শিক্ষার স্বাধীনতা বনাম গৈরিকীকরণ: কেন গুরুত্বপূর্ণ যাদবপুরের লড়াই?
Jadavpur Under Saffron Attack: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সাম্প্রতিক আক্রমণ শুধুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? কেন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন, ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের অধিকার এবং শিক্ষার স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে? শিক্ষা এবার মতাদর্শের নিয়ন্ত্রণে যাবে?
আজকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত মোটামুটি যে ক'টি সংবাদপত্র আছে তার বেশিরভাগের প্রথম পাতার খবর এবং শিরোনাম 'যাদবপুরে গেরুয়া তান্ডব'। ১৯ অগাস্ট রাত থেকে যে ঘটনা যাদবপুরে হয়েছে তাতে এই শিরোনাম যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ। ১০০ দিনও সবে পেরিয়েছে সরকারের। এর মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাতের অন্ধকারে বিজেপির এক বিধায়ক ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের অছাত্রসুলভ আচরণ গোটা রাজ্য ও দেশের নজর কেড়েছে। সেই কারণেই এই শিরোনাম যথার্থ।
১৯ অগাস্ট রাতের পর ২০ অগাস্টও এবিভিপির নাম করে বহু অছাত্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক অশিক্ষক কর্মচারীরা মিলিতভাবে প্রতিরোধ করে আক্রমণ আপাতত ঠেকাতে পেরেছে। যদিও আক্রমণের সময়ে নন্দলাল বসুর আঁকা যাদবপুরের স্মারক চিহ্নটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও বড় কোন ঘটনা ঘটেনি সেটা বলা যায়। ২১ অগাস্ট ছাত্রছাত্রীরা একটি নাগরিক মিছিলের ডাক দিয়েছে। বিকেল চারটেয় জমায়েত যাদবপুরের মাঠে, সেখান থেকে মিছিল বেরোবে।
যথারীতি আবার বিতর্ক শুরু হয়েছে, এই যাদবপুর রাষ্ট্রবিরোধী চিন্তাভাবনার আখড়া। এই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নেশা করার আখড়া, এই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাওবাদী সমর্থকরা বেরোয়, এটা আর মেধার জায়গা নয়, এটা সম্পূর্ণ 'দিমাগী নকশাল'দের জায়গা। সুতরাং এই সমস্ত দেশবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। যাঁরা এই কথা বলছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। ঘটনাচক্রে জানা যাচ্ছে, শর্বরী মুখোপাধ্যায় নিজের সন্তানই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন একসময়। এবং বাম রাজনীতির পরিসরেই ঘোরাফেরা করেছেন। এখন যদিও তিনি চাকরি করেন তবুও তার অতীতটা তো থেকেই যায়। শর্বরী মুখোপাধ্যায় যখন যাদবপুরের বুকে দাঁড়িয়ে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেন তখন তো প্রশ্ন করতে হয় তাহলে কি তিনি তাঁর সন্তানকেও একই তালিকাভুক্ত করছেন? সেই কারণেও ২১ অগাস্টের নাগরিক মিছিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২১ অগাস্টের নাগরিক মিছিল থেকে এটা প্রমাণ করার দায় থেকে যায়, যাদবপুর মেধার দিক দিয়েও পিছিয়ে নয় লড়াইয়ের দিক দিয়েও পিছিয়ে নয়। আর এই লড়াই শুধুমাত্র যাদবপুরের নয় সমস্ত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বায়ত্ততা বাঁচিয়ে রাখার ও লড়াই।
আশেপাশের যে কোনো মানুষের সঙ্গে এখন যদি কথা বলা যায় তাহলে দেখা যাবে বেশিরভাগের সন্তান-সন্ততিরা বেসরকারি কোনো জায়গায় পড়াশোনা করছেন। তা রাজ্যের ভেতরে হোক বা রাজ্যের বাইরে কিংবা দেশের ভেতরে হোক বা দেশের বাইরে। আর যারা পড়াশোনা করতে পারছেন না তাঁরা হারিয়ে যাচ্ছেন।
একটা সময় মাঝেমধ্যেই খবর হতো একজন রিকশাচালকের সন্তান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হলেন কিংবা একজন গৃহপরিচারিকা, তাঁর সন্তানকে চিকিৎসক বানানোর জন্য সরকারি একটি মেডিকেল কলেজে পড়াচ্ছেন। বেশ কিছু বছর এই ধরনের খবর আর খুব বেশি দেখা যায় না। কারণ, বেশিরভাগ মানুষ আর এই ধরনের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেল কলেজে পড়াতে পারছেন না। উচ্চশিক্ষায় নিয়েও যেতে পারছেন না ইচ্ছে থাকলেও। কারণ, উচ্চশিক্ষাটা ক্রমশ সাধারণ নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। আর তার জন্য দায়ী জাতীয় কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি ২০২০। যে সময়ে কোভিডের সংক্রমণে মানুষ আক্রান্ত ছিল সেই সময়ে কোনো আলোচনা ছাড়া এই জাতীয় শিক্ষানীতিকে প্রণয়ন করা হয় কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা।
একটা সময় ছিল যখন মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের প্রাপ্ত নম্বর উচ্চ শিক্ষায় গণ্য করা হতো। সাম্প্রতিককালে ওই জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ প্রণয়ন হওয়ার ফলে এই নম্বর আর গণ্য করা হয় না। এখন প্রতিটি ছাত্র বা ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষায় যেতে হলে নতুন করে ভর্তির পরীক্ষা দিতে হয়। ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রে তা কেন্দ্রীয় ভাবে নেয় এনটিএ বা কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা যা স্থাপিত হয়েছিল ২০১৭ সালে। অন্যান্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য এই ধরনের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ব্যবস্থা আছে। এতদিন অবধি বাংলায় এই জাতীয় শিক্ষানীতি পুরোপুরি লাগু ছিল না। এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার আসার ফলে নতুন করে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে যার মধ্যে দিয়ে এই জাতীয় কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি খুব দ্রুত এই বাংলায় লাগু করা যায়। এমনিতে শুনতে ভালো, মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর বিভিন্ন বোর্ডে বিভিন্ন রকম সুতরাং একজন ভিন রাজ্যের বা ভিন বোর্ডের ছাত্রের সঙ্গে এই রাজ্যের ছাত্রের একটা অসম প্রতিযোগিতা হয়। সেই জন্যই ওই মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরগুলিকে গণ্য না করে একটি অভিন্ন পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করলে সবার ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। কিন্তু বিষয়টি কি এতটাই সরল?
এই মুহূর্তে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। দেশের উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতে প্রায় ৫২,৩৯৭টি কলেজ রয়েছে, যেগুলি ১,৪২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। এই ৫২,৩৯৭টি কলেজের মধ্যে বেশিরভাগই রাজ্য স্তরের উচ্চশিক্ষা দফতরের অধীনে আছে আর কিছু আছে বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। রাজ্য সরকারগুলি এখনও অবধি কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দের ৯০ শতাংশ খরচ করে শিক্ষার জন্য। এই বিষয়টি জরুরী কারণ, একটি রাজ্যের জনবিন্যাস এবং সাক্ষরতা অন্য রাজ্যের থেকে ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমন, কেরালা এবং বিহারের ভিন্ন ধরনের শিক্ষা সংক্রান্ত সমাধানের প্রয়োজন, সবকিছুকে এক করে দিয়ে কোনো সমস্যা সমাধান হয় বলে জানা নেই। যদিও আগে থেকেই হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং যাদবপুর-সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা আগেও ছিল এখনও আছে। কিন্তু সেখানেও পিছিয়ে পড়া এবং অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছ্বল মানুষজনের সন্তানেরা পড়তে পারতেন। সেই কারণেই ২০১৪ সালে নিখিল দাস কাকদ্বীপে থেকেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হতে পেরেছিল। যদিও তারপরে যৌন হেনস্থার কারণে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তবুও বলতে হয় সেই সময় অন্তত তার পরিবার তাকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি করানোর সুযোগ পেয়েছিল। আজকে যদিও সে এবিভিপির হয়ে কথা বলছে, কিন্তু সে যদি এই যাদবপুরে ভর্তি নাই হতে পারতো তাহলে তার হয়তো উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত।
কেন্দ্রীয় জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এই ব্যবস্থাকেই পাকা করেছে যাতে একজন অর্থনৈতিকভাবে কিংবা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রকে সমাজের এগিয়ে থাকা ছাত্রের সঙ্গে একই মানের পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হচ্ছে, যা তার জন্য প্রায় অসম্ভব। যেহেতু মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর গণ্য করা হচ্ছে না তাই তার উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ কমে আসছে। কিন্তু এই যুক্তি কতটা অসার সেটা বলার সময় এখনই। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন ধরনের পড়াশুনা করানো হয় এবং সেটিই স্বাভাবিক এবং বিভিন্ন ভাষাতেও হয় এবং ভারতবর্ষের মতো একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে সেটাই স্বাভাবিক। কোনো একজন ছাত্রকে বা ছাত্রীকে যদি দ্বাদশ শ্রেণি অতিক্রম করার পর একটা সমসত্বের পরীক্ষায় বসানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে কৃতকার্য হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। সেই জন্যই উচ্চশিক্ষা থেকে ক্রমশ মেধাবী ছেলে মেয়েরা হারিয়ে যাচ্ছে আর তার জায়গায় স্থান হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের। শুধু শিক্ষা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এমনটা নয় , হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে, আত্মহত্যা করার প্রবণতা বাড়ছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দশকে ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা ৮০% শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেখা গিয়েছে গত ১০ বছরে প্রায় প্রতি বছর দু'হাজার ছাত্রছাত্রী এই পরীক্ষায় অকৃতকার্যতার দরুণ আত্মহত্যা করেছে।
এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় এই কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলির প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাহলে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জন্য তা আরও আতঙ্কের হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি যখন দেখা যায় নেতা মন্ত্রীর সন্তানরা বিদেশে গিয়ে পড়াশুনা করছেন তখন সমাজের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়ে। উচ্চশিক্ষাকে বেসরকারিকরণ করার প্রবণতা ১৯৯০ সালের পরবর্তীতে শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে ডব্লিউটিও এবং গ্যাট এগ্রিমেন্ট হয়। তখন বলা হয়, উচ্চশিক্ষা একটি ব্যবসার বস্তু হতে পারে এবং বেসরকারি সংস্থারা সেখান থেকে লাভও করতে পারেন। সেই সময় কংগ্রেস সরকার ছিল কিন্তু সেই সময় এই যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বিভিন্ন স্বশাসিত সংস্থাগুলো তারা কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করে। কিন্তু বিজেপি সরকার আসার পরে সমস্ত স্বশাসিত সংস্থাগুলিকে আস্তে আস্তে ভেতর থেকে ভঙ্গুর করে দেওয়ার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। যার ফলে এখন আর ন্যূনতম প্রতিরোধও কোনো সংস্থা দিয়ে উঠতে পারছে না, পারবে না। সেই জন্য এই যাদবপুরের উপর আক্রমণ শুধুমাত্র গৈরিক তাণ্ডব নয়। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটাকেই বেসরকারীকরণ করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত একটি আক্রমণ বলেই মানতে হবে। সেই জন্যই যন্তর মন্তরের ছাত্রদের আন্দোলন এবং যাদবপুরের আন্দোলন আজকে মিলেমিশে যায়। সেই জন্যই আজকের কিংবা আগামী দিনে যাদবপুরের উপর আক্রমণ রুখতে যাওয়াটা নাগরিকদের কর্তব্য।
অনেকে হয়তো জানেন না, জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়কেও বলা হয়েছে ছাত্রদের থেকে যখন বেতন বাবদ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না আরও অন্য পন্থা অবলম্বন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য টাকা তুলতে হবে। তাই গ্রন্থাগারের বই একদিন বেশি রাখলে তার জন্য ফাইন দিতে হয় অনেক টাকা। শুধু তাই নয়, কোনো প্রতিবাদ করলে সেই প্রতিবাদে যদি কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে দেখা যায় তাহলে তাদেরকেও জরিমানা করা হয়। জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্টকে গোপিকা বাবু লাইব্রেরীর সামনে একটি বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। তার সঙ্গে আরও বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন। চারজনকে বহিষ্কার করা হয় এবং অন্যান্যদের ১৯,০০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানা করার যে নির্দেশিকা আসে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাতে বলা হয় সেই ছাত্র-ছাত্রীদের নাকি ওই প্রতিবাদে হাততালি দিতে দেখা গিয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরাতে। এই জন্য তাদের জরিমানা করা হলো।
এই গৈরিক আক্রমণের মুখ থেকে আজকে যাদবপুরকে বাঁচানো না গেলে, আগামী দিনে এই ধরনের জরিমানা যাদবপুরের যেকোনো ছাত্রছাত্রীর উপর লাগু হতে পারে। আগামী দিনে কোন প্রতিবাদ ই যে যাদবপুরে করা যাবে না সেটা কিন্তু আন্দাজ করা যাচ্ছে।
এবার একটু ইতিহাসে ফেরা যাক। শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে নাৎসি জার্মানির সমাজকে নিজেদের আদলে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টা পর্যায়ের অন্যতম বিখ্যাত ভাষণ,
আমরা কেবল গবেষণার খাতিরে গবেষণা করাকে বর্জন করি। আমরা চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষা ও চর্চা করি জানা অণুজীবের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নয়, বরং জার্মান জাতিকে শক্তিশালী ও সুস্থ রাখার লক্ষ্যে। আমরা ইতিহাসের শিক্ষা ও চর্চা করি কেবল ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ দেওয়ার জন্য নয়, বরং অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে জার্মান জাতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য। আমরা বিজ্ঞানের শিক্ষা ও চর্চা করি বিমূর্ত কোনো নিয়ম আবিষ্কারের জন্য নয়, বরং অন্যান্য জাতির সাথে প্রতিযোগিতায় জার্মান জাতির সক্ষমতার হাতিয়ারগুলোকে আরও শানিত করার জন্য।
শিক্ষা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে নাৎসি জার্মানি কীভাবে সমাজকে নিজেদের আদর্শ ও মতাদর্শ অনুযায়ী গড়ে তুলতে চেয়েছিল, তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ছিল এই বিখ্যাত ভাষণ।
১৯৩৪ সালে অর্থাৎ নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার এক বছর পর, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই ছিল তাদের কঠোর দমন-পীড়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু—ইতিহাসবিদ উলরিখ কারশ্টেড্ট এই ভাষণটি দিয়েছিলেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীকে হারায় এবং বাকি শিক্ষাসমাজও মূলত কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই নতুন এই ব্যবস্থার কাছে নতি স্বীকার করে নেয়। তখন উচ্চশিক্ষাজগৎ বা অ্যাকাডেমিয়ার মূল লক্ষ্য আর এমন কোনো জ্ঞান অর্জন ছিল না যা কাজের বা আত্ম-উন্নয়নমূলক; বরং এখন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল এমন জ্ঞান যা ‘জার্মান সত্তা’র সঠিক মানদণ্ড বা আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই জন্যেই আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াই এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বাতিলের লড়াই কোথায় যেন মিলেমিশে যায়। যন্তর মন্তরের অনশন আর আইসার নেহা বোরার সারা দেশব্যাপী আন্দোলন এবং যাদবপুর এর উপর আক্রমণ কোনটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।








