বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর যাদবপুরে চার মাসে যা যা হলো

Jadavpur University After BJP’s Rise: বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বদলে যাচ্ছে যাদবপুরের রাজনৈতিক পরিবেশ? আরএসএসের শাখা, এবিভিপির সক্রিয়তা, সংগঠনগুলিকে ঘর বরাদ্দ, সংঘর্ষ, বহিরাগত হামলার অভিযোগ, দেওয়াললিখন মুছে ফেলা, ‘জাতীয়তাবাদ’-এর নতুন ভাষ্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলের প্রস্তাব—চার মাসে ঠিক কী কী ঘটল যাদবপুরে?

inscript
৬ মিনিট
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর যাদবপুরে চার মাসে যা যা হলো

হিসেবের শেষ পর্যায় এসে গিয়েছে। হয় এরা থাকবে, নয় আমরা। মাঝে আর কিছু হবে না!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই ভাষাতেই বামপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার আগে-পরে ঘটেছে একাধিক ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আরএসএসের শাখা চালু, বিজেপি ও সঙ্ঘ প্রভাবিত সংগঠনগুলিকে ঘর বরাদ্দ, এবিভিপির সক্রিয়তা বৃদ্ধি, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, বহিরাগতদের হামলার অভিযোগ, দেওয়াললিখন মোছা, জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলের প্রস্তাব—বিজেপি ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ পরিচয় রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় দশকের শাসনকালে রাজ্যের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পরিসরে বামেদের প্রভাব কমলেও যাদবপুরে বাম ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির উপস্থিতি বজায় ছিল। সেই কারণে যাদবপুরকে অনেক সময়ই ‘বামদুর্গ’ বলা হয়েছে। তবে রাজ্যে ফের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন শাসক গেরুয়া শিবির যাদবপুরে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে চাইছে। বামপক্ষের তীব্র প্রতিরোধ সত্ত্বেও গত চার মাসে সেই লক্ষ্যেই তাদের একের পর এক পদক্ষেপ দেখা গিয়েছে।

বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র আট দিনের মাথায়, ১২ মে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে আত্মপ্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের কাছাকাছি এলাকায় সঙ্ঘের শাখা চালু হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ, এত দিন যাদবপুরে সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলির উপস্থিতি থাকলেও ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশে বামপন্থী সংগঠনগুলির আধিপত্যই বেশি দৃশ্যমান ছিল।

এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সংগঠনগত পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ সামনে আসে। বিজেপি অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী পরিষদ, আরএসএসের শ্রমিক সংগঠন বিএমএস অনুমোদিত কর্মচারী সঙ্ঘ এবং শিক্ষক-অধ্যাপক সংগঠন এবিআরএসএম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অফিস করার জন্য ঘর চায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের ঘর বরাদ্দও করে। কর্মচারী পরিষদ এবং কর্মচারী সঙ্ঘকে সুবর্ণজয়ন্তী ভবনে এবং এবিআরএসএমকে টেকিপ বিল্ডিংয়ে ঘর দেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই। ফলে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর যাদবপুরের প্রথম দিকের রাজনৈতিক সংঘাতগুলির একটি তৈরি হয় সংগঠনগুলির ক্যাম্পাসে স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলাকে কেন্দ্র করে। এক দিকে নতুন শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে চাইছে, অন্য দিকে বাম ছাত্র সংগঠনগুলি সেই রাজনৈতিক সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে।

যাদবপুরে এই সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস বহু দশক ধরে নানা ধরনের মতাদর্শগত সংঘাত, ছাত্র আন্দোলন এবং সংগঠনগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাক্ষী। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব ক্রমশ বাড়ে। উদ্বাস্তু আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি এবং পরবর্তী সময়ে নকশাল আন্দোলনের প্রভাবও যাদবপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিসর কখনও সম্পূর্ণ একরৈখিক ছিল না। বিভিন্ন বাম সংগঠনের মধ্যেও মতাদর্শগত এবং সংগঠনগত সংঘাত হয়েছে। সিপিএম, অতিবাম এবং নকশালপন্থী রাজনীতির বিভিন্ন ধারা ক্যাম্পাসে সক্রিয় থেকেছে। আবার ক্যাম্পাসের দেওয়ালে রাজনৈতিক স্লোগান, কাশ্মীর প্রসঙ্গ বা জাতীয়তাবাদকে ঘিরে বিতর্কও নতুন নয়।

কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে সেই পুরনো বিতর্কগুলিই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে।

এর আগে ২০১৯ সালে যাদবপুরে এবিভিপির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘাত হয়েছিল। তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন গণজ্ঞাপন বিভাগের ছাত্র সুরঞ্জন সরকার। বাবুল সুপ্রিয় এবং বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পলের ক্যাম্পাসে আসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। বামপন্থী ছাত্রদের হাতে ঘেরাও হন বাবুল সুপ্রিয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তৎকালীন উপাচার্য সুরঞ্জন দাস। পরে রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় ক্যাম্পাসে এসে বাবুল সুপ্রিয়কে উদ্ধার করে নিয়ে যান।

সেই সময় এবিভিপির সঙ্গে যুক্ত পড়ুয়াদের উপর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। বিজেপি এবং এবিভিপির দাবি ছিল, যাদবপুরে তাদের সংগঠন করার সুযোগ সীমিত। কয়েক বছর পরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রবেশপথে এবিভিপির পতাকা এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি-সহ ব্যানার দেখা যেতে শুরু করে।

অগাস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই শুরু হয় পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ২০ অগাস্ট রাত থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে একটি জিবি বৈঠককে কেন্দ্র করে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এবিভিপির সংঘর্ষ হয়। এবিভিপির অভিযোগ ছিল, জিবি বৈঠকের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে তাদের নেতাকর্মীদের মারধর করা হয়েছে।

ঘটনার পরে যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানান। এবিভিপির উপর হামলার পাল্টা ‘তাণ্ডব’ হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর পর রাতভর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এবিভিপি এবং বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের তাণ্ডব চলেছে বলে অভিযোগ করে বাম সংগঠনগুলি। পরের দিনও ক্যাম্পাসের ভিতরে এবং বাইরে উত্তেজনা বজায় থাকে।

অশান্তির ঘটনায় বহিরাগতদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অনুষ্ণা দাসের অভিযোগ, ঘটনাটি শুধুমাত্র দুই ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে বচসা বা হাতাহাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর দাবি, রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ বাইরে থেকে একদল মানুষ ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ুয়াদের উপর হামলা চালায়।

অনুষ্ণার অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীদের হাতে বাঁশ ছিল। ক্যাম্পাসের বাইরে খাবার খেতে থাকা কয়েকজন পড়ুয়াকেও মারধর করা হয়। কয়েকজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। অরবিন্দ ভবনে আশ্রয় নেওয়া পড়ুয়াদের অভিযোগ, বাইরে থেকে আসা একদল মানুষ ভবনের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। তাঁদের দিকে ইট-পাটকেল, বোতল এবং জ্বলন্ত কাঠের টুকরো ছোড়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও তেও সেই চিত্র দেখা গিয়েছে।

ছাত্রীটির দাবি ছিল, হামলাকারীরা ‘ভারত মাতা কি জয়’ এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে দিতে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করছিল। কয়েকজনের হাতে গেরুয়া পতাকাও ছিল বলে তাঁর অভিযোগ। প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি বাইকে করে ১০০ থেকে ১২০ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের সামনে জড়ো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে হামলাকারীদের সঙ্গে বিজেপি, আরএসএস বা এবিভিপির যোগ রয়েছে বলে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং পড়ুয়াদের একাংশ অভিযোগ করে। যদিও বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানান, এবিভিপির সঙ্গে বিজেপির কোনো সাংগঠনিক যোগ নেই।

এই সংঘর্ষের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা। এত সংখ্যক মানুষ কী ভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকল? বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তারক্ষী থাকার কথা থাকলেও ঘটনার সময় তাঁদের দেখা যায়নি কেন? পড়ুয়াদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ফোন করেও অনেক ক্ষেত্রে সাড়া পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর যাদবপুরে রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে যায়। আগে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘাত মূলত ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক থাকলেও এবার বহিরাগতদের প্রবেশের অভিযোগ নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে।

এই অশান্তির প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সামাজিক উদ্যোগগুলির উপরও। অরবিন্দ ভবনের বিপরীতে চলা ‘আশু-তিমিরের পাঠশালা’য়ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। ছিঁড়ে ফেলা হয় শিক্ষাসংক্রান্ত পোস্টার এবং শিশুদের আঁকা ছবিও। ফলে সংঘাতের প্রভাব শুধু ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক উদ্যোগগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অগাস্টের অশান্তির পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্যের কেন্দ্রে চলে আসে ‘জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘দেশবিরোধিতা’র প্রশ্ন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়ালে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান লেখা রয়েছে। তিনি সেই দেওয়াললিখনকে ‘আবর্জনা’ বলে উল্লেখ করে তা মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়ালে লেখা রাজনৈতিক স্লোগানের উপর সাদা রং করা হয়।

৩১ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল থেকে বেশ কিছু রাজনৈতিক স্লোগান মুছে দেয়। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবার নতুন করে দেওয়াললিখন দেখা যায়। সেখানে কার্ল মার্ক্সের একটি উক্তিও লেখা হয়। ১ সেপ্টেম্বর মাঝরাতে পুরসভার কর্মীরা ক্যাম্পাসে ঢুকে সেই দেওয়াললিখন ফের মুছে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। মুছে ফেলা হয় চিত্তপ্রসাদের গ্রাফিত্তিও।

পড়ুয়াদের অভিযোগ ছিল, পুরকর্মীদের সঙ্গে পুলিশও ক্যাম্পাসে ঢুকেছিল। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, পুরসভা দেওয়াললিখন মুছতে আসবে, তা তিনি জানতেন। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতির বিষয়ে তাঁর কাছে আগাম কোনো তথ্য ছিল না। তিনি পুলিশকে ক্যাম্পাসে ঢোকার অনুমতিও দেননি বলে দাবি করেন।

২৮ অগাস্ট বিজেপির উদ্যোগে যাদবপুরের এইট-বি বাসস্ট্যান্ডে সমবেত ‘বন্দে মাতরম্’ কর্মসূচি হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে জাতীয় সঙ্গীতে অংশ নেওয়ার পর ভাষণে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম এবং অতিবাম রাজনীতির বিরুদ্ধে আক্রমণ করেন।

তাঁর বক্তব্য ছিল, বাম রাজনীতির নামে যাদবপুরকে ‘দেশবিরোধিতার আখড়া’তে পরিণত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বামপন্থী এবং মাওবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও বলেন। যাদবপুরে ‘অভিযান’ চালানোর হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

যাদবপুরকে আর শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রাজ্য রাজনীতির বৃহত্তর মতাদর্শগত সংঘাতের প্রতীক হিসেবেও তাকে তুলে ধরা হচ্ছে। এক দিকে বিজেপির জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থান, অন্য দিকে যাদবপুরের দীর্ঘদিনের বামপন্থী এবং অতিবাম ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস—এই দুই রাজনৈতিক ধারার সংঘর্ষ ক্রমশ সামনে আসছে।

২১ অগাস্ট পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষও যাদবপুরের পরিস্থিতির জন্য পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, এত দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দেশবিরোধী’ শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সরকার পরিবর্তিত হওয়ায় সেই পরিস্থিতি আর চলবে না বলেও তিনি জানান। এমনকি ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন।

বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্যে বার বার যাদবপুরকে জাতীয়তাবাদ বনাম দেশবিরোধিতার দ্বন্দ্বের মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। বামপন্থী সংগঠনগুলির পাল্টা বক্তব্য, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক বা কর্মচারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

৩ সেপ্টেম্বর যাদবপুর ক্যাম্পাসের ত্রিগুণা সেন মঞ্চে জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক ভারত নিয়ে একটি আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়। প্রস্তাবিত অতিথিদের কয়েকজন উপস্থিত না থাকলেও বিজেপি নেতা রাহুল সিংহ এবং যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন।

সেই সভায় রাহুল সিংহ সরাসরি অভিযোগ করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভারতবিরোধী শক্তি’ ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি করেছে। তাঁর বক্তব্যে কিছু শিক্ষক-অধ্যাপক এবং কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁদের ‘চিহ্নিত’ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী নয়। বরং বাইরে থেকে আসা মাওবাদী বা নকশালপন্থী রাজনৈতিক শক্তি ছাত্রদের প্রভাবিত করছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার এবং দল, দুই স্তরেই লড়াই চলবে বলেও তিনি জানান।

এই বক্তব্যের পরেই যাদবপুরে শিক্ষক, কর্মচারী এবং ছাত্রদের রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তদন্তের বদলে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘চিহ্নিত’ করার কথা বলা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

৩ সেপ্টেম্বরের আলোচনাসভার আগে এবিভিপির সদস্যরা ‘বন্দে মাতরম্’ মিছিল করেন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি টাঙানো হয়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অশান্তির মধ্যেই ভাঙচুর করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী এমব্লেম। এই এমব্লেমের নকশার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাম। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য ছিল, যাদবপুরের সাংস্কৃতিক এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাসকে সামনে আনা হচ্ছে। শর্বরী মুখোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নন্দলাল বসুর কাজ নিয়ে আলোচনা হলেও সংবিধানের পাতায় থাকা তাঁর ছবি বা অন্যান্য জাতীয় ব্যক্তিত্বের বক্তব্য ক্যাম্পাসে কেন থাকবে না।

শর্বরী আরও দাবি করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঋষি অরবিন্দের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তাঁর নামে করার দাবি রয়েছে ‘রাষ্ট্রবাদী’ মানুষের একাংশের মধ্যে। প্রয়োজনে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে রাজ্যপাল বা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানানো হতে পারে বলেও তিনি জানান।

অর্থাৎ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শুধু সংগঠনগত উপস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, পরিচয় এবং প্রতীক নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পাসে কোন ছবি থাকবে, কোন স্লোগান থাকবে, কোন রাজনৈতিক সংগঠন অফিস করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে কী লেখা থাকবে— এই প্রশ্নগুলি ক্রমশ রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এর মধ্যেই ক্যাম্পাসে নাগা সন্ন্যাসীদের একটি মিছিলের দৃশ্যও সামনে আসে। গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত প্রকাশ্য রাস্তায় তাঁদের যাত্রা নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়। যাদবপুরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ধরনে পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন অনেকেই।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। বাম রাজনীতি, নকশাল আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন এবং মতাদর্শগত বিতর্ক বহু দশক ধরে এই ক্যাম্পাসের অংশ। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সংঘাতের চরিত্র বদলেছে। এত দিন যে রাজনৈতিক শক্তিগুলি ক্যাম্পাসে সীমিত উপস্থিতিতে ছিল, তারা এখন প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে চাইছে।

তার পাল্টা প্রতিরোধও চলছে। এসএফআই এবং অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠন সংগঠনগুলির ঘর বরাদ্দ থেকে শুরু করে দেওয়াললিখন মোছা পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

আরএসএসের সাংগঠনিক উপস্থিতি থেকে শুরু করে এবিভিপির কর্মসূচি, বিজেপি নেতৃত্বের জাতীয়তাবাদের ভাষ্য থেকে দেওয়াললিখন মুছে দেওয়া— প্রতিটি ঘটনা আলাদা হলেও তাদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রয়েছে।

চার মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়। কিন্তু এই চার মাসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তাতে শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ বা রাজনৈতিক কর্মসূচির হিসেব দেখলে ছবিটা সম্পূর্ণ হবে না। বরং সংগঠনের উপস্থিতি বাড়ানো, প্রশাসনিক পরিসরে জায়গা তৈরি, জাতীয়তাবাদের নতুন ভাষ্য সামনে আনা, দেওয়াললিখন মুছে দেওয়া এবং ক্যাম্পাসের ইতিহাস ও প্রতীককে নতুন করে ব্যাখ্যা করার মতো একের পর এক পদক্ষেপে যাদবপুরকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত মিলছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি থেকে কমিশন ঘেরাও, ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে ঠিক কী কী হলো?

INDIA Bloc Meeting: ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে কী আলোচনা হলো? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে কী কী নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হলো? ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের পর সংসদ ও রাজপথে কী কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে? ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে কি আরও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট?

ভুচিচের পদত্যাগ: সার্বিয়ায় জেন-জি নেতৃত্বে বদলাচ্ছে ক্ষমতার সমীকরণ?

Serbian protest against the government: সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ছাত্র আন্দোলন। নোভি সাদ স্টেশন দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া এই আন্দোলন এবার নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রবেশ করেছে। ভুচিচ প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার চেষ্টা করছেন। ফলে ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও প্রশ্ন সামনে আনছে।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রভাবেই বদলে গিয়েছিল ভোটের অঙ্ক?

West Bengal SIR and Election Results: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ২১৫ থেকে ৮০ আসনে নেমে যাওয়া এবং বিজেপির ২০৭ আসনে জয়—এই ফলের সঙ্গে SIR-এর প্রভাব কতটা?

প্রযুক্তির যুগেও কেন জরুরি বিজ্ঞানমনস্কতা, দাভোলকার যে প্রশ্ন তুলে দেয়

Narendra Dabholkar: নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ১৩ বছর পরেও কেন প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ? কুসংস্কার, ভুয়ো তথ্য ও অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে কীভাবে গড়ে উঠবে মানবিক, যুক্তিনির্ভর সমাজ?

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।

কুম্ভের রাস্তা চওড়া করতে ভাঙা পড়ল মসজিদ, উজ্জয়িনীর ঘটনায় উঠছে যে প্রশ্ন

Legal Battle of ujjain's Shahi masjid: ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতিতে উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদের তিন ফুট অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনের ২৭২টি ভবনের তালিকায় রয়েছে ৮০টিরও বেশি ধর্মীয় স্থাপনা। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও রাতভর আলোচনার পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। ছত্রি চকে ছোড়া হয় পাথর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ছুড়তে হয় কাঁদানে গ্যাস।