অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসে আহত একাধিক মহিলা
Arunachal Pradesh: সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।
অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। অন্তত চার জন মহিলা আহত হন। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। অন্য দিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় পাসিঘাটে জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগম বা এনএইচপিসির দফতর, একটি পুলিশ স্টেশন এবং একাধিক সরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের আশঙ্কা, বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে তাঁদের জমি, জীবিকা, পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রার উপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে। প্রকল্পের সমীক্ষা ও প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ নিয়েও তাঁদের আপত্তি রয়েছে। অন্য দিকে, রাজ্য সরকার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এই দুই অবস্থানের সংঘাতই এখন প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
কী ঘটেছিল শুক্রবার?
২৩ অক্টোবর সিয়াং, আপার সিয়াং এবং ইস্ট সিয়াং জেলার কয়েকটি এলাকায় ১২ ঘণ্টার বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। ডাইতে-ডিমে এলাকায়, গেকুর কাছে ৬৫ নম্বর সেতুর আশপাশে, সকাল সাতটা নাগাদ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দাবি করা হচ্ছে, আপার সিয়াং জেলার গেকু ও কমকার এলাকা থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন বিক্ষোভকারী সেখানে জড়ো হন। তাঁরা পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে পাথর ছোড়েন বলে অভিযোগ। পুলিশ আরও দাবি করেছে, বিক্ষোভকারীরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এগোনোর চেষ্টা করছিলেন।
পুলিশের বক্তব্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই সময় কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। এর ফলে অন্তত চার জন মহিলা আহত হন এবং তাঁদের গেকুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাঁদানে গ্যাসের প্রভাবে তাঁদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। কারও কারও শরীরে সরাসরি শেল আঘাত করেছিল বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে আহতদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
অন্য দিকে, আন্দোলনকারীদের একাংশের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের উপর পুলিশ বলপ্রয়োগ করায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এই অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে ঠিক কী পরিস্থিতিতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
আন্দোলনের পর পাসিঘাটে ভাঙচুর ও আগুন
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Damodar River and DVC: দামোদর নদীকে নিয়ন্ত্রণে বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণকে একসময় উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই প্রকল্প বাস্তুচ্যুতি, পলি জমা, নদীদূষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকট বাড়িয়েছে। স্থানীয় জলব্যবস্থাপনা উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্তের মূল্য আজও দিচ্ছেন উপত্যকার মানুষ।
সকালের সংঘর্ষের পর শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে ইস্ট সিয়াং জেলার পাসিঘাটে। সরকারি আধিকারিকদের দাবি, বাঁধবিরোধী আন্দোলনকারীদের একাংশ এনএইচপিসির দফতর, একটি পুলিশ স্টেশন, কয়েকটি সরকারি দফতর এবং একাধিক পুলিশ গাড়িতে আগুন লাগান। সাত থেকে আটটি পুলিশ গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। রাজ্যের শাসক দল বিজেপির সভাপতি কলিং মোয়ং এবং দুই বিধায়ক ওনি পাংইয়াং ও নিনং এরিংয়ের বাড়িতেও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
ইস্ট সিয়াংয়ের জেলাশাসক জয়ন্তী পেরতিন জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল পাঁচটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বন্ধ চলাকালীন পাসিঘাটে পরিস্থিতি শান্ত ছিল। কিন্তু বিকেল পাঁচটার পর একদল বিক্ষোভকারী বন্ধ চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানান এবং জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। এর ফলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রশাসন ও নিরাপত্তারক্ষীরা প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে তাঁদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন বলে জেলাশাসকের দাবি। এর পরেই পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় আট জন বিক্ষোভকারী সামান্য আহত হয়েছেন বলে প্রশাসন জানিয়েছে। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। শনিবার ভোর চারটে নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে খবর। তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রাথমিক রিপোর্টে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। আন্দোলনের সময় সরকারি সম্পত্তি বা ব্যক্তিগত বাড়িতে হামলা চালানোর অভিযোগ যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন, তেমনই আন্দোলনের মূল কারণ এবং পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। হিংসার দায় নির্ধারণ করতে হলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দরকার।
কেন বাঁধের বিরোধিতা করছেন স্থানীয়রা?
বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প বা এসইউএমপি। সিয়াং নদীর উপর এই বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা এনএইচপিসি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকল্পটির সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ১১,২০০ থেকে ১২,৫০০ মেগাওয়াট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায় নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
প্রকল্পটির বিরোধিতাকারীদের আশঙ্কা, বাঁধ নির্মাণের ফলে নদী ও তার আশপাশের পরিবেশের উপর প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় মানুষের জমি, কৃষিকাজ, জীবিকা এবং বসবাসের জায়গা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নদী, বন এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই তাঁদের কাছে এই প্রকল্পের প্রশ্নটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়, নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে আদি বানে কেবাং ইউনাইটেড, সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার যুব সংগঠন, সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরামের যুব শাখা এবং আদি গালো ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে গ্রেফতার হওয়া ১০ জন আন্দোলনকারীর মুক্তি, বরখাস্ত হওয়া গ্রামের প্রধানদের পুনর্বহাল, বাঁধ প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ বন্ধ করা এবং এলাকায় মোতায়েন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া।
সরকারের অবস্থান
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সিয়াং অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রকল্প সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমানে প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। তাঁর মতে, এই পর্যায়ে প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি হিংসাত্মক প্রতিবাদের নিন্দা করেছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আবেদন জানিয়েছেন।
তবে সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের উদ্বেগেরও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কোনো বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্য লাভের হিসাব কষার সময় শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, তা দেখলেই চলে না। প্রকল্পের ফলে কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তাঁদের জমি ও জীবিকার কী হবে, পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেই প্রশ্নগুলিরও উত্তর প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা নয়। প্রকল্প সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা, স্থানীয় মানুষের বক্তব্য শোনা এবং তাঁদের আপত্তির যথাযথ জবাব দেওয়াও জরুরি। অন্য দিকে, আন্দোলনের নামে সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং আন্দোলনের দাবিগুলিকে আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিতে পারে।







