তিন দিনে তিনবার আটক রাহুল, রাজঘাটে বিরোধীদের ধর্না: SIR নিয়ে সংঘাত কোথায় গিয়ে ঠেকল?
Rahul Gandhi SIR protest: গত তিন দিন ধরে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে দিল্লি। মঙ্গলবার সংসদ থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে পদযাত্রা দিয়ে শুরু হয় এই প্রতিরোধ। পুলিশ বাধা দিলে রাহুল গান্ধী ব্যারিকেডে উঠে জাতীয় পতাকা নাড়ান এবং সহকর্মীদের নিয়ে ঢুকে পড়েন সংলগ্ন আকাশবাণী ভবনে।
গত তিন দিন ধরে দিল্লির রাজপথে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিরোধী দলগুলি। মঙ্গলবার সংসদ থেকে মিছিল, বুধবার যন্তর মন্তরে ধরপাকড় এবং বৃহস্পতিবার রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে ধরনা—প্রতিবাদের সুর ক্রমশ চড়ছে। এই তিন দিনে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে তিনবার আটক করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একাধিক এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। বিরোধী 'ইন্ডিয়া' জোটের মূল দাবি একটাই—মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্কিত প্রক্রিয়া 'এসআইআর' বাতিল করতে হবে।
এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' বা এসআইআর। ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিশেষ অভিযান শুরু করে। কমিশনের দাবি ছিল, তালিকা থেকে মৃত এবং ভুয়ো ভোটারদের বাদ দিয়ে তা পরিষ্কার করাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু গোলমাল বাধে খসড়া তালিকা প্রকাশের পর। দেখা যায়, দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৩০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এই কারণ দেখিয়ে যে, ভোটাররা এলাকায় থাকেন না বা অন্যত্র চলে গিয়েছেন। দিল্লিতেই বাদ পড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোটারের নাম। বিরোধীদের অভিযোগ, কোনো স্পষ্ট নিয়ম না মেনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহু আসল ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bengaluru Protest Against SIR: এসআইআর-এর বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে পথে নামলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করলেন প্রকাশ রাজ, ধ্রুব রাঠী-সহ প্রতিবাদীরা। ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’-এ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ উঠল?
বিরোধীদের ক্ষোভের মূল নিশানায় রয়েছেন খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কেরল ক্যাডারের এই প্রাক্তন আইএএস অফিসার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে থাকার সময়ে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল এবং রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালে অবসরের পর তিনি নির্বাচন কমিশনার হন এবং ২০২৫ সালের শুরুতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পান। বিরোধীদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি নতুন কমিটির মাধ্যমেই তাঁকে এই পদে বসানো হয়েছিল, তাই তিনি নিরপেক্ষ নন। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এ-ও প্রকাশ পায় যে, এসআইআর সংক্রান্ত বেশ কিছু একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কমিশনের অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারও দফায় দফায় আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এই সমস্যার প্রভাব শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই আটকে নেই, ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছু বিজেপি-শাসিত রাজ্যে যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা গেছে, তাদের রেশন কার্ড বাতিল করা হচ্ছে এবং পাসপোর্ট নবায়নের পুলিশ ভেরিফিকেশনও আটকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া কার্যত নাগরিকত্ব সংকটের মতো চেহারা নিচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR controversy: নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে যখন একের পর এক অভিযোগ উঠছে, তখন সুপ্রিম কোর্টের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও কি প্রশ্ন উঠবে না? ফর্ম ৬, ভোটার তালিকা থেকে বাদ এবং ট্রাইবুনালে দীর্ঘসূত্রিতার মতো ঘটনায় সর্বোচ্চ আদালত কি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে?
মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট এই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি বেআইনি না বললেও সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, নির্বাচন কমিশন তালিকা তৈরি করতে পারে ঠিকই, কিন্তু কে ভারতের নাগরিক আর কে নন—তা বিচার করার ক্ষমতা কমিশনের নেই। সম্প্রতি শীর্ষ আদালত কমিশনকে এই কাজের সমস্ত তথ্য ও রেকর্ড জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং জানিয়েছে, কোনো সিদ্ধান্ত একতরফা বা বেআইনি হলে আদালত তা বাতিল করবে।
অন্যদিকে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং তালিকায় স্বচ্ছতা আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিরোধীরা ভোটে হারার ভয়ে অরাজকতা তৈরি করছে বলেও শাসকদলের দাবি। তবে বিরোধীরা তাদের অবস্থানে অনড়। দিল্লি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে এবং বিরোধী নেতারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের স্পষ্ট কথা, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না।







