ভারত-মায়ানমার বৈঠকে কী কী সিদ্ধান্ত হলো?

India Myanmar relations: দিল্লিতে মায়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের শীর্ষ নেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে কী কী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে? এর প্রভাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে কী ভাবে পড়তে পারে?

inscript
৩ মিনিট
ভারত-মায়ানমার বৈঠকে কী কী সিদ্ধান্ত হলো?

১ জুন দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন মায়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের শীর্ষ নেতা এবং সদ্য রাষ্ট্রপতি পদে আসীন মিন অং হ্লাইং। এই সাক্ষাৎকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মায়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। অং সান সু চি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলি মায়ানমারের সামরিক শাসনের উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং কার্যত আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কিন্তু ভারত বরাবরই এক ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তারা মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, মূলত সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির গতিবিধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে।

নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের নেতারা সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনো বিবৃতি দেননি। তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সাইবার অপরাধ বন্ধ করা এবং মানবপাচার রোধ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়।

ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তারা মন্তব্য করতে চায় না। তাদের মূল লক্ষ্য, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

দুই দেশই বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সংযোগ প্রকল্পে গতি আনার বিষয়ে একমত হয়েছে। বিশেষ করে ভারত-মায়ানমার করিডর, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও বিরল মাটি উপাদান (rare earth minerals) নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে এসেছে।

এই খনিজ সম্পদ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ভারত এই ক্ষেত্রে চিনের উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে, আর মায়ানমার এই সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

বৈঠকে নিরাপত্তা সহযোগিতাও বড় বিষয় ছিল। ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, মায়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, যারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করে। অন্যদিকে মায়ানমারও ভারতের কাছ থেকে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী সম্পর্কে তথ্য ও সহযোগিতা চায়।

এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারগুলির মাধ্যমে বহু মানুষ প্রতারণার শিকারও হয়েছে। ভারত জানিয়েছে, গত দেড় বছরে তারা মায়ানমার ও আশপাশের অঞ্চল থেকে দুই হাজারেরও বেশি ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করেছে।

এই বৈঠকের সময় মায়ানমারের নেতা মিন অং হ্লাইং ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জায়গাগুলিও পরিদর্শন করেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান বুদ্ধগয়ায় গিয়ে প্রার্থনা করেন। ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের দিকটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়, কারণ দুই দেশের মধ্যে বৌদ্ধ ঐতিহ্য একটি সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

তবে এই বৈঠককে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। মায়ানমারের সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারের  মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত। তাই অনেক বিরোধী গোষ্ঠী এবং মানবাধিকার সংগঠন ভারতের এই ধরনের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠককে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এতে সামরিক শাসনকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে ভারত যুক্তি দিচ্ছে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। মায়ানমার ভারতের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়,  উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা ভারতের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে ভারত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তারা স্বার্থের কারণে মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকবে। একই সঙ্গে মায়ানমারও চায় ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে, যাতে চিনের প্রভাবকে ভারসাম্যে রাখা যায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বুলডোজ়ারের জবাব বই দিয়ে! বুকস্টলের সব বই কিনে বিলি করলেন চিকিৎসক

Doctor protests by distributing books: ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথোপকথনে নিজের এই উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অশোকবাবু। স্পষ্ট করেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের নামে ছড়ানো শিরশ্ছেদের ভিডিওটি কি সত্যি?

Bangladeshi execution Saudi Arabia viral video: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের ভাইরাল ভিডিওটি কি আদৌ সত্যি?

এপস্টাইনের সঙ্গে ছবি প্রকাশ হরদীপ সিং পুরীর, যে কারণে অস্বস্তি বাড়ছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর

Hardeep Puri-Jeffrey Epstein Photo: এপস্টাইনের মুখোমুখি টেবিলে হরদীপ পুরী। মার্কিন নথিতে প্রকাশিত  ছবি ঘিরে কেন অস্বস্তি বাড়ছে? কোন কোন কারণে প্রশ্নের মুখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী? 

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।