ভারত-মায়ানমার বৈঠকে কী কী সিদ্ধান্ত হলো?
India Myanmar relations: দিল্লিতে মায়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের শীর্ষ নেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে কী কী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে? এর প্রভাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে কী ভাবে পড়তে পারে?
১ জুন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন মায়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের শীর্ষ নেতা এবং সদ্য রাষ্ট্রপতি পদে আসীন মিন অং হ্লাইং। এই সাক্ষাৎকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মায়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। অং সান সু চি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলি মায়ানমারের সামরিক শাসনের উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং কার্যত আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কিন্তু ভারত বরাবরই এক ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তারা মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, মূলত সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির গতিবিধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে।
নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের নেতারা সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনো বিবৃতি দেননি। তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সাইবার অপরাধ বন্ধ করা এবং মানবপাচার রোধ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়।
ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তারা মন্তব্য করতে চায় না। তাদের মূল লক্ষ্য, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
দুই দেশই বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সংযোগ প্রকল্পে গতি আনার বিষয়ে একমত হয়েছে। বিশেষ করে ভারত-মায়ানমার করিডর, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও বিরল মাটি উপাদান (rare earth minerals) নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে এসেছে।
এই খনিজ সম্পদ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ভারত এই ক্ষেত্রে চিনের উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে, আর মায়ানমার এই সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
বৈঠকে নিরাপত্তা সহযোগিতাও বড় বিষয় ছিল। ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, মায়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করে। অন্যদিকে মায়ানমারও ভারতের কাছ থেকে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী সম্পর্কে তথ্য ও সহযোগিতা চায়।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারগুলির মাধ্যমে বহু মানুষ প্রতারণার শিকারও হয়েছে। ভারত জানিয়েছে, গত দেড় বছরে তারা মায়ানমার ও আশপাশের অঞ্চল থেকে দুই হাজারেরও বেশি ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করেছে।
এই বৈঠকের সময় মায়ানমারের নেতা মিন অং হ্লাইং ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জায়গাগুলিও পরিদর্শন করেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান বুদ্ধগয়ায় গিয়ে প্রার্থনা করেন। ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের দিকটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়, কারণ দুই দেশের মধ্যে বৌদ্ধ ঐতিহ্য একটি সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।
তবে এই বৈঠককে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। মায়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত। তাই অনেক বিরোধী গোষ্ঠী এবং মানবাধিকার সংগঠন ভারতের এই ধরনের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠককে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এতে সামরিক শাসনকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত যুক্তি দিচ্ছে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। মায়ানমার ভারতের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা ভারতের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে ভারত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তারা স্বার্থের কারণে মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকবে। একই সঙ্গে মায়ানমারও চায় ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে, যাতে চিনের প্রভাবকে ভারসাম্যে রাখা যায়।






