মোদির চার আবেদন, ফিরবে ওয়ার্ক ফ্রম হোম?

Work From Home India: আবার কি ফিরতে চলেছে ঘরে বসে অফিস করার দিন? দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে কি বদলাতে হবে আমাদের অভ্যাস?

inscript
৩ মিনিট
মোদির চার আবেদন, ফিরবে ওয়ার্ক ফ্রম হোম?

আবার কি ঘরে বসে অফিস করার দিন ফিরতে চলেছে? পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার জেরে এমনই এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১০ মে ২০২৬, হায়দ্রাবাদে এক জনসভায় তিনি দেশের মানুষের কাছে চারটি বিশেষ আবেদন জানান। পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার কমানো, ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করা, বিদেশ ভ্রমণ কমানো এবং সোনা কেনা স্থগিত রাখার আহ্বান জানান তিনি। উদ্দেশ্য একটাই, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ কমিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখা।

কোভিডের সময় যেমন অনেকেই বাড়ি থেকে কাজ করতেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রয়োজন হলে দেশের স্বার্থে সেই ব্যবস্থা আবার চালু হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে, এটি কোনো সরকারি নির্দেশ নয়; সাধারণ মানুষ, কর্পোরেট সংস্থা এবং ব্যবসায়ী মহলের কাছে এক ধরনের জাতীয় আবেদন।

কেন হঠাৎ ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কথা?

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট প্রয়োজনের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আসে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে যদি তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বাড়ে। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের আমদানি ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। এই জলপথে উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

মোদির চার প্রধান আবেদন

প্রধানমন্ত্রী মূলত চারটি বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক ও সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রথমত, জ্বালানি সাশ্রয়। তিনি বলেছেন, অপ্রয়োজনে পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমাতে হবে। যেখানে সম্ভব, মেট্রো, বাস বা ট্রেনের মতো গণপরিবহণ ব্যবহার করতে হবে। একই পথে যাতায়াতকারীরা কারপুল করলে জ্বালানি খরচ অনেকটাই কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ওয়ার্ক ফ্রম হোম। যেসব সংস্থায় দূর থেকে কাজ করা সম্ভব, তারা আবার সেই ব্যবস্থায় ফিরতে পারে। অফিসে প্রতিদিন যাতায়াত কমলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, যানজট কমবে এবং দূষণও কিছুটা হ্রাস পাবে।

তৃতীয়ত, বিদেশ ভ্রমণ এড়ানো। অন্তত কিছুদিন অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কারণ বিদেশ ভ্রমণে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।

চতুর্থত, সোনা কেনা স্থগিত রাখা। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় সোনা আমদানিকারক। সোনা কিনতে বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় হয়। ফলে বিদেশি মুদ্রার উপর চাপ বাড়ে। তাই অন্তত এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কেন ভারতের অর্থনীতি চাপে?

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের তেল আমদানির খরচ বেড়ে যায়। তার ফলে একদিকে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে, অন্যদিকে তেল বিপণন সংস্থাগুলির উপর আর্থিক বোঝা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ডলারের চাহিদা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকেও অর্থ বেরিয়ে যায়।

যখন বিদেশ ভ্রমণ, সোনা আমদানি এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় একসঙ্গে বাড়ে, তখন অর্থনীতির উপর দ্বিগুণ-তিনগুণ চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলেই যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও জরুরি বলে মনে করছে কেন্দ্র।

ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমলে কার্বন নিঃসরণ কমে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু হলে শহরের দূষণও হ্রাস পেতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বহুদিন ধরেই বলছে, জ্বালানি সাশ্রয় করে তেলের চাহিদা কমানো সম্ভব। অনেক দেশ ইতোমধ্যেই এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

অন্যান্য দেশ কী করছে?

এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা পথ অনুসরণ করছে। কোথাও সরকারি কর্মীদের আংশিকভাবে দূর থেকে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, কোথাও সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ি আনা হয়েছে। ভারতেও একই ধরনের মানসিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রশ্ন উঠছে, বেসরকারি সংস্থাগুলি কি সত্যিই আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করবে? তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা এবং মিডিয়ার মতো অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। তবে উৎপাদন, খুচরো ব্যবসা, পরিবহণ বা নির্মাণ কাজে তা সম্ভব নয়।

তবে প্রধানমন্ত্রী কোথাও বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞার কথা বলেননি। তিনি দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, কোভিডের সময় ভারত একসঙ্গে বহু কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। এবারও প্রয়োজন হলে কিছু অভ্যাস বদলে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখা সম্ভব।

ওয়ার্ক ফ্রম হোম ফিরবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সংস্থাগুলির সিদ্ধান্তের উপর। কিন্তু এই আবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে, বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। অফিসে যাওয়া, বিদেশে ঘুরতে যাওয়া, কিংবা সোনার গয়না কেনা—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মণ্ডপ থেকে থিম পুজো: যেভাবে বদলে গেল কলকাতার প্যান্ডেল শিল্প

Durga Puja pandal history: তপতী গুহঠাকুরতার প্রবন্ধ 'Abodes of the Goddess'-এর অংশ বিশেষ অনূদিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এই প্রবন্ধটি প্রাথমিকভাবে ইয়েল স্কুল অব আর্কিটেকচারের জার্নাল 'পারস্পেক্টা' (Perspecta)-য় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি দেখতে পারেন: তপতী গুহঠাকুরতা, "অ্যাবোডস অব দ্য গডেস" (Abodes of the Goddess), পারস্পেক্টা ৫২, অক্টোবর ২০১৯: ১৯৫–২০৭।

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

কারও ফেরা হলো না মায়ের কোলে, কারও চোখের সামনেই চলে গেলেন মা, সপ্তমীর ভিড় কেড়ে নিল চেনা মুখগুলো

Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।