর সমর্থকদের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই নাকি তাঁকে নিশানা করা হয়েছে। এলাকার এক তৃণমূল কর্মী বলেন,
ওঁর বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে, সবই রাজনৈতিক চক্রান্ত। সবসময় মানুষের নেতা ছিলেন আর আগামীতেও থাকবে। ভোটে হার মানেই মানুষ ওঁকে ছেড়ে দিয়েছে, এমনটা নয়।
এছাড়াও তিনি বলেছেন, সুজিতদাকে সবসময় বিপদে আপদে পাওয়া গিয়েছে। অনেক রাতে কোনো সমস্যায় সবার আগে হাজির হয়েছেন তিনি। এমনকি কাধে হাত রেখেও বলেছেন আমি আছি।
স্থানীয় এক দোকানদার বলেন,
আগে এখানে ভোটের সময় অন্যরকম পরিবেশ থাকত। কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেত, মানুষের মধ্যে একটা উন্মাদনা ছিল। এবার সেটা অন্যবারের তুলনায় কম ছিল।
তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের একটা অংশ নীরবে দূরে সরে গিয়েছেন। চাকরি দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠতেই এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ দেখা গিয়েছে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। বহু তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন। কেউ টিউশন পড়াচ্ছেন, কেউ ছোটখাটো কাজ করছেন, আবার কেউ চাকরির অপেক্ষায় বাড়িতেই সময় কাটাচ্ছেন। একজন কলেজ পড়ুয়া বলেন,
আমরা ছোটবেলা থেকে শুনেছি পড়াশোনা করলে চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন যদি টাকার বিনিময়ে চাকরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
যদিও তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বলতে চাননি, তবু তাঁর হতাশা একদম স্পষ্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন,
আগে কোনো নেতা জনপ্রিয় হলে মানুষ সেটা হৃদয় দিয়ে মেনে নিত। এখন মানুষ প্রশ্ন করে। তথ্য জানতে চায়। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো।
তাঁর মতে, শুধুমাত্র দলীয় সংগঠন নয়, স্বচ্ছ ভাবমূর্তিও এখন বড় বিষয়। তবে সুজিত বসুর এলাকায় এখনও এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা তাঁর অতীত কাজের কথা স্মরণ করছেন। কেউ বলছেন, এলাকার উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। কেউ বলছেন, বিপদের সময় সাহায্য করেছেন। তাই তাঁরা এখনও পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিতে রাজি নন।
স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন,
আমরা রাজনীতি বুঝি না। কিন্তু সুজিত বসু এলাকার অনেক কাজ করেছেন। এখন কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে, সেটা আদালত বলবে।
এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, মানুষের একাংশ এখনও অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখার জন্য। রাজনৈতিক মহলের মতে, সুজিত বসুর জনপ্রিয়তা কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দুর্নীতির অভিযোগ মানুষের মনে বড় ধাক্কা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে স্থানীয়দের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাই জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত জনসংযোগ, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং মানুষের আস্থা ধরে রাখা জরুরি। একবার সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে তা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
সন্ধ্যার দিকে এলাকায় আরও একবার ঘুরে দেখা গেল, রাজনৈতিক উত্তেজনার বদলে এখন যেন একটা চাপা কৌতূহল কাজ করছে মানুষের মধ্যে। কেউ প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য করছেন না, কিন্তু আড়ালে আলোচনা চলছে জোরকদমে। চায়ের কাপের আড্ডায় উঠে আসছে ইডি, নির্বাচন, দুর্নীতি, ভবিষ্যৎ রাজনীতি সবই। একসময় যে এলাকায় সুজিত বসুর নাম উচ্চারণ মানেই ছিল দাপুটে নেতা, সেখানে এখন সেই নাম ঘিরে শুধু বিতর্ক আর সংশয় তৈরি হয়েছে। সমর্থকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। বিরোধীরা বলছেন, এটা মানুষের রায়। আর সাধারণ মানুষ? তাঁরা আপাতত পরিস্থিতি দেখছেন, শুনছেন।
সুজিত বসুর পাড়ায় ঘুরে অন্তত এতটুকু স্পষ্ট মানুষের মন আর আগের জায়গায় নেই।






