লং মার্চের ডাক, ৫০ জনের বেশি আটক! কেন ফের উত্তপ্ত জেএনইউ?
JNU student movement: তারা ‘রোহিত ভেমুলা অ্যাক্ট’-এর কথাও তোলে, এই আইনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়— যে নামটা ভারতের ছাত্ররাজনীতি, মতাদর্শিক লড়াই আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের সঙ্গে বহুদিন ধরেই জড়িয়ে আছে, সেই ক্যাম্পাস আবারও উত্তপ্ত। ঘটনাটি শুরু হয় একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারকে ঘিরে। কয়েক দিনের মধ্যেই তা গড়ায় বড়সড় আন্দোলনে, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে, গ্রেফতারিতে এবং উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে। একটি পডকাস্ট কীভাবে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে রণক্ষেত্রে পরিণত করল?
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য শান্তিশ্রী ধুলিপুড়ি পণ্ডিত। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে তিনি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, জাতপাতের বিষয়, বারবার নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরার রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতা সংক্রান্ত নিয়ম নিয়ে নিজের মতামত জানান। তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেক ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক মনে করেন, এই মন্তব্যগুলি সংবেদনশীল নয় এবং দলিত ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের প্রতি অসম্মানজনক।
উপাচার্যের বক্তব্যে মূলত বলা হয়েছিল, সমাজের একটি অংশ সবসময় নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি সংরক্ষণ নীতির প্রয়োগ ও তার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার মূল্যায়ন শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তাঁর মতে, জাত-ধর্ম বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি পড়াশোনার পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। কিন্তু ছাত্র সংগঠনগুলির একাংশ এই বক্তব্যকে সরাসরি 'কাস্টিস্ট' বা জাতপাত-বিদ্বেষী বলে আখ্যা দেয়।
বিশেষ করে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন দ্রুত বিবৃতি দিয়ে জানায়, উপাচার্যের মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়, এটি প্রশাসনিক মানসিকতার প্রতিফলন। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ইতোমধ্যেই ইক্যুইটি অফিসের কার্যকারিতা কমিয়েছে, প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ শোনার কাঠামো দুর্বল হয়েছে। পডকাস্টে দেওয়া মন্তব্য সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে।
এই পরিস্থিতিতে তারা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে। পাশাপাশি তারা চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী নীতি কার্যকর হোক এবং দলিত-আদিবাসী ও অন্যান্য সংরক্ষিত শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন করা হোক। তারা ‘রোহিত ভেমুলা অ্যাক্ট’-এর কথাও তোলে, এই আইনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Arvind Kejriwal and Manish Sisodia: আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চার্জশিটে যে তথ্য ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা ফৌজদারি ষড়যন্ত্র বা দুর্নীতির অপরাধ গঠনের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
প্রথমে বিষয়টি ছিল বিবৃতি ও পাল্টা বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তা রাস্তায় নেমে আসে। ছাত্র সংসদ একটি ‘লং মার্চ’-এর ডাক দেয়। পরিকল্পনা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষা মন্ত্রকের দফতর পর্যন্ত মিছিল করে গিয়ে নিজেদের দাবি জানানো হবে। এই ঘোষণা সামনে আসতেই প্রশাসন সতর্ক হয়।
মিছিলের দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ব্যারিকেড বসানো হয়, গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না— এমন বার্তা স্পষ্ট করে দেয় দিল্লি পুলিশ। ছাত্রদের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করার অধিকার তাদের আছে। পুলিশের বক্তব্য, অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসের বাইরে মিছিল করা আইনসঙ্গত নয়।
দু’পক্ষের অবস্থান থেকে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। ছাত্রছাত্রীরা ব্যারিকেড সরানোর চেষ্টা করলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। অন্যদিকে পুলিশ জানায়, তাদের উপর ইট-পাথর ছোড়া হয়েছে। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে কয়েকজন ছাত্র আহত হন, কয়েকজন পুলিশ কর্মীও চোট পান।
দিনের শেষে ৫০-এর বেশি ছাত্রছাত্রীকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের একাধিক পদাধিকারীও ছিলেন। পরে ১৪ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়। এই গ্রেফতারি নতুন করে ক্ষোভ উস্কে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়, শিক্ষক সংগঠনের একাংশও ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sadhguru, Isha Foundation: প্রথমেই পরিষ্কার করে বলা দরকার, Bhavya Bharat Bhushan কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার নয়। আয়োজকদের দাবি, এটি দেশের উন্নয়ন ও মানবিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এটি সরকারি গেজেটেড পুরস্কার নয়, তাই অনেকের প্রশ্ন: তাহলে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কেন অফিসিয়াল ইউনিফর্ম পরে এই পুরস্কার গ্রহণ করলেন?
এদিকে উপাচার্য বলেন, তাঁর বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। তিনি নিজেও সংরক্ষিত শ্রেণি থেকে উঠে এসেছেন— এ কথা উল্লেখ করে জানান, তাঁর মন্তব্য কোনো সম্প্রদায়কে অপমান করার উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং তিনি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা ছাত্রদের একাংশকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে দেখা যায় পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে উঠেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রের শিক্ষানীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে।
জেএনইউর ক্ষেত্রে এ ধরনের উত্তেজনা নতুন নয়। গত এক দশকে ফি বৃদ্ধি, দেশদ্রোহ মামলা, হোস্টেল, ক্যাম্পাসে হামলা— বিভিন্ন ইস্যুতে এই বিশ্ববিদ্যালয় বারবার খবরের শিরোনামে এসেছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একাংশের যুক্তি, ক্ষমতার অবস্থানে থাকা কেউ যখন মন্তব্য করেন, তা নিছক ব্যক্তিগত মত নয়, তা নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
গ্রেফতার হওয়া ছাত্ররা পরে জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু মামলা রয়ে গিয়েছে। ছাত্ররা জানিয়েছে, তারা গণস্বাক্ষর নেবে এবং বৃহত্তর ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করবে।
এই ঘটনার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও পড়েছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ, বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জেএনইউ প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, কীভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়। সংলাপের দরজা খুলবে কি? উপাচার্য কি ক্ষমা চাইবেন, নাকি নিজের অবস্থানেই অনড় থাকবেন? শিক্ষা মন্ত্রক কি কোনো হস্তক্ষেপ করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, এই ঘটনায় শুধু একটি পডকাস্ট নয়, বরং ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। জাতপাত, সংরক্ষণ, সমতা, স্বায়ত্তশাসন— এসব প্রশ্ন বহুদিনের। জেএনইউ ক্যাম্পাসে যা হয়েছে, তা আসলে সমাজে চলতে থাকা বড় সমস্যাগুলিরই প্রতিচ্ছবি। ছাত্রদের একাংশ বলছে, লড়াই কেবল ব্যক্তির বিরুদ্ধে
নয়, একটি মানসিকতার বিরুদ্ধে।






