থামল রেখার জাদু, প্রয়াত আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম শিল্পী যোগেন চৌধুরী

Jogen Chowdhury: ১৯৩৯ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম নেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন একজন জমিদার, যিনি শিল্প ও পুরাণের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর মা ইন্দুদেবী আলপনা আঁকায় দক্ষ ছিলেন।

inscript
২ মিনিট
থামল রেখার জাদু, প্রয়াত আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম শিল্পী যোগেন চৌধুরী

২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলার আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী যোগেন চৌধুরী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি রক্তের ক্যানসারে ভুগছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন তাঁর মূত্রনালীতে গুরুতর সংক্রমণ ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

১৯৩৯ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম নেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন একজন জমিদার, যিনি শিল্প ও পুরাণের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর মা ইন্দুদেবী আলপনা আঁকায় দক্ষ ছিলেন। এই পারিবারিক পরিবেশ তাঁর শৈল্পিক মানসিকতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে তিনি বাবার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। পরে ১৯৫০-এর দশকে তাঁদের পরিবার ঢাকুরিয়ার শহীদনগর কলোনিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। জমিদার পরিবার হলেও দেশভাগের পর তাঁদের চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে হয়। কেরোসিনের লণ্ঠনের আলোয় পড়ালেখা ও আঁকা চলত। কিশোর বয়সে তিনি শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে উদ্বাস্তু মানুষদের স্কেচ আঁকতেন। সেই কঠিন জীবন ও মানুষের যন্ত্রণা তাঁর শিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

তিনি ১৯৫৫ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এ ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে পাশ করেন। এরপর কিছুদিন হাওড়া জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করার পর হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬০-এর দশকে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি প্যারিসে যান এবং ‘École Nationale Supérieure des Beaux-Arts’-এ পড়াশোনা করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ‘Prix le France de la Jeune Peinture’ পুরস্কার পান। প্যারিস থেকে ফিরে তিনি মাদ্রাজের উইভার্স’ সার্ভিস সেন্টারে কাজ করেন। সেখানেই তাঁর স্বতন্ত্র রেখা ও ক্রসহ্যাচিংয়ের স্টাইল পুরোপুরি তৈরি হয়।

১৯৭২ সালে তিনি নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে যোগ দেন এবং ১৫ বছর এই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ১৯৮৭ সালে তিনি শান্তিনিকেতনের কলাভবনে পেইন্টিংয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন এবং ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি কলকাতায় ‘চারুবাসনা: যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ প্রতিষ্ঠা করেন।

যোগেন চৌধুরীর শিল্পশৈলী ছিল একেবারেই আলাদা। তাঁকে ‘মাস্টার অফ দ্য আনব্রোকেন লাইন’ বলা হয়। কালি, প্যাস্টেল আর জলরঙে তাঁর কাজ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। একটানা রেখায় মানবদেহ আঁকা এবং ক্রস-হ্যাচিংয়ের মাধ্যমে আলো-ছায়া তৈরি করা ছিল তাঁর কাজের মূল বৈশিষ্ট্য। মানুষের একাকিত্ব, সম্পর্কের জটিলতা ও মানসিক যন্ত্রণাকে তিনি ছবির মাধ্যমে তুলে ধরতেন। ‘Tiger in the Moonlight’ এবং ‘Abu Ghraib’ সিরিজ তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

তিনি তাঁর কাজের জন্য বহু সম্মান পেয়েছেন। এর মধ্যে ফরাসি সরকারের পুরস্কার ছাড়াও মধ্যপ্রদেশ সরকারের ‘কালিদাস সম্মান’ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ উল্লেখযোগ্য।

মানুষের একাকিত্ব, সম্পর্কের জটিলতা ও সাধারণ মানুষের জীবনযন্ত্রণা ও মনস্তত্ত্বকে যেভাবে ‘মাস্টার অফ দ্য আনব্রোকেন লাইন’ আধুনিক রেখায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তার অনন্য নিদর্শন তাঁকে ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সালমান খানকে ঘিরে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হুমকি, কেন নিশানায় বলিউডের অন্য তারকারাও?

Salman Khan Lawrence Bishnoi feud: এই ঘটনাটি প্রায় তিন দশক ধরে বয়ে চলা একটি পুরনো বিবাদকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল কীভাবে? সালমান খানকে ঠিক কতবার মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছে? আর কেনই বা এর মধ্যে একে একে জড়িয়ে পড়ছেন অন্য তারকারা?

রেশম পথের ‘সাধুরা' যখন সংস্কৃত বলতেন

Sanskrit in silk road: চিনের দুনহুয়াংয়ের ১৭ নম্বর গুহা থেকে পাওয়া ‘পেলিও শিনোয়া ৫৫৩৮’ পাণ্ডুলিপিতে সংস্কৃত ও খোটানি ভাষায় লেখা রয়েছে, সাধুজনেদের দৈনন্দিন কথোপকথন। ‘ভার্নাকুলার সংস্কৃত’ বা চলিত সংস্কৃতের এই দলিলটি দেখায়, এককালে সংস্কৃত ভাষা, ব্যাকরণের শুদ্ধতার চেয়ে যোগাযোগকে প্রাধান্য দিত। এই নথিটি সংগ্রহ করেছিলেন অরেল স্টেইন, যিনি আজও বিতর্কিত ‘লুটেরা’ পরিচয়ে পরিচিত হন।

দুর্গাপুজোর গয়না তৈরিতে বাংলার মুসলিম কারিগর, স্বীকৃতি পায় কি তাঁদের শ্রম?

Muslim goldsmiths in Bengal: বাংলার স্বর্ণশিল্পে মুসলমান কারিগরদের অবদান এই শ্রমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কলকাতার বৌবাজারের মতো গয়নার বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বাংলার নানা এলাকার কর্মশালায় মুসলমান শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণালংকার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের অনেকের কাছে এই পেশা কেবল চাকরি নয়, পারিবারিক সূত্রে শেখা একটি বিশেষ দক্ষতা।

পুজোর বাজারে মল ও অনলাইনের দাপট, হারিয়ে যাচ্ছে কি পুরনো কলকাতার ব্যবসা?

Durga puja economy 2026: ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে ৫০,০০০-৬৫,০০০ কোটি টাকার। কিন্তু বড় পুজো কমিটি ও ই-কমার্সের রেকর্ড লাভের এই পুজোয়,ছোট পুজো কমিটিগুলির ৩০% বিজ্ঞাপন স্লট খালি ঠেকছে। হকারদের বিক্রিতে নেমেছে ধস। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা ভুগছেন কাঁচামালের সংকটে।

দুর্গাপুজো ২০২৬: কতটা বদলে গেল বাঙালির শারদোৎসব?

Durga Puja 2026: দুর্গাপুজোর প্রতিমা, খাদ্যাভ্যাস, বইয়ের স্টল, কার্নিভাল ও বিসর্জন ঘিরে ২০২৬ সালে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের পরিসর কতটা বদলাচ্ছে?

শারদোৎসবের উৎস কি শুধু ধর্মে, নাকি কৃষি ও সমাজের ইতিহাসেও?

Durga Puja history: শারদোৎসব ও দুর্গাপুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিসভ্যতা, মাতৃকা উপাসনা, তন্ত্র, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আত্তীকরণ এবং মহিষাসুরের বিকল্প আখ্যান।

বিসর্জনের রাতে শহর নিজের উল্টো ছবি দেখে

Durga Puja Visarjan: ক্যাওড়ামো মানে ক্ষমতার ভাষাকে অপমান করা। ক্যাওড়ামো মানে প্রভুর ভাষায়, প্রভুর বিরুদ্ধে কথা বলা। ক্যাওড়ামো মানে এমন এক শব্দসমাহার, যা অভিধানে ঢোকে না, কিন্তু অলিতে গলিতে বেঁচে থাকে আজীবন।