ভারতীয়দের অনশনের সুদীর্ঘ ইতিহাস মনে করাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুক
Sonam Wangchuk hunger strike: যতীন দাস, ভগৎ সিং, কাজী নজরুল ইসলাম, মহাত্মা গান্ধী থেকে সোনম ওয়াংচুক—ভারতে অনশনের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে আন্দোলনের দাবি। ভারতীয়দের অনশনের সুদীর্ঘ ইতিহাস মনে করাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুক।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের কারাগারের লড়াই, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ, নজরুল ইসলামের প্রতিরোধ কিংবা স্বাধীন ভারতে পরিবেশ ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন—অনশন বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালে জাতীয় পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে সোনম ওয়াংচুকের অনির্দিষ্টকালের অনশন সেই দীর্ঘ ইতিহাসকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। যতীন দাস, ভগৎ সিং, কাজী নজরুল ইসলাম, মহাত্মা গান্ধী থেকে স্বামী আত্মবোধানন্দ—সময় বদলেছে, বদলেছে আন্দোলনের দাবি। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে অনশন আজও ভারতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ভারতে অনশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাম অবশ্যই মহাত্মা গান্ধী। ১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে তিনি অন্তত ১৭টি অনশন করেছিলেন। গান্ধীর কাছে অনশন ছিল আত্মশুদ্ধি, নৈতিক আবেদন এবং অহিংস সত্যাগ্রহের অংশ।
১৯১৮ সালে আহমেদাবাদের মিল শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে তিনি অনশন করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। ১৯২৪ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ২১ দিনের অনশন করেন। ১৯৩২ সালে ইয়েরওয়াড়া জেলে ব্রিটিশ সরকারের 'কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড'-এর বিরুদ্ধে তাঁর অনশন ভারতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। এই অনশনের ফলেই ড. ভীমরাও আম্বেদকর এবং গান্ধীর মধ্যে ঐতিহাসিক পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৩৩ সালে, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং হরিজন কল্যাণের দাবিতে তিনি আবার ২১ দিনের আত্মশুদ্ধিমূলক অনশন করেন। ১৯৪৩ সালে আগা খান প্রাসাদে বন্দি অবস্থায় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি আরও একটি ২১ দিনের অনশন পালন করেন।
স্বাধীনতার ঠিক আগে ও পরে গান্ধীর অনশন নতুন তাৎপর্য পায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক হিংসা থামানোর জন্য তিনি কলকাতায় অনশন করেন। তাঁর অনশন ভাঙার পর শহরে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে বলে সমসাময়িক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk: সোনম ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়া 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ধরণা মঞ্চে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য, তিনি লাদাখের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষা নিয়েও দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। গত ১৪ মার্চ, ২০২৬ তারিখে তাঁকে যোধপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে দিল্লিতে গান্ধীর শেষ অনশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দিল্লিতে মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সময়ে তিনি ভারত সরকারের পাকিস্তানকে বিভাজন-চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য ৫৫ কোটি টাকা আটকে রাখার সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর অনশন ভাঙার শর্তগুলির মধ্যে ছিল সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সরকারের সেই অর্থ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া।
১৯২৯ সালের লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর ভগৎ সিং, যতীন দাস এবং তাঁদের সহযোদ্ধাদের ব্রিটিশ কারাগারে অত্যন্ত অমানবিক পরিবেশে রাখা হয়। রাজনৈতিক বন্দি হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের সাধারণ অপরাধীদের মতো ব্যবহার করা হতো। নিম্নমানের খাবার, অস্বাস্থ্যকর পোশাক, নোংরা পরিবেশ, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং মর্যাদাহানিকর আচরণের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রতিবাদে নামেন।
ভগৎ সিং ১৯২৯ সালের ১৫ জুন অনশন শুরু করেন। পরে ১৩ জুলাই সেই আন্দোলনে যোগ দেন যতীন দাস। তাঁদের দাবি ছিল রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে স্বীকৃতি, ইউরোপীয় বন্দিদের সমমানের পুষ্টিকর খাবার, পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত পোশাক, বই, সংবাদপত্র ও লেখার সামগ্রী ব্যবহারের অধিকার, জোরপূর্বক অপমানজনক শ্রমের অবসান এবং উন্নত চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা।
এই অনশন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক মোড় ঘুরিয়ে দেয়। টানা ৬৩ দিন অনশনের পর ১৯২৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যতীন দাস শহিদ হন। তাঁর মৃত্যু গোটা দেশে তীব্র জনমত সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, যতীন দাসের মৃত্যুর পরও ভগৎ সিং অনশন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১১৬ দিন পর তিনি অনশন প্রত্যাহার করেন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার সূত্রপাত করে এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
লাহোর জেলের এই ঘটনার কয়েক বছর আগেই আরেকটি ঐতিহাসিক অনশনের সাক্ষী ছিল হুগলি জেল। ১৯২৩ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সেখানে ৩৯ দিন অনশন করেন। তাঁর প্রতিবাদ ছিল জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, কারা কর্তৃপক্ষের দমনমূলক নীতি এবং বন্দিদের মর্যাদাহানিকর ব্যবহারের বিরুদ্ধে। অনশন দীর্ঘায়িত হওয়ায় গোটা বাংলায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়ে বার্তা পাঠান। অবশেষে ৩৯ দিন পর নজরুল অনশন প্রত্যাহার করেন।
স্বাধীনতার পর অনশনের চরিত্রও বদলাতে শুরু করে। পরিবেশ, উন্নয়ন, সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক দাবিগুলি সামনে আসে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ স্বামী আত্মবোধানন্দের আন্দোলন। হরিদ্বারের মাতৃসদন আশ্রমের এই সন্ন্যাসী এবং পরিবেশ আন্দোলনকারী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরাখণ্ডের চামোলি বিপর্যয়ের পর অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তাঁর দাবি ছিল গঙ্গার স্বাভাবিক ও অবাধ প্রবাহ রক্ষা করা এবং হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশকে বাঁচানো। তাঁর অভিযোগ ছিল, গঙ্গা ও তার উপনদীতে নির্বিচারে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ নির্মাণ, বালু-পাথর খনন এবং স্টোন ক্রাশারের কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। তাঁর অনশন পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
২০২৪ সালের ৬ মার্চ লাদাখের পরিবেশ আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুকে 'ক্লাইমেট ফাস্ট' নামে অনশন শুরু করেন। টানা ২১ দিনের এই অনশনের মূল দাবি ছিল লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা, পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া এবং হিমালয়ের নাজুক পরিবেশ রক্ষা করা। তাঁর আন্দোলন লাদাখের ভূমি, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের দাবিকে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে আসে।
দুই বছর পর, ২০২৬ সালে, সোনম ওয়াংচুক ফের অনশনকে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। ২৮ জুন নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তরে তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। এবার তাঁর দাবি ২০২৬ সালের NEET-UG-সহ বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাঁর অনশন ১৮ দিনে পৌঁছায়। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর ওজন প্রায় ৮.৫ কেজি কমে গিয়েছে এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে দিল্লি হাইকোর্টেও আবেদন করা হয়।
যতীন দাসের আত্মবলিদান, ভগৎ সিংয়ের দীর্ঘ অনশন, নজরুলের প্রতিবাদ, গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ, স্বামী আত্মবোধানন্দের পরিবেশ আন্দোলন কিংবা সোনম ওয়াংচুকের সাংবিধানিক ও শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে অনশন বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠেছে।







