সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের নামে ছড়ানো শিরশ্ছেদের ভিডিওটি কি সত্যি?
Bangladeshi execution Saudi Arabia viral video: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের ভাইরাল ভিডিওটি কি আদৌ সত্যি?
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি মর্মান্তিক ভিডিও। বোরখা পরা এক মহিলাকে ঘিরে কয়েক জনের উপস্থিতিতে শিরশ্ছেদের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে সেই ভিডিওতে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির ঘটনার দৃশ্য এটি। কিন্তু তথ্য যাচাই করে দেখা গিয়েছে, এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়। এর সঙ্গে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের কোনো সম্পর্কই নেই।
ভিডিওটি আসলে ২০১৫ সালের একটি পুরনো ঘটনার। সেখানে দেখানো মহিলার পরিচয়ও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নয়, মায়ানমারের এক মহিলা হিসেবে পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, পুরনো একটি ঘটনার দৃশ্যকে নতুন ঘটনার বলে প্রচার করে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
কীভাবে ধরা পড়ল ভিডিওটির আসল পরিচয়?
ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে ইনস্ক্রিপ্ট তার একটি দৃশ্যের ছবি নিয়ে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ করে। সেই অনুসন্ধান থেকেই পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন-এ ২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদন থেকেই জানা যায়, ভিডিওটি সৌদি আরবের মক্কায় এক মহিলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মহিলার নাম লায়লা বিন আবদুল মুত্তালিব বাসিম। তিনি মায়ানমারের নাগরিক ছিলেন। সাত বছরের সৎমেয়েকে যৌন নির্যাতন এবং হত্যা করার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে মক্কায় প্রকাশ্যে তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের ফেসবুক পোস্টেও এই ঘটনার দৃশ্য প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে জানানো হয়েছিল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে ওই মহিলা শিশুটিকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
অর্থাৎ, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনার কোনো যোগসূত্র নেই। পুরনো ঘটনার দৃশ্যকে নতুন ঘটনার বলে প্রচার করা হয়েছে। ভিডিওটি কোথায়, কখন এবং কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, সেই তথ্য খতিয়ে দেখলেই বিভ্রান্তিকর দাবির অসারতা স্পষ্ট হয়ে যায়।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি সত্যি
ভিডিওটি পুরনো হলেও সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবরটি মিথ্যা নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, ১৪ অক্টোবর মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের নাম নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আখতার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘন করে ‘অশোভন কাজ’ করার অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিক কী ধরনের কাজের অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সেই বিষয়ে সরকারি বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। মৃত্যুদণ্ড কী পদ্ধতিতে কার্যকর করা হয়েছিল, তা-ও ওই বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।
সামাজিক মাধ্যমে কোনো খবর ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে সত্যি বলে ধরে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড, হিংসা বা ধর্মীয় অনুভূতির মতো সংবেদনশীল বিষয়ের ক্ষেত্রে পুরনো ছবি ও ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য জানার বদলে মানুষ বিভ্রান্তিকর দৃশ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন।
এই ঘটনায় ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে পুরনো সংবাদ প্রতিবেদন এবং ছবির উৎস খুঁজে দেখা হয়েছে। সেই অনুসন্ধানেই প্রকাশ্যে এসেছে, ভিডিওটি ২০১৫ সালের এবং তার সঙ্গে ২০২৬ সালে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই।






